স্বামীর কাছে যৌতুক চেয়ে আসামি হচ্ছেন স্ত্রীরা!

প্রতীকী ছবি
১০ লাখ টাকা দেনমোহরে চলতি বছরের ২৬ জুন রাজিয়া সুলতানা মেহেরুনকে বিয়ে করেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আবু সাঈদ মুন্না। বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে তার কাছে থাকা সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেন রাজিয়া। একপর্যায়ে নিজের ভাইকে বিদেশ পাঠানোর জন্য যৌতুক হিসেবে মুন্নার কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন রাজিয়া। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে রাজিয়া তাকে তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করার হুমকি দেন।
এ ঘটনায় গত ১ অক্টোবর মুন্না বাদী হয়ে স্ত্রী রাজিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। একসময় বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় যৌতুকের মামলা মানেই ছিল বাদী হবেন স্ত্রী এবং স্বামী আসামি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই চিরাচরিত চিত্র বদলে গেছে। যৌতুক মামলার স্বামীর করার মামলায় আসামি হচ্ছেন স্ত্রীরা।
যৌতুকের আরেকটি মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর কদমতলীর ফার্মেসি ব্যবসায়ী শামীম মিয়ার সঙ্গে ফাতেমা তুজ জহুরার বিয়ে হয়। ব্যবসার জমানো টাকা বাসায় রাখলে স্ত্রী সেই টাকা থেকে বিভিন্ন সময় তার প্রেমিক ইমাম হোসাইন ও মা শাহানাজকে দিতেন। এভাবে দুই বছরে প্রায় চার লাখ টাকা সরিয়ে নেন ফাতেমা। পরে প্রেমিকের ব্যবসার কথা বলে আরও চার লাখ টাকা দাবি করেন তিনি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্বামীকে গালাগাল ও ধাক্কা দিয়ে খাটের ওপর ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে স্ত্রীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা করেন শামীম।
অন্যদিকে, মিথ্যা যৌতুক মামলা করে সাজা পেয়েছেন এক স্ত্রী। ঢাকার ধামরাই উপজেলার গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বড় নালাই গ্রামের নাছিমা আক্তার ও এস এম গোলাম মোস্তফার বিয়ে হয়। পরে গোলাম মোস্তফা বিদেশ যান। সেখানে থাকা অবস্থায় দেশে স্ত্রীর নামে জমি কেনেন। মোস্তফা দেশে ফিরে এলে বাড়িতে তাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে মোস্তফা তাকে তালাক দেন। তালাকের পর নাছিমা গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে যৌতুক দাবির মামলা করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত মামলাটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক বলে রায় দেন। সাবেক স্বামীকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। গত বছরের ৮ এপ্রিল যৌতুক দাবির মিথ্যা অভিযোগে মামলা করায় ওই নারীকে এক হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন ঢাকার একটি আদালত।
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুক দাবি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদি বিয়ের কোনো পক্ষ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্য পক্ষের কাছে যৌতুক দাবি করেন, তবে তিনি সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং সর্বনিম্ন এক বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
১৯৮০ সালের পূর্ববর্তী যৌতুক নিরোধ আইনে মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তির এমন কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না। তবে এ আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ আইনের অধীনে মামলা বা অভিযোগ করার জন্য ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও মামলা বা অভিযোগ করেন বা করান, তা হলে তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক কোন ঝগড়া, বিবাদ হলে বা স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হলে যৌতুক দাবির অভিযোগে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে যৌতুক চাওয়ার অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়। যৌতুক দিতে না পারলে স্ত্রীকে হত্যার অনেক ঘটনাও ঘটেছে। তবে সামাজিকভাবে একটা ধারণা রয়েছে, যৌতুকের মামলার মানেই ভিত্তিহীন অভিযোগ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীদের মতো পুরুষরাও যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মামলা উদ্ভবের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে এর মধ্যে রয়েছে দাম্পত্য কলহ, পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, আর্থিক দাবি-দাওয়া, পাল্টা মামলার প্রবণতা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ। তবে আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সমাজে যৌতুকের প্রথা নিরসন সম্ভব।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী আগামীর সময়কে বলেছেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আইন সবার জন্য সমান। স্ত্রী নিজেই শুধু যৌতুক মামলা দিতে পারবে আইনে কিন্তু এমনটা বলা নেই। তবে স্ত্রী বা স্বামী যেই যৌতুক দাবি করবে আইন অনুযায়ী সেই আসামি হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হলে তখন সাজা হবে। আমরা যৌতুক নিরোধে দ্রুত সময়ে এসব মামলার বিচার শেষ করে সমাজে বার্তা দিতে চাই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান আগামীর সময়কে বললেন, বাংলাদেশে যৌতুকের মামলাকে দীর্ঘদিন ধরে মূলত নারীর প্রতি নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে দেখা হলেও বর্তমান আইনের ভাষা আসলে লিঙ্গনিরপেক্ষ। যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২-এ ‘পক্ষ’ বলতে বর বা কনে উভয়কেই বোঝানো হয়েছে এবং ধারা ৩ অনুযায়ী বিবাহের যেকোনো এক পক্ষ অপর পক্ষের কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করলে তা অপরাধ। ফলে, স্ত্রী যদি স্বামীর কাছে বিবাহের শর্ত হিসেবে বা বৈবাহিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার শর্তে অর্থ, সম্পদ বা অন্য কোনো মূল্যবান সামগ্রী দাবি করেন এবং সেই দাবি আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘যৌতুক’ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে স্বামীও স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। এ অপরাধের শাস্তি সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। একইভাবে ধারা ৪ অনুযায়ী যৌতুক দেওয়া, নেওয়া, এতে সহায়তা করা বা এ-সংক্রান্ত চুক্তিও অপরাধ।
তিনি উল্লেখ করেন, স্বামী বাদী এবং স্ত্রী আসামি-এটি আইনের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বা নিষিদ্ধ কিছু নয়। বরং এ ধরনের মামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যৌতুকের অপরাধকে শুধু নারী বনাম পুরুষ হিসেবে না দেখে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত। তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রত্যেক আর্থিক দাবি বা পারিবারিক বিরোধকে যৌতুক বলা যাবে না। দাবিটি অবশ্যই বিবাহ স্থাপন বা বৈবাহিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। দেনমোহর এবং স্বাভাবিক উপহারকে আইন যৌতুকের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিয়েছে। একই সঙ্গে আইনের অপব্যবহার রোধেও সুরক্ষা রয়েছে। ধারা ৬ অনুযায়ী, কারও ক্ষতি করার উদ্দেশে ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নেই জেনেও মিথ্যা যৌতুক মামলা বা অভিযোগ করলে অভিযোগকারী নিজেই দণ্ডিত হতে পারেন।



