সোহেল স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেছে: আদালত

সংগৃহীত ছবি
আদালতের পর্যবেক্ষণে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যার আগে ধর্ষণ ও জখমের প্রমাণ মিলেছে। আজ রবিবার রায় ঘোষণার সময় এই পর্যবেক্ষণ জানান ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেহীন।
বিচারক উল্লেখ করেন, স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর প্রত্যাহারের আবেদন না আসায় বোঝা যায় সোহেল স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেছে। স্বামীকে পালাতে সাহায্য করেছে স্ত্রী স্বপ্না।
আদালত রায়ের পর্যালোচনায় জানান, এই মামলায় চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও তথ্যে প্রমাণিত হয় যে, ওই শিশুকে ধর্ষণ ও তার পরে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পুলিশের সাক্ষ্যেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ১ নম্বর থেকে ১৬ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে উঠে আসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর আসামি সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। এ সময় আরেক আসামি স্বপ্না আক্তার ওই ফ্ল্যাটেই ছিলেন। হত্যা ও ধর্ষণকাজে বাধা না দিয়ে তিনি অপরাধে সহযোগিতা করেন। ফলে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার একই অপরাধে অপরাধী।
রায় পর্যালোচনায় আদালত আরও বলেছেন, সব সাক্ষ্য ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এটা প্রমাণিত যে, সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে আসামি সোহেল রানা ওই শিশুকে ধর্ষণ করে এবং হত্যা করে। আদালত আসামি সোহেল রানার জবানবন্দিও উল্লেখ করেন। জবানবন্দিতে তিনি শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়। এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। নারী এ শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে এক হাজার আটশতাধিক বিচারাধীন মামলার দায়িত্ব পালন করছে, যার প্রতিটি মামলাই শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা, একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের জন্য প্রতীক্ষারত অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা। সেই প্রেক্ষাপটে শিশু রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে, তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে, বিজ্ঞ প্রসিকিউশন মামলার সকল গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সম্মুখে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং বিচারকার্যে সংশ্লিষ্ট সকলের এই আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসার দাবিদার। আদালত এও প্রত্যাশা করে যে, শিশু রামিসার মামলার ন্যায় দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাতেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং বিশেষত ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার যেন অযথা দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ একই রকম নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এটাই এই আদালতের প্রত্যাশা।
তিনি আরও যোগ করেন, ন্যায়সঙ্গত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষীগণ এবং বিচার ব্যবস্থার সকল অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের লক্ষ্য অর্জিত হয়। আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতিমালার আলোকে সত্য উদ্ঘাটন করা। অতএব, এই আদালত অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত রায় প্রদান করছে।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই রামিসার বাবা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। ঘটনার পরপরই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০ মে সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এরপর ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই দিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান। পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। পরদিন মাত্র চার ঘণ্টায় রামিসার মা-বাবা, বোনসহ ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনে সোহেল রানা নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চান। তবে স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।




