দীপনের বাবার বিদায়, অপূর্ণই রয়ে গেল রায় কার্যকরের অপেক্ষা

ফয়সল আরেফিন দীপন ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
একমাত্র ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছিল। বিচারের রায়ও ঘোষণা হয়। কিন্তু সেই রায় কার্যকর হয়েছে— এমন চিত্র দেখে যেতে পারেননি বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। আজ রবিবার বিকালে রাজধানীর মিরপুরে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে হত্যা করা হয় দীপনকে।
ছেলেকে হারিয়ে বুক ভরা হাহাকার নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন অধ্যাপক হক। বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয়পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
বিচারহীনতার সংস্কৃতির ওপর বিরাট ক্ষোভ ছিল তার। দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা না থাকার প্রতিফলন ছিল ওই প্রতিক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত আদালতে এই হত্যার বিচার হলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে রায় কার্যকর হয়নি।
২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দীপন হত্যা মামলায় আট আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৮ আসামি হলেন- মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির, আবদুস সবুর ওরফে আবদুস সামাদ, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল রিফাত, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব সাজিদ, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন, শেখ আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের, চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ও আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব। তারা সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য।
এদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম বিচারের শুরু থেকেই পলাতক ছিলেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে অন্য একটি মামলায় ঢাকা আদালতে হাজিরা দিতে নেওয়ার সময় পালিয়ে যায় মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেল।
বিচারিক আদালতে রায়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টে আসে। সেসব এখনো শুনানির অপেক্ষায়।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমতি লাগে। সেটাই ডেথ রেফারেন্স। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে থাকেন আসামিরা।
হাইকোর্টে আপিল শুনানি হয় মূলত বছরভিত্তিক। বর্তমানে ২০১৮ সালের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে বলে কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন। দীপন হত্যার রায় হয় ২০২১ সালে। ফলে এসব শুনানির জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হতে পারে।
বিচারিক আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী এ বি এম খাইরুল ইসলাম। তিনি আগামীর সময়কে জানান, রায়ের পর আসামিদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি। ফলে মামলার সর্বশেষ অবস্থা তার জানা নেই।
তবে উচ্চ আদালতে এ মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছিলেন অধ্যাপক হক।
রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে বলা হতো বিচারহীনতার সংস্কৃতির দেশ। এখন বিভিন্ন মামলা চলছে, রায় হচ্ছে। দীপন হত্যার বিচারের রায়ও হয়েছে, এটি একটি ভালো দিক। বিচারের যে রায় হয়েছে তাতে বিচারকই বলেছেন, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করবে। এরপর মামলা যাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। সামনে এই বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় তাড়াতাড়ি কার্যকর হবে— অবশ্যই এটি চাই।’
সে সময় তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘দীপন নেই, আমরা বেঁচে আছি। আমরা দীপনকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছি। দীপনকে কোনো দিন পাওয়া যাবে না। এজন্য কষ্টের-যন্ত্রণার অন্ত নেই। বাবা হিসেবে এই বোধ দারুণভাবে যন্ত্রণা দেয়। তবে এই রায়টি আমাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। আমাদের এখন পারিবারিকভাবে এই সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছু নেই। দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য যেকোনো অপরাধের বিচার হওয়া উচিত এবং যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের যেন শাস্তি হয়।’







