ট্রাইব্যুনালে বডিগার্ডের জবানবন্দি
ইলিয়াস আলী অপহরণ ও গুমে সরাসরি জড়িত জিয়াউল আহসান

জিয়াউল আহসান, ফাইল ছবি
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণ ও গুমের ঘটনায় র্যাবের ইনটেলিজেন্স উইংয়ের তৎকালীন ডারেক্টর জিয়াউল আহসানের সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। দাবিটি করেছেন তার সাবেক রানার (বডি গার্ড) ও সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েস।
আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
আজ রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তার সাক্ষ্য রেকর্ড করেন।
ইমরুল ২০০১ সালে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন। ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত র্যাব হেডকোয়ার্টারের ইনটেলিজেন্স উইংয়ে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। পরে তাকে ইনটেলিজেন্স উইংয়ের ডাইরেক্টরের রানার হিসাবে পদায়ন করা হয়।
বর্ণনায় ইমরুল বললেন, একদিন জিয়া স্যার ফোনে কোনো একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ওই সময় স্যারের ফোনে আরেকটি কল আসলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন’। জিয়া স্যার তারেক সারের সঙ্গে কথা বল শুরু করেন। অপর প্রান্তে কি বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, স্যার আপনাদের কথা মতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।
জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেছেন, ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছে মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে। তবে তার আগে ১৩ এপ্রিলও তাকে অপহরণ ও গুম করার পদক্ষেপ নেওয়া হয় একই জায়গা থেকে। তবে ওইদিন ইলিয়াস আলী মহাখালী ফ্লাইওভার দিয়ে না গেলে তারা ফিরে যান। এ সময় জিয়াউলের সঙ্গে মেজর নওশাদ ও স্কোয়াড্রন লিডার সাইফও ছিলেন।
জিয়াউল আহসানের সঙ্গে এক বছর তিন বা চার মাস ছিলেন ইমরুল। তিনি লক্ষ্য করেন, জিয়াউল বিভিন্নভাবে লোকদের গুম করতেন। এ ছাড়া র্যাব-১ এর টিআইএফ সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। কখনো ধরে নিয়ে গুলি করতেন, কখনো ইনজেকশন পুশ করতেন। এই বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাক্ষী।
আক্ষেপ করে বলেছেন, আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণ নিয়েছি, তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যার জন্য নয়। আমি রানার হিসাবে তার সঙ্গে থেকে দেখেছি, তিনি ওই সময়কালে ১৫০-২০০ জন মানুষকে হত্যা করেছেন।
ইমরুল বলেছেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর 'সারাদেশে অপারেশন রেবেল হান্ট' নামে একটি অপরেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরতে। ওই সময় জিয়াউল আহসান ৮/১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করে। কাউকে ইনজেকশন পুশ করে, আবার কাউকে পোস্তগোলা ব্রিজের নিকট নদীতে নিয়ে মাথায় গুলি করে ভরা সিমেন্টের বস্তার সাথে বেঁধে পানিতে ফেলে দিত।
উল্লেখ করেন তিনি, ২০১২ সালের প্রথম দিকে তিনটি মাইক্রোতে করে ১১ জন আসামি নিয়ে জিয়াউল আহসান পোস্তগোলা আমি ক্যাম্পের দিকে যান। পরে তাদের বোটে করে নদীতে নেওয়া হয়। অন্ধকার রাতে তাদের একইভাবে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় এবং পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। রানার হিসাবে ইমরুলের যোগদানের ২০/২৫ দিনের মাথায় কোনো একদিন রাত পৌনে একটায় জিয়াউল ও অন্য কয়েকজন একটা লাশ নিয়ে গাজীপুরের দিকে যায়। পথে একটা রেল ক্রসিংয়ের কাছে গাড়ি থামিয়ে লাশটি রেল লাইনে রেখে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়।
তিনি আরও জানালেন, জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কয়েকবারের সুন্দরবন অপারেশনে যান ইমরুল। একটি সাজানো অপারেশনে তিনজনকে হত্যা করা হয় বলে জানান তিনি। এ ছাড়া এক অপারেশনে র্যাব-১ এর টিআইএফ সেল থেকে দুই জন আসামিকে নিয়ে জাফলং যান জিয়াউল ও তার টিম। সেখানে সীমান্তে ভারত থেকে দুই জন্য আসামিকে নিয়ে আসেন ৪/৫ সিভিল পোশাক পরা লোক। দুই পক্ষ আসামিদের বিনিময় করেন। ফেরার পথে জিয়াউল নিজে দুই আসামিকে গুলি করে হত্যা করেন এবং পথে ফেলে রাখেন।
তার ভাষ্য, র্যাব-৪ থেকে দুই জন আসামিকে নিয়ে কোনো নিভৃতস্থানে গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল। একজনের মাথায় অনেক চুল থাকায় গুলি করার পর তার মাথায় আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া জিয়াউল র্যাব-৮ এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চরদুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনো দুইজন কখনো তিনজন আবার কখনো চারজন টার্গেট নিয়ে গুলি করে হত্যা করতেন এবং তাদের ও সিমেন্টের বস্তার সাথে বেঁধে নদীতে ফেলে দিতেন। এসময় ছুরি দিয়ে তাদের পেট ছিড়ে ফেলা হতো।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, আজকের এই সাক্ষীর কথায় পরিষ্কার, ইলিয়াস আলী জিয়াউল আহসান কর্তৃক অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। জিয়াউল আহসান এবং তারেক সিদ্দিকীসহ অন্যান্য দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা তিনি গুমের শিকার হয়েছেন। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে আমরা হয়তো পরবর্তীতে জানতে পারব।
তিনি যোগ করেন, আমাদের বলতে দ্বিধা নাই জিয়াউল আহসান আজ কোর্টে উপস্থিত থেকে সাক্ষ্যটা শুনেছেন। আর যতক্ষণ তিনি শুনেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি হাসছিলেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি যে মানুষ খুন করতে পারেন, তার আজকে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে।




