হাইকোর্টের রায়ে পর্যবেক্ষণ
গ্রামীণ কল্যাণের কর্মকাণ্ড কর ফাঁকির ‘ধ্রুপদি উদাহরণ’

হাইকোর্ট। ইনসেটে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ কল্যাণের লোগো
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ‘ন্যায্য রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখেনি’ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’ বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
গ্রামীণ কল্যাণের কাছে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর নিয়ে দায়ের করা দুটি রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আদালত বলেছেন, ‘এটি আবেদনকারীর কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। আবেদনকারী একটি নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া বিষয়কে দীর্ঘায়িত করে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০১৯ সালের ৩৬৩ নম্বর ইনকাম ট্যাক্স রেফারেন্স (আইটিআর) আবেদনে আদেশ প্রদানের পরই বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা সম্ভব ছিল। কিন্তু আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে প্রতিপক্ষকে তার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার জন্য কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখেনি।’
আদালত রায়ে দেখিয়েছেন, দুটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য আরোপিত ৬৬৬ কোটি টাকার আয়করের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হলেও একই প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭-২০১৯ করবর্ষের জন্য একই ধরনের আয়কর দিয়েছে। পরবর্তীকালে সেই আয়করের বৈধতা আদালতে ২০১৯ সালের ৩৬৩ নম্বর ইনকাম ট্যাক্স রেফারেন্সের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করলেও তা প্রত্যাহার করে নেয়।
এ প্রসঙ্গে আদালত বলেছেন, ‘আবেদনকারী তার নিজস্ব অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে ক্রমাগত একই বিষয় নিয়ে কথা বলে চলেছে এবং এই আদালতের আদেশের প্রতি চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনে মরিয়া হয়ে উঠেছে— যা প্রকারান্তরে আদালতের আদেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনেরই শামিল।’
আয়কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া দুটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে গত ১০ সেপ্টেম্বর রায় দিয়েছিলেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি সোমবার প্রকাশিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে।
রায়ে এনবিআরসহ বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তারা আইন অনুযায়ী এবং যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে আবেদনকারীর কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।
রায় প্রকাশের পর ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছিলেন, বিস্তারিত রায় পাওয়ার পর তারা আপিল করবেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ঢাকার কর অঞ্চল-১৪ পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১৭ সালের ৭ ও ১১ সেপ্টেম্বর এবং তাতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর দাবি করে। শুনানির জন্য দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে গ্রামীণ কল্যাণের একটি চুক্তি ছিল, যার অধীনে গ্রামীণ টেলিকম তাদের একটি ব্যবসার অর্জিত লভ্যাংশের (ডিভিডেন্ড) ৪২.৫০ শতাংশ গ্রামীণ কল্যাণকে দিয়ে থাকে। পরে আয়কর কর্তৃপক্ষ আয়কর আইনের সেকশন ১২০ অনুযায়ী ফাইলটি পুনর্মূল্যায়ন করে দেখতে পায়— গ্রামীণ টেলিকম থেকে অর্জিত ওই আয়ের ওপর কোনো উৎসে কর (ট্যাক্স অ্যাট সোর্স) কাটা হয়নি। ফলে নতুন করে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর দাবি করা হয়।
কিন্তু গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তারা উৎসে কর দিয়েছেন। গ্রামীণ কল্যাণ প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে এক মাস সময় চাইলেও তা নাকচ করে কর কর্তৃপক্ষ। পরে পুনর্বিবেচনার আবেদনও খারিজ হলে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে দুটি রিট আবেদন করে। আবেদন দুটিতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য আরোপিত ৬৬৬ কোটি টাকার আয়করের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
রিট আবেদনের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং আয়কর দাবি করা প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে কয়েক দফায় সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ কর কর্তৃপক্ষের দুটি প্রজ্ঞাপন বাতিল করে রুল নিষ্পত্তি করেন। তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ, যে দলটি ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করে।
তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিলের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আপিল বিভাগ রুলটি মেরিটের ভিত্তিতে পুনরায় শুনানি ও নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ শুনানির পর ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দেন হাইকোর্ট।
জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর হাইকোর্ট ওই রায় প্রত্যাহার করে নেয়। তখন ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে ছিলেন ড. ইউনূস।
এরপর মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি নতুন একটি বেঞ্চে পাঠান। ততদিনে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিদায় নেয় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলার ওপর গত ১৪ জুলাই পুনরায় শুনানি শুরু হয়। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর আদালত রুল খারিজ করে রায় দেন।




