উৎপাদনের পথে রূপপুর কিন্তু অনেক প্রশ্ন
- ক্ষতিকর ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ রাশিয়া কীভাবে ফেরত নেবে তা চূড়ান্ত হয়নি
- বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের বিষয়েও হয়নি সুরাহা

ছবি: রোসাটম
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সংকট ও আমদানিতে ডলারের সীমাবদ্ধতার কারণে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট চলছে দেশে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার আলোচনাটি বেশ আশাজাগানিয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটির ক্ষতিকর স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) রাশিয়ায় নেওয়ার চুক্তি হয়নি।
পাশাপাশি বাকি রয়েছে কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগেই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হওয়ার প্রচলিত নিয়ম থাকলেও রূপপুরের ক্ষেত্রে তা ঝুলে আছে এখনো। ফলে কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কত হবে, তা নিয়েও ধোঁয়াশা। সব মিলিয়ে অনেক প্রশ্ন আর সংশয় সঙ্গী করেই উৎপাদনের পথে রূপপুর।
অবশ্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান (রুটিন দায়িত্ব) ড. এম মঈনুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানালেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ চুক্তি সই হবে সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ছাড়া স্পেন্ট ফুয়েল, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. কবির হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও মেলেনি সাড়া।যদিও পরমাণু শক্তি কমিশনের একজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ছাড়া অন্যান্য চুক্তি নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। এখন সবাই ব্যস্ত কত দ্রুত প্রথম ইউনিট চালু করা যায় তা নিয়ে। তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, স্পেন্ট ফুয়েল খুবই ক্ষতিকর। এটি রাশিয়া ফেরত নিয়ে প্রক্রিয়া করে আবার ফেরত পাঠাবে নাকি তারা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করবে? এজন্য ব্যয় কত হবে? সে বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি না হওয়ায় দাম নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, সেটিও কেউ জানে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের বিষয়টিও সুরাহা হয়নি।
তার মতে, যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য এ চুক্তিগুলো আরও আগেই হওয়া দরকার ছিল। এখন তড়িঘড়ি করে এগুলো করলে ভালো ফল আসবে না। আর দেরি না করে বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগেই গুরুত্বপূর্ণ এসব চুক্তি সম্পাদন করে তার শর্তগুলো দেশের মানুষকে জানানো খুবই জরুরি।
স্পেন্ট ফুয়েল অপসারণ চুক্তি
রূপপুরে একবার পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার পর প্রথমে একটানা চলবে দেড় বছর। পরে চলবে দুই বছর পর্যন্ত। এ সময়ের পর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকারিতা হারানোর কারণে এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করে লোড করতে হবে নতুন জ্বালানি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এ ব্যবহৃত জ্বালানিকেই বলা হয় স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত জ্বালানি)।
তীব্র তাপ ও তেজস্ক্রিয়ার কারণে এ স্পেন্ট ফুয়েল মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। স্পেন্ট ফুয়েল সাধারণত কয়েক বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের কুলিং পুলে (জলাধারে) রেখে ঠান্ডা করা হয়। এরপর এগুলোকে বিশেষ ড্রাই ক্যাসকে স্থানান্তরিত করে ব্যবস্থা করা হয় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের। তবে এ স্পেন্ট ফুয়েল দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। তাই রাশিয়া এটি তাদের দেশে নিয়ে যাবে এমন কথা ছিল। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্মতিপত্র সই হলেও স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এখনো।
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি
দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত এবং আমদানি করা বিদ্যুৎ পাইকারি দরে কিনে তা রাষ্ট্রায়ত্ত বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে পিডিবি। বিতরণ কোম্পানিগুলো তা বিক্রি করে গ্রাহকের কাছে। এক্ষেত্রে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগেই প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত হবে, তা নিয়ে পিডিবির সঙ্গে চুক্তি করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। যাকে বলা হয় পিপিএ বা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি।
কিন্তু রূপপুরের ক্ষেত্রে এখনো হয়নি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ, ডিকমিশনিং ব্যয় এবং অন্যান্য বিষয় জড়িত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো এখনো না হওয়ার কারণে সম্ভব হচ্ছে না উৎপাদিত বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ।
পিডিবির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তারা প্রায় দেড় বছর ধরে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করার তাগিদ দিচ্ছেন এবং এ সংক্রান্ত তথ্য চাচ্ছেন। কিন্তু প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মিলছে না সাড়া।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ক্রয়চুক্তির একটা খসড়া তৈরির পাশাপাশি গঠিত হয়েছে কমিটি গঠন। তারা কাজ করছেন এটি নিয়ে। ওই কর্মকর্তার দাবি, অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণ করা বেশ জটিল। কারণ, এখানে নানা ধরনের ব্যয় যুক্ত রয়েছে। তা ছাড়া এটি বাংলাদেশে নতুন। আবার প্রকল্পের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও এখনো হয়নি। এসব কারণেই মূলত দেরি হচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম নিয়ে ধোঁয়াশা
ক্রয়চুক্তি না হওয়ায় এ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম আসলে কত হবে, তা নিয়েও রয়েছে এক ধরনের ধোঁয়াশা। ২০২০ সালের ২২ আগস্ট তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ঈশ্বরদীতে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪ থেকে সাড়ে ৪ টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আবার জানানো হয়, এ দাম ৭ থেকে ৮ টাকা পর্যন্তও হতে পারে।
আর এখন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যে আভাস দিয়েছেন, তাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের শুধু উৎপাদন খরচই হবে ৪ টাকা ৩১ পয়সা। এর সঙ্গে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনার খরচ যোগ হলে দাম কত টাকায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেউই নিশ্চিত করতে পারছেন না। বিদ্যুতের দাম নিয়ে তৈরি হওয়া এ অনিশ্চয়তার বিষয়টি গত ২০ মে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পক্ষ থেকেও উঠে আসে।
গুরুত্বপূর্ণ আরও যেসব চুক্তি বাকি রয়েছে
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্যও পৃথক চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই হয়নি। অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর এগুলো খুবই জরুরি। না হলে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আবার হঠাৎ যন্ত্রাংশের দরকার হলে তা সরবরাহেও জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব চুক্তি সইয়ে দেরির কারণে প্রকল্পের পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে। যার প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুতের দামে।
অডিট ও দুর্নীতির তদন্তের দাবি
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আগে রূপপুর প্রকল্পের একটি সমন্বিত ফরেনসিক, কারিগরি ও জ্বালানি অডিটের দাবি জানান, যাতে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় এবং কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা উদঘাটন করা যায়। একই সঙ্গে রূপপুরের বিস্তারিত ব্যয় বিশ্লেষণ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
তার ভাষায়, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের সময় বিশ্ব জুড়ে অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্ট্যান্ডার্ড বা আদর্শ খরচটুকুই শুধু বিবেচনায় নেওয়া উচিত।







