রাতের শহরে নারীর ভয় ফাঁকা রাস্তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘড়ির কাঁটা রাত ১০টার ঘর ছুঁইছুঁই। রাজধানীর ব্যস্ততা কমে আসছে, নিভছে পথের ঝলমলে আলো। মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের গেট পেরিয়ে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালেন এক নার্স। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর শারীরিক ক্লান্তি ছাপিয়ে তখন তার চোখেমুখে শুধুই অজানা শঙ্কা, দ্রুত ঘরে ফেরার তাড়া। বাসায় পৌঁছানোর জন্য গণপরিবহনই তার একমাত্র ভরসা, কিন্তু এই মধ্য রাতে ফাঁকা বাসে ওঠাটাই যেন নীরব যুদ্ধ।
প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির শঙ্কায় নাম না জানিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘রাত বাড়লে ফাঁকা বাসে পা রাখাটাই এক আতঙ্ক। গাড়ির চালক-হেলপারের অশালীন নজর কিংবা পুরুষ যাত্রীদের অহেতুক গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর চেষ্টা এড়িয়ে বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত মনে মনে শুধু স্রষ্টাকে ডাকি। কাজ করি সম্মানের জন্য, কিন্তু বাড়ি ফেরার এই কয়েকটা কিলোমিটার পথ প্রতি রাতে আমার সম্মান আর নিরাপত্তাকে সুতোয় ঝুলিয়ে দেয়।’ তার এই আকুতি একার নয়; গভীর রাতের ঢাকা কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্তের নাইট শিফট শেষ করা হাজারো কর্মজীবী নারীর গল্পটা ঠিক এমনই। কয়েক বছর ধরে কর্মজীবী নারীদের নৈশকালীন নিরাপত্তাহীনতা ও গণপরিবহনে হয়রানি নিয়ে একাধিক সরেজমিন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী ফিচার প্রকাশ হয়েছে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোয়। সেসব প্রতিবেদনে ঘুরেফিরে ফুটে উঠেছে একই নির্মম বাস্তবতা। দিনের আলো নিভে গেলে আমাদের চেনা শহরটা নারীদের জন্য কতটা নিঃসঙ্গ ও বিপদসংকুল হয়ে ওঠে— বারবার সামনে আসে সেই চিত্র।
একই ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় শীর্ষস্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমের নারী সাংবাদিকদেরও। প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করে তাদের একজন জানালেন, প্রতিদিন বিকালে যার শিফট শুরু হয়, কাজ শেষ হতে হতে রাত গড়ায় সাড়ে ৮টায়। কারওয়ান বাজারের পেট্রলপাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তিনি রামপুরা-বাড্ডাগামী পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করেন, তখন প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি দুঃস্বপ্নের পরীক্ষা। এখান থেকে মেলে না সরাসরি কোনো বাস। যেতে হয় শেয়ারিং সিএনজিচালিত অটোরিকশায়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট অফিসগুলো বেশিরভাগই কাওয়ান বাজারের আশপাশে অবস্থিত। তাই খুব সহজেই অটোরিকশা পাওয়া এখানে ভাগ্যের ব্যাপার, দু-একটি পেলেও হাঁকা হয় দ্বিগুণ-তিন গুণ ভাড়া।
‘ফুটপাত দিয়ে কোনো অচেনা পথচারী একটু দ্রুত হেঁটে গেলেও তার বুক কেঁপে ওঠে— এই বুঝি হাত থেকে ব্যাগটা হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিয়ে গেল কোনো ছিনতাইকারী বা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য! আশপাশের আবছা আলো আর অতিরিক্ত ভিড়ে, রাস্তার আতঙ্ক বুকে চেপে নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তার’— যোগ করলেন তিনি।
নারীদের এই নিত্যদিনের আতঙ্ক শুধু মানসিকভাবে সৃষ্টি অমূলক ভয় নয়; গবেষণার তথ্যও বলছে এর ভয়াবহতার কথা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রধান শহরগুলোয় রাতে গণপরিবহন ও সড়কে পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং নিরাপত্তা ঘাটতি অনুভব করেন প্রায় ৮২ শতাংশ নারী। শুধু শারীরিক আক্রমণই নয়; গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তায় বখাটেদের কুদৃষ্টি, যৌন হয়রানি ও ছিনতাইয়ের ভয় চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে নারীদের জীবন।
একইভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জেন্ডার স্ট্যাটিস্টিকস’ ও সামাজিক জরিপের তথ্যানুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়ার পথে কোনো না কোনোভাবে হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন দেশের ৫০ শতাংশের বেশি কর্মজীবী নারী। বিশেষ করে পোশাকশিল্প, গণমাধ্যম, বেসরকারি হাসপাতাল, কল সেন্টার, রাইড শেয়ারিং ও আইটি খাতে রাতে কাজ করা নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলি, ফ্লাইওভারের গোড়া এবং ওভারব্রিজ লাগোয়া এলাকাগুলোয় পুলিশি টহল শিথিল হয়ে পড়ার সুযোগ নেয় সংঘবদ্ধ অপরাধীরা।
‘একটি সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজে নারী দিন কিংবা রাতে স্বাধীন ও নির্ভয়ে চলাচল করবে— এটাই স্বাভাবিক নিয়ম হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের নগর পরিকল্পনা ও গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনো নারী ও শিশুবান্ধব হয়ে ওঠেনি। প্রশাসনকে শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পর সক্রিয় হলে চলবে না; অপরাধ যেন ঘটার সুযোগই না পায়, সেজন্য জোরদার করতে হবে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’— নৈশ সুরক্ষার বিষয়ে পরামর্শ দিলেন মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল।
নগর বিশেষজ্ঞ ও নারী অধিকারকর্মীদের মতে, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই নারীদের যাতায়াত নিরাপদ করতে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অন্ধকার বা আবছা আলোর সড়ক ও বাস স্টপেজগুলোয় পর্যাপ্ত ‘স্ট্রিট লাইট’ এবং সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা। বিশেষ ড্রপ সার্ভিস ও সংরক্ষিত পরিবহনও জরুরি। গভীর রাতে যেসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা কাজ করেন, সেখানে নিজস্ব ড্রপ সার্ভিসের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) মাধ্যমে নৈশকালীন বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করা দরকার। ছিনতাইপ্রবণ এলাকা, ওভারব্রিজের তলা ও ফ্লাইওভারের সংযোগস্থলে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নজরদারি এবং নিয়মিত টহল বজায় রাখা।
‘রাতে বাড়ি ফেরা কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের টহল দল সার্বক্ষণিক সক্রিয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও ফ্লাইওভারগুলোর কাছাকাছি এলাকায় চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। রাতে যাতায়াতের সময় কোনো নারী নিজেকে অনিরাপদ মনে করলে তাৎক্ষণিক ৯৯৯-এ যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো হেনস্তা বা ছিনতাইয়ের শিকার হলে থানায় অভিযোগ করার পর নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা’— পরামর্শ দিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ফারুক আহমেদ।



