দিনে মাত্র দুই ট্রিপ, স্বস্তি মেলেনি গোলাপি বাসে

ছবি : আশিকুর রহমান
ধাক্কাধাক্কি, বসার জায়গা না পাওয়া আর পুরুষ সহযাত্রীর কনুইয়ের গুঁতো— ঢাকার রাজপথে গণপরিবহন ব্যবহার করা নারীদের জন্য এগুলো নিত্যভোগান্তির নাম। এই জ্বালা এড়িয়ে একটু নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর আশাও যেন ঢাকার নারীদের জন্য আকাশকুসুম কল্পনা। সেই কল্পনায় একটুখানি স্বস্তি দিতে যাত্রা শুরু করেছে নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘গোলাপি বাস’। অথচ টানা দুই দিন তপ্ত শহরের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকে বোঝা গেল, এই গোলাপি বাস আসলে খুব একটা স্বস্তির নয়; বরং রাজপথের এক ‘গোলাপি তামাশা’।
রাজধানীতে প্রতিদিন হাজারো নারী যেখানে চলন্ত বাসের দরজায় ঝুলে ওঠার আকুল চেষ্টা করছেন, সেখানে গোলাপি বাসগুলো রাজপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে মোটামুটি ফাঁকা অবস্থায়। নারীদের জন্য এই বিশেষ বাসের চাকা ঘোরে; কিন্তু যাত্রী পায় না। আবার যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকে; কিন্তু বাস পায় না। এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের নামই ঢাকার ‘পিঙ্ক বাস’ সার্ভিস। নামকাওয়াস্তে একেকটি বাস দিনে মাত্র দুটি ট্রিপ দেয়— সকালে আর বিকালে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ভাষ্য, দুপুরে যাত্রী থাকে না, তাই বাসও চলে না। কিন্তু সারা দিনের ব্যস্ত শহরে নারীদের জন্য মাত্র দুইবেলার বাস; আসলেই সার্ভিস নাকি স্রেফ তামাশা সেই প্রশ্ন অনেকেরই।
নারীদের জন্য বিআরটিসির ‘গোলাপি বাস’-এর যাত্রা শুরু ছাড়া কোনো স্টপেজে থামার নির্দিষ্ট সময় নেই। ফলে দূর থেকে দেখা গেলেও বাসে উঠতে পারেন না অনেক নারীই। গতকাল বিকাল ৫টার দিকে মতিঝিল রাজউক অ্যাভিনিউতে গিয়ে দেখা গেল নারী বাসে কোনো যাত্রী নেই তখনো। সচিবালয় থেকে তালতলাগামী এই বাসটি ছাড়ে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে। গতকালও সেই সময়েই ছাড়ে বাসটি। তখন দোতলা বাসটির নিচতলায় মোট ১৪ জন যাত্রী ছিলেন। আর ওপরতলায় মোটে তিনজন। অথচ বাসটির নিচে সিট ৩২টি আর ওপরে ৪৫টি। তবে মতিঝিল আসতে আসতে নিচে যাত্রীর সংখ্যা বাড়ে। বাসটির নারীচালক এস কে ফাহিমা সানজা কথা বলতে রাজি হননি। জানালেন, বিআরটিসি থেকে তাদের কথা বলার নিষেধাজ্ঞার কথা। তবে কথা হলো চালকের সহকারী হনুফার সঙ্গে। জানালেন, ২০০৯ সাল থেকেই তিনি বিআরটিসির নারীদের জন্য বরাদ্দকৃত বাসে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কথা বলতে বলতেও সবার দিকে খেয়াল রাখছিলেন তিনি। একজন অন্তঃসত্ত্বা যাত্রী উঠতেই বলে উঠলেন, ‘উনি প্রেগন্যান্ট, ওনাকে বসতে দিন।’
কথা হলো বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে। একজন মুগদা এলাকার বাসিন্দা জান্নাত। দুজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এসেছেন ‘গোলাপি বাস’ দেখতে। আরেক যাত্রী চাকরি করেন জনতা ব্যাংকে। জানালেন, আগে নারী বাস থাকলেও লাল রঙের জন্য আলাদা করা যেত না। এখন রঙ আলাদা হওয়ায় চেনা যায়। সারা দেশেই এমন বাস চালু হলে ভালো হবে।
তবে বাস আলাদা হয়েও নারীদের মুক্তি নেই ইভটিজারদের হাত থেকে। ‘গোলাপি বাস’-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাজীপুর পরিবহনের একটা বাসের চালক ব্যঙ্গাত্মক উক্তি ছুড়ে দিলেন নারীচালকের দিকে। আর এমন বাক্যবাণ অহরহই শুনতে শুনতে পথ চলেন গোলাপি বাসের চালক, তার সহকারী থেকে যাত্রীরাও।
গত ১৮ আগস্ট দেশের নারীদের জন্য চালু হয় এই বাস সার্ভিস। বর্তমানে ১০টি বাস চলছে ঢাকায়। যেগুলো মোট ২০টি ট্রিপ দেয়। যা অপর্যাপ্ত— বলছেন যাত্রীরা।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাস্তায় বাসের সংখ্যা কম থাকলে এই প্রকল্প এমনিতেই মুখ থুবড়ে পড়বে। একটি বাস যদি একটি রুটে মাত্র একটি ট্রিপ দেয় তাহলে নিশ্চয়ই একজন নারী ওই বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অপেক্ষা করবেন না। তারও তো বাসায় ফেরার তাড়া রয়েছে। তিনি তখন চোখের সামনে যে বাস পাবেন সেটাতেই উঠবেন। এ ছাড়া যদি বাসের স্টপেজ এবং সময় নির্ধারিত না থাকে তাহলেও এই বাস তার চাহিদা হারাবে। পরে যাত্রী না পাওয়ার অজুহাতে বিআরটিসি আবার এই বাস বন্ধ করে দেবে। এটা আসলে একটা ছল ছাড়া আর কিছুই নয়।’
বাসের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ছিল বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার কাছে। তিনি বললেন, ‘বাসের সংখ্যা কম বলেই রাস্তায় কম দেখা যায়। যাত্রীরা এই বাস সম্পর্কে জানতে পারলেই ক্রমশ যাত্রী বাড়বে।’ প্রতি বাসের মাত্র দুটি ট্রিপের বিষয়ে তিনি জানালেন, যাত্রীরা অভ্যস্ত হয়ে গেলে তখন ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হবে। তাছাড়া দুপুরে রাস্তায় কোনো যাত্রী থাকে না; তখন ট্রিপ দিলে খালি বাস চালাতে হবে, এটাও যোগ করলেন তিনি।






