রামিসা খুনের পর চার দিন নিরুদ্দেশ ছিলেন ডলার

রামিসা হত্যা মামলা— এতদিন যে মামলায় একমাত্র খলনায়ক ছিলেন সোহেল রানা, সেই মানুষটিই হঠাৎ সামনে নিয়ে আসেন নতুন এক নাম— ‘ডলার’। কে এই ডলার? কেন এতদিন তার নাম কোথাও শোনা যায়নি? আর কেনইবা বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর হঠাৎ তাকে সামনে এনে অভিযোগ তুললেন সোহেল?
সোহেলের বক্তব্যের পর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার অলিগলিতে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। স্থানীয়দের কেউ বলছেন, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে সোহেলের সঙ্গে একই বাসায় ছিলেন ডলার হোসেন। কেউ বলছেন, ঘটনার পর কয়েক দিন এলাকায় দেখা যায়নি তাকে। আবার ডলারের স্বজনরা বলছেন, সবই সাজানো গল্প; মূল আসামি নিজের দায় এড়াতেই নতুন নাটক সাজাচ্ছেন।
চাঞ্চল্যকর এ মামলার নতুন মোড় ঘিরে এখন প্রশ্ন একটাই— সোহেলের আদালত কক্ষের চিৎকার কি সত্যিই কোনো অজানা তথ্যের ইঙ্গিত, নাকি এটি বিচার প্রক্রিয়া ভিন্ন খাতে নেওয়ার একটি মরিয়া চেষ্টা?
রাজধানীর পল্লবীর আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দিন রাতে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার সঙ্গে ডলার রাতভর ইয়াবা সেবন করেছেন বলে এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া রামিসা হত্যার পর থেকে চার দিন এলাকায় ছিলেন না ডলার। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তাকে এলাকায় চলাফেরা করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যদিও শিশুটিকে হত্যায় ডলারের কোনো যোগসাজশ আছে কি না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে ডলারের স্বজন ও এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, সোহেলের কথার কোনো ভিত্তি নেই। মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত করতেই এসব অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।
গত ১৯ মে সকালে মিরপুরের সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলা এ ঘটনায় শিশুর বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি করা হয়।
বিচার কার্যক্রম শুরুর দিন আদালতে তোলার সময় সাংবাদিকদের সামনে বারবার ডলারের নাম উচ্চারণ করেন সোহেল। তার দাবি, ডলারই মূল অপরাধী এবং হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকেই দায়ী করা উচিত। সোহেলের এ বক্তব্যের পর অনুসন্ধানে নামে আগামীর সময়।
জানা গেছে, মিরপুর-১১ নম্বরের বি-ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ৭ নম্বর লেনের বাসিন্দা ডলার। স্থানীয় সূত্র বলছে, তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। পেশায় অটোরিকশাচালক এবং দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৭ নম্বর লেনের ৫২ নম্বর বাড়িটি ডলারদের পারিবারিক। যে বাসায় রামিসার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে, সেখান থেকে মাত্র চার-পাঁচটি বাড়ি পরই ডলারদের বাড়ি। একসময় গুলিস্তানের পীর ইয়ামেনী মার্কেটের একটি পাঞ্জাবির দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন তিনি। পরে চাকরি হারিয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। সে সময়ই গ্যারেজ মেকানিক সোহেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এলাকার এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, সোহেল ও ডলার নিয়মিত একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করতেন। ডলারের অটোরিকশাও সোহেলের গ্যারেজে রাখা হতো। তাদের বন্ধুত্ব এলাকার অনেকেরই জানা ছিল।
সিএনজি ব্যবসায়ী মো. ফাইয়াজ দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে সোহেলের বাসায় ছিল ডলার। তিনি বলেছেন, ‘শোনা যায়, তারা সারা রাত ইয়াবা সেবন করেছে। ডলার নিজেও নাকি বলেছে, সকাল ৬টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিই সে বের হয়েছিল, নাকি ভেতরেই ছিল— সেটা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।’
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় চার দিন এলাকায় দেখা যায়নি ডলারকে। আন্দোলন, মানববন্ধন কিংবা প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও তাকে দেখা যায়নি। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আবার এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়।
তবে ডলারের বড় ভাই মানিক বলেছেন, ‘আমার ভাইয়ের নামে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই।
অন্যদিকে ডলারের আরেক ভাই সেলিম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চার ঘণ্টায় ১৬ জনের সাক্ষ্য: ‘...খাট উঁচু করলে দেখি বালতির ভেতর রামিসার মাথা। তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’ শিশু রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিন এসব বলছিলেন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। গতকাল মঙ্গলবার ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। দুই ধাপে ৪ ঘণ্টা ১০ মিনিটে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। গতকাল ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন। এরপর আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করেছেন বিচারক। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর রায় ঘোষণা করবেন আদালত।
গতকাল সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহত শিশু রামিসা আক্তারের বাবা ও মামলার বাদী আবদুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুফুু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, চতুর্থতলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয়তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, এসআই ইকবাল হোসেন, চিকিৎসক নাসাদ জাবিন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান। এদিন দুই আসামিকে বিচারিক আদালতে তোলা হয়।
সব সাক্ষীকে গতকাল জেরা করেছেন আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ। তখন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী ও বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলুও ছিলেন।




