বর্ষণে দুর্ভোগ
‘দোকান খুলতে না পারলে কিস্তি দেব কীভাবে?’

ফুটপাতে ভ্যানে জিনিসপত্র বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে জলাবদ্ধতা- আগামীর সময়
টানা বৃষ্টি আর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত রাজধানীর জনজীবন। বিশেষ করে খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষ ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের ওপর নেমেছে চরম দুর্ভোগ। গতকাল শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এবং আজ রবিবার সকালের টানা বর্ষণে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা গুলিস্তানে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তাতে সারা দিনের রুটি-রুজি বন্ধ হয়েছে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের সামনে দীর্ঘ দুই বছর ধরে ভ্যানে কাপড় বিক্রি করেন ব্যবসায়ী জাকির আলী। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বেচাকেনা করে যার সংসার চলে, আজ তিনি নিরুপায়। সকালে বৃষ্টিতে ভিজেই দোকান খুলতে এসেছিলেন। ভেবেছিলেন সাধারণ বৃষ্টির মতো কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি নেমে যাবে। কিন্তু এসে দেখেন বসার জায়গায় জমে আছে হাঁটু পানি। ফলে একটি অস্থায়ী দোকানও খোলার মতো অবস্থা ছিল না। দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টি, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। তবুও পুরোপুরি নামেনি পানি। কাপড় রাখার চকিটি এখনো পড়ে আছে বাঁধা অবস্থায়। মালামাল নিরাপদে রাখার জন্য সরিয়েছেন অন্য এক দোকানে।
হতাশা প্রকাশ করে জাকির আলী জানালেন, অসুস্থ থাকলেও তিনি কখনো দোকান বন্ধ করেন না। এসে বসে থাকেন। কিন্তু বৃষ্টিতে পানি জমে থাকার কারণে আজ সারা দিন ধরেই দোকান খুলতে পারছেন না। সন্ধ্যা নাগাদ পানি নামলেও যে কাদা হবে, তাতে কাস্টমার আসতে চাইবে না। আজ সারা দিনে তার এক টাকাও বিক্রি হয়নি।
এই ব্যবসা দিয়েই স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ের সংসার চলে জাকির আলীর। বড় ছেলে বিয়ের পর এখন আলাদা থাকেন। পুরো পরিবারের দেখাশোনা তাকেই করতে হয়। চলতি বছর মেয়ের বিয়ের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। ৯ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে দিতে হয় কিস্তি। এর বাইরে রয়েছে সংসারের অন্যান্য খরচ। স্বাভাবিক দিনে সব মিলিয়ে ১ হাজার টাকার মতো লাভ হলেও আজকের শূন্য বিক্রিতে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। আক্ষেপ করে বললেন, ‘এভাবে যদি আরও ২-৩ দিন বৃষ্টি হয়, তাহলে কিস্তি দেওয়ার টাকাই থাকবে না। পরিবার নিয়ে চলব কী করে।’
ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের এই চিত্র শুধু গুলিস্তানেই নয়। এর আগে দুপুরে রাজধানীর ইংলিশ রোডে জলাবদ্ধতার ফলে বিভিন্ন দোকানের ভেতর পানি ঢুকতে দেখা যায়। এতে বিপাকে পড়েন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। স্টিল বিক্রির অনেক দোকান বন্ধ রাখতে দেখা যায়। আবার কেউ কেউ দোকান খুললেও তাদের চোখে-মুখে ছিল চরম হতাশার ছাপ।
ইংলিশ রোড মোড়েই চা-পাউরুটি বিক্রি করেন রতন দাশ। হাঁটু পানিতেই সকাল থেকে দোকান খুলে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। নিজের দুর্দশার কথা জানিয়ে রতন দাশ বললেন, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যেখানে তার প্রায় ১২০০ টাকার মতো বিক্রি হয়, সেখানে আজ মাত্র ৩০০ টাকার মতো বিক্রি হয়েছে। আশপাশের চেনা দোকানিরা এই পানিতে কষ্ট করে আসছেন বলেই এই সামান্য বিক্রিটুকু সম্ভব হয়েছে।’ বেচাকেনা না হওয়ায় আগামীকালই বেকারির মালগুলো ফেরত দিয়ে দিতে হবে বলে জানান এই চা বিক্রেতা।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টিপাত হতে পারে। সংস্থাটির তথ্যমতে, আজ রবিবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ঢাকায় ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে বৃষ্টি হয়েছে ৯৭ মিলিমিটার।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঢাকায় আজও থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে রাজধানীর নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তবে আগামী পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া গেছে। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানিয়েছেন, আগামী আরও দুই দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ধীরে ধীরে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে শুরু করবে। আগামী মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।






