ঢাবির ভাষা ইনস্টিটিউটের ফারসি বিভাগে গণিত বিশেষজ্ঞকে নিয়োগের চেষ্টা
- আছে নারী পাচারে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
- ড. মাঈন উদ্দিনকে নিয়োগ দিতে বিশেষ সুপারিশপত্র পাঠিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা
- ফারসি ভাষায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষককে বাদ দেওয়ার অভিযোগ

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফারসি বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সংশ্লিষ্ট একটি মহলের অভিযোগ, বিভাগটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপকের আবেদন করলেও নারী পাচারে অভিযুক্ত ইরানের জামিয়া আল মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির অবৈধ বাংলাদেশ শাখার পরিচালককে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
জানা যায়, বিভাগটিতে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আর এ পদে আবেদন করেছেন আল জামিয়া আল মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির অন্যতম পরিচালক ড. মাঈন উদ্দিন। যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ও এমফিল করেছেন গণিতে। এছাড়া তিনি ইরানের কোম থেকে ধর্মীয় শাস্ত্রে পড়াশোনা করলেও ভাষা ও সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কোন ডিগ্রী নেই।
বাংলাদেশে গোপনে প্রায় দেড় যুগ ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া আল মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদেরকে সুন্নি থেকে শিয়া বানিয়ে ইরানে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবৈধ শাখা বন্ধ করতে ইউজিসির নিকট উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন প্রতারণার শিকার ড. সামিউল হক সরকার নামে এক ব্যক্তি।
ড. সামিউল হক সরকার ইউজিসির কাছে করা অভিযোগে বলেছেন, তিনি ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশে ফেরত আসেন এবং এই অবৈধ শাখায় খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিছুদিন পর তিনি বুঝতে পারেন, এই শাখার কর্তৃপক্ষ এবং সব শিক্ষক একেবারেই ধর্মীয় জ্ঞানশূন্য। শুধু তাই নয়, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে ছড়ানো তথ্য এবং বাস্তবতার মধ্যে মিল নেই। বিগত ১৪ বছর ধরে তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে তথ্য গোপন করে, চুপিসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখাটি চালিয়ে আসছেন।
সামিউল জানিয়েছেন, এই শাখা থেকে বেছে বেছে সুন্দরী মেয়েদের কৌশলে ইরানে পাচার করা হয়। তিনি জঙ্গি সংগঠনের মদদ দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর তথ্যের ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করেন।
উকিল নোটিশে উল্লেখ করা হয়, এটি একটি নারী পাচারকারী চক্র তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বাংলাদেশের কোথাও এক জন ছেলের জন্য তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বেলা বিনামূল্যে থাকা খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করেনি।
ওই অভিযোগে ড. সামিউল হক বলেছেন, নারী কেলেঙ্কারির একটি বিষয়ে ব্যাপকভাবে জনশ্রুতি আছে যে, অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনচার্জ আশরাফের ছোট বোন যিনাত ফেরদৌস ইরান রাষ্ট্রের প্রভাবশালী মোল্লাদের সঙ্গে তথাকথিত ‘মোতা-বিবাহ’ নামক চুক্তিভিত্তিক যৌন বাণিজ্য করে থাকেন।
জানা গেছে, ড. মাঈন উদ্দিনকে নিয়োগ দিতে ইনস্টিটিউটে বিশেষ সুপারিশপত্র পাঠিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। এমনকি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক ড. আবু মুসা মাহমুদ আরিফ বিল্লাহকে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে এক্সটেনশন এর আবেদনপত্র গ্রহণে অনীহার অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. আবসার কামালের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদ এ বিষয়ে বলেছেন, দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে পড়াশোনা করা মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বা দ্বিতীয় হয়ে, অনেক কষ্ট করে এবং অন্য চাকরির সুযোগ ত্যাগ করে ইরান কিংবা দেশে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি আরো বলেছেন, গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে তোলেন এবং একদিন ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন লালন করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের অভাবে তারা দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় ভুগছেন।
ড. মুমিত আল রশিদ বলেছেন, এসব শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি মনে করেন, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন ভিত্তিতে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা উচিত। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে এসব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ নিশ্চিত করাকে তিনি নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন।
তিনি আরও বলেছেন, এর ব্যতিক্রম হলে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছে বিভাগের শিক্ষকদেরও প্রতিনিয়ত জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
নারী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে ড. মাঈন উদ্দিন বলেছেন, এসব আজেবাজে কথা। আমরা অনেকদিন ধরে এখানে আছি। আমরা ২০০৮-০৯ সাল থেকে আছি। এই ধরনের কোন ইস্যুই নেই।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ব্যাপারে তিনি বলেছেন, আমি ইরান থেকে ৯ মাসের ফারসি কোর্স তো করেছিই এবং ৪০ টা বই অনুবাদ করেছি, অনেক আর্টিকেল লিখেছি। আমার কোন ঘাটতি নেই। তিনি ভাষা ও সাহিত্য সহ সব ক্ষেত্রেই বই অনুবাদ করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
একই পদে আবেদনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ও উর্দু ভাষা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ অভিযোগ করে বলেছেন, নিয়াজ আহমেদ খান প্রশাসনের সময় আমি আবেদন করেছিলাম কিন্তু আমাকে বাদ দেওয়ার পাঁয়তারা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নিয়াজ আহমেদ স্যার তার নিজ হস্তক্ষেপে আমার যোগ্যতা দেখে আমাকে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেন। কিন্তু এখন আর আমার নিয়োগ এক্সটেনশন করা হচ্ছে না। আগের সেই সিন্ডিকেটই আমার বিরুদ্ধে এখন আবার সক্রিয় হয়েছে বলে আমি মনে করি।
তিনি আরো বলেছেন, আমি এখনও আশাবাদী যে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ ইংল্যান্ড, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া চীনের খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমার দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে ভঙ্গুর ফার্সী বিভাগকে শক্তিশালী করার সুযোগ দান করবেন। ভিসি বদলের সাথে সাথে ভাগ্য বদল এই অশুভ প্রবনতাকে পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, দিনশেষে প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. আবছার কামাল বলেছেন, আবেদন তো যে কেউই করতে পারে। আমরা তো আর কাউকে বাধা দিতে পারি না। উক্ত অভিযোগগুলির ব্যাপারে তিনি খতিয়ে দেখবেন বলে ইঙ্গিত দেন।
ড. আবু মুসা মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, তিনি ওভার কোয়ালিফায়েড। তাকে দিয়ে আরো হায়ার স্টাডিজ কোর্স পড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।




