আইসিটি বিভাগ
অপরিকল্পিত প্রকল্পে পরিকল্পিত দুর্নীতি
- সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার অডিট অনিষ্পন্ন
- ৭ সংস্থার ও কোম্পানির সবগুলোতে অনিয়ম
- বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ অনিয়মের শীর্ষে, তাদের নিয়ে আপত্তি ১৪১২ কোটি টাকার

অনিয়মের শীর্ষে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্লোগানে গত এক যুগে দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই খাতে বিভিন্ন অপরিকল্পিত প্রকল্পে পরিকল্পিত দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আইসিটি বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খাতের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অডিট আপত্তি অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কাছে এসব অডিটের বিশদ প্রতিবেদন তলব করে তা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ খাতে কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকলে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা করারও নির্দেশনা দিয়েছে সংসদীয় কমিটি। অন্যদিকে, এই বিশাল অঙ্কের অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অডিট অধিদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও চাহিদার সঠিক মূল্যায়ন ছাড়াই মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। উল্টো সরকারি তহবিল অপচয় এবং আর্থিক শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। সেজন্য শুধু সভা বা চিঠি চালাচালি করে এই বিশাল আর্থিক অনিয়মের সুরাহা করা সম্ভব নয়। আইসিটি খাতের প্রতিটি অমীমাংসিত অডিট আপত্তির সুনির্দিষ্ট কারণ উদঘাটন করে এবং অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেই শুধু রাষ্ট্রের এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অডিট আপত্তির প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সৃষ্টির শুরু থেকে ১ হাজার ৬৮৪টি অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হলেও এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৭০টি। ৭১৪টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। যার আর্থিক হিসাব মোট ৩ হাজার ৪২১ কোটি ৯১ লাখ টাকা। সরকারের বিপুল পরিমাণ এই অর্থের অডিট আপত্তি অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে থাকায় বৈঠকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কমিটির সদস্যরা।
মন্ত্রণালয়ের
তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘বিজ্ঞান
এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়’ নামকরণ করে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট
সরকার। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ
মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ’
গঠন করে। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর এই বিভাগকে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে’
উন্নীত করে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১৪ সালে আবার সরকার গঠন করে ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে এর অধীনে ‘তথ্য ও যোগাযোগ
প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ’ এবং ‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ’
নামে আলাদা দুটি বিভাগ গঠন করে তৎকালীন সরকার। সেই হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে চলতি
বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায়ে এক যুগের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের
অডিট আপত্তিগুলো তুলে ধরা হয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিটি বিভাগের অধীনে সাতটি সংস্থা ও কোম্পানি রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আর্থিক অনিষ্পত্তির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০৯টি অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তির বিপরীতে আর্থিক সংশ্লিষ্টতার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪১২ কোটি ৯০ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এরপরই রয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর। এই সংস্থার ১৪০টি অনিষ্পন্ন আপত্তিতে রয়েছে ৯৪১ কোটি ৬০ লাখ ৩ হাজার টাকা। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) ১৯০টি অনিষ্পন্ন আপত্তিতে আর্থিক বিষয় জড়িত রয়েছে ৬৬৭ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার টাকার। বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের ২০টি অনিষ্পন্ন আপত্তিতে ২৬২ কোটি ৪৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা। ‘এটুআই’র ৬৩টি অনিষ্পন্ন আপত্তিতে রয়েছে ৬০ কোটি ২১ লাখ টাকার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ৭১টি অনিষ্পন্ন আপত্তিতে ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ৩১ হাজার টাকা রয়েছে। সিসিএ কার্যালয়ের ১৩টি অনিষ্পন্ন আপত্তি ১৯ কোটি ৭০ লাখ ৪২ হাজার টাকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির পঁাচটি অনিষ্পন্ন আপত্তিতে ১ কোটি ৯২ লাখ ১ হাজার এবং স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেডের তিনটি অনিষ্পন্ন আপত্তি রয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার।
আইসিটির মতো একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিপুল এই আর্থিক অডিট আপত্তি বছরের পর বছর পড়ে থাকাকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও সুশাসনের চরম সংকট হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন অপরিকল্পিত প্রকল্পে পরিকল্পিত দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে তারা বলছেন, মেগা প্রকল্পের নামে অপরিকল্পিত ব্যয়, ঠিকাদার নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি, বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব অডিট আপত্তির কার্যকর সুরাহা করা হয়নি বলেও মত তাদের। সেজন্য অবিলম্বে এসব আপত্তি নিষ্পত্তি করে রাষ্ট্রের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আইসিটি খাত বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা আগামীর সময়কে বললেন, বিগত এক যুগের বেশি সময় আইসিটি খাতে নানা লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই লুটপাটে জড়িত। বিভিন্ন প্রকল্পের পিডি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই তারা এ খাতে লুটতরাজ চালিয়েছে। ফলে বারবার আপত্তি জানানোর পরও প্রভাবশালীদের চাপে এসব অডিটের নিষ্পত্তি হয়নি। সেজন্য যাদের হাত ধরে আইসিটি খাতে দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়েছে, সেই আমলাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের আমলে পুরোটা সময় আইসিটি খাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। তৎকালীন প্রভাবশালীদের চাপে এ খাতের অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি না করে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কমিটির বৈঠকে এসব খাতের অডিট আপত্তিগুলোর একটা হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। তবে সেই আপত্তিগুলোর বিস্তারিত হিসাব তলব করা হয়েছে। আগামী বৈঠকে সেগুলো তুলে ধরার জন্য মন্ত্রণালয়কেও বলা হয়েছে। পাশাপাশি অডিটগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য বলা হয়েছে। অডিট নিষ্পত্তি না হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা করা হবে।
এদিকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক এই অডিট নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা আগামীর সময়কে জানালেন, আইসিটি বিভাগের মাধ্যমে নিয়মিত সুপারিশসহ অডিট আপত্তির জবাব পাঠানো, অডিট অধিদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় রক্ষা করার কথা। তার ভাষ্য, ‘অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে আমরা অডিট অধিদপ্তরগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং ত্রিপক্ষীয় সভা করছি। সব সংস্থাকে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি কার্যক্রম জোরদার করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা বিভাগ থেকে সেগুলো তদারকি করছি।’




