টাকার বিনিময়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থী!
- সিআইডির তদন্তে মিলছে সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি চাকরি যেন তাদের কাছে ছিল ‘কেনাবেচার পণ্য’। পরীক্ষার হলে প্রকৃত প্রার্থীর বদলে বসানো হতো প্রক্সি পরীক্ষার্থী। লিখিত থেকে ব্যবহারিক, এমনকি মৌখিক পরীক্ষায়ও অন্যরা অংশ নিতেন। বিনিময়ে নেওয়া হতো মোটা অঙ্কের টাকা। এভাবেই প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চক্রটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাসহ তিন সরকারি চাকরিজীবীকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির নোয়াখালী জেলা ইউনিট।
গ্রেপ্তাররা হলেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নুরন্নবী (৫৫), লক্ষ্মীপুরের মো. সোহেল (৪০) এবং হাতিয়ার জুলফিকার আলী ওরফে রায়হান (২৯)।
সিআইডি জানিয়েছে, নুরন্নবী ও সোহেল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে কর অঞ্চল-২, বিভাগীয় কর কমিশনারের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত। আর জুলফিকার আলী কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
আজ শুক্রবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পৃথক অভিযান চালিয়ে নুরন্নবী ও সোহেলকে আগ্রাবাদের কর অঞ্চল-২ কার্যালয় থেকে এবং জুলফিকার আলীকে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে ঢাকার উদ্দেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার করা হয়। আজ তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে বেরিয়ে আসে জালিয়াতির রহস্য
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অনুমোদনের ভিত্তিতে কর অঞ্চল-নোয়াখালীতে গ্রেড-১৩ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। গত ৫ জুন নোয়াখালীর তিনটি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা। পরে লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে ১১২ জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। চূড়ান্ত নিয়োগের আগে ২১ জুন প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই সময় আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে দুই প্রার্থীর হাতের লেখায় অসংগতি ধরা পড়ে।
অফিস সহায়ক পদে মনোনীত মো. কামাল উদ্দিন এবং অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে মনোনীত মো. নাসফুরুল্লাহর স্বহস্তে লেখা তথ্যের সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার সময় পূরণ করা চেকলিস্টের হাতের লেখার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলে তাদের দিয়ে পুনরায় একই লেখা লিখিয়ে নেওয়া হয়। তাতেও স্পষ্ট অমিল ধরা পড়ে।
জিজ্ঞাসাবাদে কামাল উদ্দিন স্বীকার করেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় তিনি নিজে অংশ নেননি। তার পরিবর্তে অন্য একজন প্রক্সি পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিলেন। নাসফুরুল্লাহও জানান, লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষায় তার পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন। পরদিন, ২২ জুন পুনরায় যাচাইয়ের সময় মো. সুজনের হাতের লেখাতেও একই ধরনের অসংগতি পাওয়া যায়। এ সময় তার সঙ্গে থাকা রাশেদ উদ্দিন কৌশলে পালিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদে সুজনও প্রক্সি পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় শুরু থেকেই মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে সিআইডির নোয়াখালী জেলা ইউনিট। পরে মামলাটি সিআইডির তফসিলভুক্ত হলে তদন্তভার গ্রহণ করে সংস্থাটি। এ ঘটনায় ২২ জুন সুধারাম মডেল থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় কামাল উদ্দিন, নাসফুরুল্লাহ ও সুজনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। এর আগে এ মামলায় আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ নুরন্নবী, সোহেল ও জুলফিকার আলীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলায় এজাহারনামীয় মোট ছয় আসামি গ্রেপ্তার হলেন।
সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ‘প্রক্সি’ বাণিজ্য
সিআইডির ভাষ্য, গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্য এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান মিলেছে। চক্রটির সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে প্রকৃত প্রার্থীদের হয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করতেন। শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই নয়, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। অর্থের বিনিময়ে মেধা ও যোগ্যতার বদলে প্রক্সি পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল চক্রটির অন্যতম কৌশল।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, চক্রটির পরিধি আরও বড় হতে পারে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহকারী ও এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু তালেব জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী বসানোর এই চক্রের শিকড় আরও গভীরে বিস্তৃত হতে পারে। ফলে তদন্ত এগোলে চক্রটির সঙ্গে জড়িত আরও ব্যক্তি এবং অতীতে অনুষ্ঠিত অন্য নিয়োগ পরীক্ষায় তাদের কর্মকাণ্ডের তথ্যও সামনে আসতে পারে। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।






