অন্যের মৃত্যুতে ভর করে বাঁচেন তারা

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
রাত তখন সাড়ে ১২টা, শাহবাগ থেকে চড়েছি রিকশায়। গন্তব্য মোহাম্মদপুর। ক্ষণিক আগে একপশলা বৃষ্টি নামায় রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। কিন্তু ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালের সামনে হঠাৎ জট। বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট কার, একটি লাশবাহী গাড়ি আর কিছু রিকশা। আমাদের রিকশাটা দাঁড়িয়েছে লাশবাহী গাড়িটির পাশে। ওই গাড়ির চালকের দরজাটা আধো খোলা, চালকের আসনে বাইরে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন ২৮-৩০ বছরের এক যুবক; কথা বলছেন মাঝবয়সী এক লোকের সঙ্গে।
যুবকটি গাড়িটির চালক আর মলিন চেহারার মাঝবয়সী লোকটি তার বাবার মরদেহ নিয়ে যাবেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে, পদ্মাপাড়ের কোনো এক গ্রামে। চালক তেলসংকটের অজুহাতে ভাড়া দাবি করছেন যৌক্তিকের দ্বিগুণ; সদ্য বাবা হারানো এক ছেলের সামর্থ্যের অনেক বেশি। তবুও ‘সামর্থ্যহীনতার স্বীকারোক্তি’ দিয়ে কিছু বলতে শুরু করেছিলেন লোকটি। চালক তাকে থামিয়ে বলছিলেন, ‘আপনার বাপ মরছে, আপনার দুঃখ আছে, শোক আছে। আপনার জন্য আমারও কষ্ট হয়। কিন্তু ভাই, কেউ মরলে ট্রিপ পাই। গাড়ির চাক্কা ঘোরে। যা পাই তা দিয়ে...’
এরই মধ্যে সড়কের জট খোলায় এগিয়ে যায় আমাদের রিকশা। তাদের পরের কথোপকথন আর শোনা হয়নি। লাশবাহী গাড়ির চালক সেদিন হরিরামপুরে গিয়েছিলেন কি না জানা হয়নি আর। তবে তার কথাটি মাথায় ঘুরেছে অনেক দিন। একজন স্বজনহারা মানুষকেও ভীষণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারেন তিনি!
ওই ঘটনার কয়েক দিন পরের এক সন্ধ্যা। কেরানীগঞ্জের এক গ্রামের চার রাস্তার মোড়। চায়ের দোকানে পরিচিত কয়েকজনের মধ্যে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ একটি লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যান থামে দোকানের সামনে।
চালক গাড়ি থেকে নেমে ঢোকেন চায়ের দোকানে। কেমন চেনা চেনা লাগে তাকে। তিনি দোকানিকে কিছু একটা বলতে যাবেন, তখনই বেজে ওঠে তার ফোন। কথা বলতে শুরু করেন কারও সঙ্গে। মরদেহ পরিবহনের ভাড়া নিয়ে আলোচনা। হঠাৎ আমি চিনে ফেলি; ইনি তো সেই হরিরামপুর যাওয়া কিংবা না যাওয়া লাশবাহী গাড়ির চালক। যাকে আমি মনে মনে খুঁজেছি কিছুদিন।
আমার পরিচয় দিয়ে জানতে চাই তার নাম-ঠিকানা। জানালেন, নাম ইয়াকুব আলী, ছয় বছর ধরে চালাচ্ছেন লাশবাহী গাড়ি। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদর উপজেলায়। তবে গাড়ির মালিক ঢাকার। চলাচল সারা দেশেই। ভাড়ায় মিললে যান টেকনাফ বা তেঁতুলিয়াও।
ইয়াকুব হাজার হাজার মরদেহ বহন করেছেন তার গাড়িতে। দেখেছেন হাজারো মৃত মানুষের স্বজনদের আর্তনাদ, আহাজারি আর বিলাপ। তার চোখও ভিজেছে কখনো কখনো। কখনোবা খুব মনে পড়েছে নিজের মৃত স্বজনদের।
মরদেহের স্বজনদের সঙ্গে জড়াতেও হয়েছে ঝগড়ায়, হাতাহাতি হয়েছে বেশ কয়েকবার। আবার মরদেহ গাড়িতে রেখে সম্পত্তির জন্য ছেলেমেয়েদের মারামারিও করতে দেখেছেন তিনি। এ জন্যই হয়তো অনেকের বিলাপ আর স্পর্শ করে না তাকে। কারও বুকফাটা আর্তনাদে তার বুক কাঁপে না একটুকুও।
অনেক বীভৎস মরদেহ দেখেছেন, করেছেন বহন। তবে ভয় পাননি ইয়াকুব। কাজের পাশাপাশি এ বিষয়ে চিন্তায়ও পেশাদার তিনি।
ইয়াকুবের গাড়িতে নেই হেলপার। দীর্ঘ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তেই থাকতে হয় সতর্ক। কখনো কখনো গাড়িতে থাকেন না স্বজনদের কেউ। গাড়িতে মরদেহ নিয়ে পথ ভুলও হয়েছে বেশ কয়েকবার। পড়তে হয়েছে ছিনতাইকারীদের কবলে।
আবার দূরের যাত্রায় সাধারণ গাড়ির চালকরা বকশিশ পেলেও মরাবাড়ির আহাজারির মধ্যে সেটা চাওয়া বা পাওয়ার সুযোগ থাকে না ইয়াকুব আলীদের মতো লাশবাহী গাড়ির চালকদের। মাসিক বেতনভুক্তও নন তারা। ট্রিপ হিসাবেই পান ভাতা।
তবু লাশবাহী গাড়ি চালিয়ে যাওয়া মানুষগুলো সমাজের চোখে হয়ে যান আবেগহীন, পাষাণ হৃদয়ের। তবে অনেকেই দেখেন না তাদের নির্লিপ্ত হয়ে ওঠার পেছনের দৃশ্য। দিনের পর দিন তারা মরদেহ টানছেন, মুর্দার স্বজনের গঞ্জনা সইছেন, শুধু নিজের স্ত্রী-সন্তান আর স্বজনদের মঙ্গলের জন্যই। তাই অন্য কারও মৃত্যু ইয়াকুব আলীদের শোকগ্রস্ত করে না; বরং দেয় বেঁচে থাকার রসদ।

