প্রিপেইড মিটার নিয়ে ক্ষোভ, রংপুরে স্মারকলিপি

ছবি: আগামীর সময়
প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধের দাবিতে রংপুরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে মহানগর নাগরিক কমিটি। আজ মঙ্গলবার দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়, গ্রাহকদের আপত্তি উপেক্ষা করে জোরপূর্বক বসানো হচ্ছে মিটার।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, সাধারণ গ্রাহকদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও জোরপূর্বক প্রিপেইড মিটার স্থাপন করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এই কার্যক্রম চলমান। এ নিয়ে প্রতিদিনই খবর আসছে গ্রাহকদের অসন্তোষ ও বিক্ষোভের। তবুও নীরব রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্যমতে, বিদ্যুৎ খাতে চুরি, অপচয়, ওভারলোড ও বকেয়া বিল ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ।
তবে স্মারকলিপিতে বলা হয়, নিজেদের ব্যর্থতার দায় চাপানো হচ্ছে গ্রাহকদের ওপর। এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে লুণ্ঠন করা হচ্ছে জনগণের পকেট। এতে সৃষ্টি হয়েছে চরম ভোগান্তি।
সারা দেশে একযোগে এই প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ করছে পিডিবি, আরইবি, নেসকো, ডিপিডিসি, ডেসকো ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে উচিত ছিল গ্রাহকদের মতামত নেওয়ার। আয়োজন করা যেত একটি গণশুনানিরও। কিন্তু জনমতের তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
আরও উল্লেখ করা হয়, প্রিপেইড মিটার পদ্ধতিতে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ কিনতে হয় আগাম টাকা দিয়ে। যতক্ষণ কার্ডে টাকা থাকে, ততক্ষণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। টাকা শেষ হলেই বিচ্ছিন্ন হয় সংযোগ। এটি সেবামূলক খাতের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিদ্যুৎ আইন ২০১৮-এর ৫৬ ধারা অনুযায়ী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হলে ১৫ দিন আগে নোটিশ দিতে হয়। কিন্তু প্রিপেইড পদ্ধতিতে মানা হচ্ছে না এই নিয়ম। টাকা শেষ হলেই কেটে যাচ্ছে সংযোগ, যা আইনের পরিপন্থি।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগে প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধে একটি রিট পিটিশন চলমান রয়েছে। রিট নিষ্পত্তির আগেই মিটার স্থাপনের কাজে করা হচ্ছে তড়িঘড়ি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ একটি প্রভাবশালী চক্রের হাতে ছিল। সেই চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এই প্রিপেইড মিটারে গ্রাহকদের চার্জ দিতে হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের। প্রতি মাসে ৪০ টাকা মিটার ভাড়া এবং ডিমান্ড চার্জ প্রতি কিলোওয়াটে ৩০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া পাঁচ শতাংশ ভ্যাট এবং এক শতাংশ রিবেট পরিশোধ করতে হয়।
প্রিপেইড পদ্ধতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিট অনুযায়ী চার্জ পায়। তার পরও অতিরিক্ত বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। প্রতিএক হাজার টাকা রিচার্জে এজেন্ট কমিশন হিসেবে ২০ টাকা দিতে হয়।
গ্রাহকদের টাকায় কেনা মিটারের জন্য আবার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এই ভাড়া কতদিন আদায় করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। আগে গ্রাহকরা যে ডিজিটাল মিটার কিনেছিলেন, তা বাতিল করা হলেও কোনো টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
প্রতি এক হাজার টাকা রিচার্জে কত ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আবাসিক ও বাণিজ্যিক রেট নির্ধারণ নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে।
প্রিপেইড মিটারে ব্যালান্স শেষ হলে ২০০ টাকা জরুরি ব্যালান্স নেওয়া যায়। এর জন্য ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। মিটার লক হয়ে গেলে তা খুলতে ৬০০ টাকা জমা দিতে হয়।
ওভারলোডের কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও গ্রাহকরা সন্তোষজনক সমাধান পাচ্ছেন না। বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট না থাকলে রিচার্জ করাও সম্ভব হয় না। এতে গ্রাহকরা চরম সমস্যায় পড়েন।
কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। আগে সেচ পাম্পে মৌসুমের শুরুতে বাকিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যেত। পরে ফসল বিক্রি করে বিল পরিশোধ করা হতো। এখন সেই সুযোগ নেই।
এ ছাড়া প্রিপেইড মিটার স্থাপনের ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের অনেক কর্মচারীর চাকরি ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই পদ্ধতিতে সার্ভার ডাউন হলে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রাহকরা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় পড়েন। সার্ভার সচল না হওয়া পর্যন্ত তারা অন্ধকারে থাকেন।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আপত্তি উপেক্ষা করা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থার ভয় দেখিয়ে প্রিপেইড মিটার স্থাপন অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এমনকি যারা প্রিপেইড মিটার নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ বিল প্রদান থেকেও বিরত রয়েছে নেসকো কর্তৃপক্ষ—এমন অভিযোগও করা হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, সব নাগরিককে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এর পরিবর্তে একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সারা দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষা করে কার স্বার্থে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে—এ প্রশ্ন তোলা হয় স্মারকলিপিতে।
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগের নেতৃত্বে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এ সময় প্রতিনিধি দলে আব্দুল জব্বার সরকার, মশিউর রহমান, আমিন মোস্তাদীর, সাংবাদিক ফিরোজ চৌধুরী, বীথি দাস নন্দিনী, রেদোয়ান ফেরদৌস, সুভাষ রায়, মাহফুজ আহমেদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নেতারা প্রিপেইড মিটার স্থাপন বন্ধ, গ্রাহকদের বাধ্য না করা, ডিজিটাল মিটারে নিয়মিত বিল প্রদান, গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশসহ পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেন।

