মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
আগামীর সময়
জীবন বাঁচাতে জীবন বাজি

জীবন বাঁচাতে জীবন বাজি

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
আগামীর সময়
আগামীর সময় এশিয়া

জীবন বাঁচাতে জীবন বাজি

  • মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সমুদ্রযাত্রা রোহিঙ্গাদের
রয়টার্সপ্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:০৫
জীবন বাঁচাতে জীবন বাজি

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে রোহিঙ্গাদের একটি নৌকা। ছবি: এএফপি

ক্ষুধা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার কাছে মৃত্যু তুচ্ছ। যার ফলে মানুষ নিজের জীবনও বাজি ধরতে পিছপা হন না। সেই সত্যই বহন করে চলেছেন রোহিঙ্গারা। একটু ভালো জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত বাজি ধরছেন নিজের জীবনের। চরম বিপদসংকুল জেনেও প্রতিনিয়ত ঝুঁকছেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার পথে সমুদ্রযাত্রায়। এ পথে কেউ পারেন পৌঁছাতে, কেউ হন গ্রেপ্তার, আবার কারও হয় সলিলসমাধি।

রোহিঙ্গা শরণার্থী রাহিলা বেগম সম্প্রতি দুদিন ভেসেছিলেন আন্দামান সাগরে। একটি কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে। এর আগে ডুবে যায় তাকে বহনকারী অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকাটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে- এটির ২৫০ যাত্রী নিখোঁজ বা গেছেন মারা। সেই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে থাকা অল্প কয়েকজনের একজন তিনি।

হাজারো রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শরণার্থী শিবিরের হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পালান প্রতি বছর। এরপর চেষ্টা করেন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে যাওয়ার। রাহিলা তাদেরই একজন। নড়বড়ে নৌকায় ক্ষুধা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি সঙ্গে নিয়ে তারা পা বাড়ান এ বিপদসংকুল পথে।

পথে ক্ষুধা বা সমুদ্রে দুর্ঘটনায় মারা যান শত শত রোহিঙ্গা। তবুও এ পথে পা বাড়ানো রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়তেই থাকে। কারণ আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে খাদ্যসহায়তা। এটি আরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাধ্য করছে এই বিপজ্জনক যাত্রায় নামতে।

ত্রিপল দিয়ে তৈরি বাবা-মায়ের অস্থায়ী ঘরে একটি কম্বল গায়ে বসে আছেন অসুস্থ রাহিলা। নরম গলায় তিনি জানান,‘আমি কখনো ভাবিনি বেঁচে থাকব। মনে হচ্ছিল এ যাত্রাই আমার জীবনের শেষ।’

২৬ বছর বয়সী এই নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি একটি তেলবাহী জাহাজ। প্রায় ৩০০ জন যাত্রী নিয়ে সম্প্রতি মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ডুবে যায় ওই নৌকাটি। পরে তাকে দেশটির কোস্ট গার্ডের কাছে করা হয় হস্তান্তর।

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। যাদের বেশিরভাগই বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে জান্তা ও উগ্রপন্থিদের নিপীড়ন-সংঘাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসেছে। তবে বাংলাদেশে বহিরাগত হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় তাদের।

বছরের পর বছর আটকে থাকা, কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, সীমিত শিক্ষা পাওয়া এবং ক্রমেই কমে আসা খাদ্যসহায়তার মুখে তারা। এ কারণে রোহিঙ্গারা তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পান না বাংলাদেশে। অন্যদিকে পারে না মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতেও।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গার নিখোঁজ বা মৃত্যুর তথ্য করা হয়েছে লিপিবদ্ধ। এটি আঞ্চলিক সমুদ্রপথে পারাপারের ক্ষেত্রে রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। ৬ হাজার ৫০০-রও বেশি রোহিঙ্গা এ সময় চেষ্টা করেছিলেন সাগর পাড়ি দিতে।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২ হাজার ৮০০-রও বেশি রোহিঙ্গা এমন যাত্রার চেষ্টা করেছেন বলেও জানায় সংস্থাটি।

ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা অ্যাস্ট্রিড ক্যাস্টেলাইনের ভাষ্য, রোহিঙ্গা জনসংখ্যার বেশিরভাগই তরুণ। তারা স্বপ্ন দেখে একটি ভালো জীবনের। কিন্তু ক্রমেই হতাশায় পরিণত হচ্ছে সেই আশা। এ কারণেই এই বিপজ্জনক নৌযাত্রায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশি এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মানব পাচার চক্র দমনে উপকূলীয় টহল ও ক্যাম্পগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে তিনি স্বীকার করেন, আইন প্রয়োগকে কঠিন করে তুলছে রোহিঙ্গাদের হতাশার ব্যাপকতা।

খাদ্যসহায়তা কমানো মানে পাতে উঠবে না মাছ-মাংস

রাহিলা বেগমের হাত ও শরীরে সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশ্রিত গরম ইঞ্জিন তেলের ছিটার দাগ। তিনি মিয়ানমার ছাড়েন ২০১৭ সালে। তখন সামরিক দমনপীড়নের ফলে ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। সে সময় হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে জান্তা সেনাদের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনাকে পরে জাতিসংঘের একটি মিশন বর্ণনা করে ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে। যদিও মিয়ানমার অস্বীকার করেছে এই অভিযোগ।

চার বছর আগে বিয়ে হয় রাহিলার। এরপর তার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় বলে জানান তিনি। রাহিলা যোগ করেন, ‘সন্তান জন্ম দিতে না পারায় আমাকে করা হতো মারধর। আমি জানতাম পালাতে হবে আমাকে। এখানে আমার জন্য ছিল না আর কোনো জীবন।’ তার স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছিলেন বলেও জানান রাহিলা।

এ মাসে কক্সবাজারে পরিবারের আয়ক্ষমতার ভিত্তিতে খাদ্যসহায়তা বিতরণ শুরু করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। প্রতি মাসে বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের জন্য জনপ্রতি ১২ ডলার। এ ছাড়া খাদ্য-অনিরাপদ হিসেবে বিবেচিতদের জন্য ৭ ডলার। সবচেয়ে বেশি সহায়তা পায় শিশু, নারী ও প্রবীণদের দ্বারা পরিচালিত পরিবারগুলো।

চার সন্তানের বাবা মোহাম্মদ রফিকের ভাষ্য, আমার রেশন ১২ ডলার থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৭ ডলার। কারণ আমার আছে ১৮ বছর বয়সী একটি ছেলে। কিন্তু কোনো আয় করে কি সে?

এই অর্থ দিয়ে শুধু চাল এবং রান্নার তেল কেনা সম্ভব। কিন্তু মাছ বা মাংস নয়— যেগুলো খেতে তার সন্তানরা ব্যাকুল।

‘যথাযথ খাদ্য, আশ্রয়, স্বাধীনতা, শিক্ষা এবং কাজ না পাওয়ায় আমরা বসবাস করছি অমানবিক অবস্থায়। একদিন যদি আমার সন্তানরা সমুদ্রপথে পা বাড়ায়, তাতেও অবাক হব না আমি’, যোগ করেন রফিক।

রোহিঙ্গারা নিজেই হয়ে ওঠেন পাচারকারী

রোহিঙ্গাদের হতাশাকে প্রায়ই কাজে লাগায় মানব পাচারকারীরা। এই পাচারকারীদের অনেকেই আবার রোহিঙ্গা।

নিজের ডাকনাম ফয়সাল বলে পরিচয় দেওয়া ২৪ বছর বয়সী এক পাচারকারী জানান, তিনি ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে পাঠিয়েছিলেন ২০ জনকে। তাদের মধ্যে ছিল তিন নারী ও দুই শিশু। কিন্তু কেউই সেই দুর্ঘটনা থেকে পারেনি বাঁচতে।

‘স্বজনদের বিষয়ে জানতে চাওয়া পরিবারগুলোর ফোনকল এড়িয়ে চলি আমি। তারা বারবার ফোন করে… কখনো কখনো আমি বন্ধ করে দিই ফোনটাই’, উল্লেখ করেন ফয়সাল। তিনি আরও জানান, প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালে পাচারকারীদের সহায়তায় গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। পরে শিবিরে ফিরে এসে জড়িয়ে পড়েন এই পেশায়।

‘২০২০ সালে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তাকে মানব পাচারের একটি মামলায় দিয়েছিল এক বছরের কারাদণ্ড। তবে মুক্তির পর আবারও এই কাজে ফিরে আসেন তিনি।’ রয়টার্স স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি তার এই বক্তব্য।

ফয়সাল আরও জানান, সাধারণত শীত মৌসুমে এমন নৌযাত্রা হয় বেশি। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের জীবন থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই এখন আরও বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তার ভাষ্য, আগ্রহীরা আমাদের কাছে আসেন, উপায় খোঁজেন পালানোর। তারা ঝুঁকির কথাও জানেন। কেউ পারেন পৌঁছাতে, কেউ হন গ্রেপ্তার, আবার কেউ যান মারা।

ভাষান্তর: জুয়েল জনি

স্পেশাল-১রোহিঙ্গা
    শেয়ার করুন:
    বিদেশে পড়ার স্বপ্ন, যুদ্ধের ময়দানে শেষ মুহিবুরের জীবন

    বিদেশে পড়ার স্বপ্ন, যুদ্ধের ময়দানে শেষ মুহিবুরের জীবন

    ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০৩

    দেশের আকাশসীমা এখন হাতের মুঠোয়

    দেশের আকাশসীমা এখন হাতের মুঠোয়

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:০৮

    পরিবারটির জীবন থামল কত কমে

    পরিবারটির জীবন থামল কত কমে

    ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৮

    হানি ট্র্যাপে পড়ে ৬ লাখ টাকা খোয়ালেন ব্যবসায়ী

    হানি ট্র্যাপে পড়ে ৬ লাখ টাকা খোয়ালেন ব্যবসায়ী

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:২৩

    ৫৮ বছরে পৃথিবীর বদলে যাওয়ার গল্প

    ৫৮ বছরে পৃথিবীর বদলে যাওয়ার গল্প

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৫১

    মিলনায়তন বরাদ্দে শিল্পকলার ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ আচরণ, ক্ষুব্ধ নাট্যকর্মীরা

    মিলনায়তন বরাদ্দে শিল্পকলার ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ আচরণ, ক্ষুব্ধ নাট্যকর্মীরা

    ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫২

    চীনের ‘ওয়ান চায়না পলিসি’তে মির্জা ফখরুলের সমর্থন

    চীনের ‘ওয়ান চায়না পলিসি’তে মির্জা ফখরুলের সমর্থন

    ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৫

    হেলিকপ্টারের মিশন সিসিটিভিতে সারবেন শিক্ষামন্ত্রী

    হেলিকপ্টারের মিশন সিসিটিভিতে সারবেন শিক্ষামন্ত্রী

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১৭

    এমপি হওয়ার মতো যোগ্য নেত্রী নেই চট্টগ্রাম বিএনপিতে!

    এমপি হওয়ার মতো যোগ্য নেত্রী নেই চট্টগ্রাম বিএনপিতে!

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:১৪

    ইরানের সঙ্গে চুক্তির আগে হরমুজে অবরোধ তুলবে না যুক্তরাষ্ট্র

    ইরানের সঙ্গে চুক্তির আগে হরমুজে অবরোধ তুলবে না যুক্তরাষ্ট্র

    ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৬

    তবে কি মেহেরপুরে ফিরে আসছে চরমপন্থা

    তবে কি মেহেরপুরে ফিরে আসছে চরমপন্থা

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:৩০

    বিএনপির সংসদ সদস্য হচ্ছেন ‘আওয়ামী লীগ নেত্রী’ সুবর্ণা

    বিএনপির সংসদ সদস্য হচ্ছেন ‘আওয়ামী লীগ নেত্রী’ সুবর্ণা

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:১৯

    ট্রাম্পের পরবর্তী নিশানা কে?

    ট্রাম্পের পরবর্তী নিশানা কে?

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:২৮

    দশমের সিঁড়িতে ঝরল সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী

    দশমের সিঁড়িতে ঝরল সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:০১

    ৫২তম দিনে সামান্য শিথিল ইরানের ইন্টারনেট ব্লকেড

    ৫২তম দিনে সামান্য শিথিল ইরানের ইন্টারনেট ব্লকেড

    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:০৫

    প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

    সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

    আগামীর সময়
    আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলীগোপনীয়তাআমরা

    ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

    যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

    বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

    info@agamirsomoy.com

    স্বত্ব © ২০২৬ আগামীর সময়

    • সর্বশেষ
    • ইপেপার
    EN
    • সর্বশেষ
    • জাতীয়
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • সারাদেশ
    • বিশ্ব
    • খেলা
    • বিনোদন
    • লাইফস্টাইল
    • মতামত
    • ফিচার
    • ভিডিও
    • চট্টগ্রাম
    • শিক্ষা
    • বিচিত্রা
    • ইপেপার
    • EN