ভাড়া বাড়ানোর হিসাব মেলে কোন অঙ্কে?

সংগৃহীত ছবি
তেল আর ভাড়া—দুটিই যেন সহযাত্রী, একই পথের পথিক। শুধু সামাজিক চিন্তা বা ব্যবসায়িক রীতি এমন নয়; মৌখিক আইনেও তেল ও ভাড়ার অবস্থান পাশাপাশি। বেশ কয়েক বছর ধরেই ১ টাকার বিপরীতে ১ পয়সার তত্ত্ব চলে আসছে। বিষয়টি এমন—জ্বালানি তেলের দাম যদি লিটারপ্রতি ১ টাকা বাড়ে, তাহলে বাসের ভাড়াও কিলোমিটারপ্রতি ১ পয়সা বাড়ে।
আছে উল্টো দিকও। তত্ত্ব একই। যদি ১ টাকা কমে তেলের দাম, ভাড়া কমে মাত্র ১ পয়সা। তবে ভাড়া কমানোর সময় আর ওই তত্ত্বের কথা মনে থাকে না। পরিবহন মালিকরা যেমন বিষয়টি ভুলে যান, তেমনি সরকারও বেমালুম থাকে উদাসীন।
বাসের ভাড়া বাড়াতে কত কিছুই না করা হয়—চলাচল কমিয়ে দেওয়া, দিনের পর দিন ধর্মঘট, সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত আলোচনার যুক্তি খাটানো; আরও কত কী! কিন্তু সেবার মান বাড়ানোর প্রসঙ্গে সবাই যেন চুপ!
সেসব আলাপ আপাতত থাক। ফিরে যাওয়া যাক ২০২২ সালে। ওই বছরের আগস্টে এক ধাক্কায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি বাড়ে ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ এবং পেট্রলের বাড়ে ৪৪ টাকা। দাম বাড়ার পর ডিজেল হয় ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ এবং পেট্রল ১৩০ টাকা। এরপর সেগুলোর দাম আবার কমেছে—কমতে কমতে ডিজেল ১০০ টাকায় এসে ঠেকে। কিন্তু ভাড়া কমেনি এক পয়সাও।
তাহলে প্রশ্ন আসে, ভাড়া বাড়ানোর হিসাব আসলে কোন তত্ত্ব বা সূত্রে? হিসাবটা খুবই সহজ। ১১৪ টাকা যখন ডিজেলের দাম ছিল, তখন মহানগরীর জন্য কিলোমিটারপ্রতি বাসভাড়া নির্ধারণ করা হয় আড়াই টাকা। সেখান থেকে পরে ৫ পয়সা কমিয়ে ভাড়া হয় ২ টাকা ৪৫ পয়সা। অঙ্কের সুবিধার জন্য ধরি, আমরা দাঁড়িয়ে আছি ২০২২ সালে।
১১৪ টাকার পর আরও ১ টাকা বেড়ে ডিজেলের দাম হয়েছে ১১৫ টাকা। তাহলে ‘তত্ত্ব’ অনুযায়ী ভাড়াও ১ পয়সা বাড়ার কথা। তাহলে আড়াই টাকা থেকে বেড়ে হবে ২ টাকা ৫১ পয়সা। কিন্তু যেহেতু এর আগে ৫ পয়সা কমানো হয়েছিল, এবার সেই অংশটি বিবেচনায় আনা যাক। বাড়ার অপেক্ষায় থাকা ১ পয়সার সঙ্গে কমে যাওয়া ৫ পয়সা যোগ হলে দাঁড়ায় ৬ পয়সা। সেই ৬ পয়সা ভাড়া বাড়ালেই হয়।
একইভাবে, দূরপাল্লার ক্ষেত্রে ২ টাকা ১২ পয়সার সঙ্গে ৬ পয়সা যোগ করে ২ টাকা ১৮ পয়সা করা যায়। আর মিনিবাসের ক্ষেত্রে ২ টাকা ৪০ পয়সাকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৬ পয়সা পর্যন্ত নির্ধারণ করা যেতে পারে।
কিন্তু মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর সময় সামনে নিয়ে আসেন ১৭টি খাত। তারা একটি বাস কেনা, বিনিয়োগের পেছনে ঋণের সুদ (যদি থাকে), রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার মোট খরচ হিসাব করে তা যাত্রীর সংখ্যায় ভাগ করেন। বাসের দাম ধরা হয় নতুনের—কখনো কখনো নতুনের চেয়েও বেশি। এবারও যেমন ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু এই দামের বাসে কি আমরা সত্যিই চড়ি?
পরের কথা, ব্যবসা করবে ‘সে’—ঋণের সুদের টাকা যাত্রী কেন দেবে? এরপর আসে রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি। খালি চোখে দেখে বাসের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে—এমনটা বোঝার উপায় থাকে না। বাসের টিন খুলে যায়, জানালায় কাচ থাকে না, রঙ নেই; সিটে বসলে জায়গা থাকে না পা রাখার। ময়লা সিটকভার যেন বুড়িগঙ্গার কালো পানিকেও হার মানায়।
এ তো গেল চোখে দেখে মান বোঝা। ভেতরে ফিটনেস থাকে না, আয়ু থাকে না। ডাম্পিংয়ে যাওয়ার কথা আরও বছর কয়েক আগে। অথচ তাতেই যাত্রী বোঝাই করে ধুঁকে ধুঁকে চলছে।
যাত্রী প্রসঙ্গেই আরেকটি কথা বলা যায়—ভাড়া নির্ধারণের সময় ধরে নেওয়া হয়, মোট আসনের ৩০ শতাংশ খালি থাকবে এবং বাকি ৭০ শতাংশ আসনে যাত্রী পাওয়া যাবে। বাস যে বাস্তবে কতটা খালি যায়, সে আলোচনা না-ই বা করলাম।
পরিচালনার খরচ বলতে জ্বালানি আর ইঞ্জিনের তেল ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়ে না; বাকি সব কাগজে-কলমে সুন্দর করে গোছানো থাকে। যেমন, এবারের প্রস্তাবিত ভাড়া বৃদ্ধির যুক্তিতে বাসের পার্কিং খরচ ধরা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস পার্কিং হয় কোথায়? মাঝরাতে রাস্তায়!
ফলে এই মানের বাসে উন্নত সেবা ছাড়াই এত বেশি ভাড়া দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? যদিও মালিকরা বিষয়টি আরও সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেন—ডলারসহ নানা খরচের হিসাব তুলে ধরে।
এবার একটু পেছন থেকে ফিরে দেখি। ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম বাড়ার পর ৭ আগস্ট বাসভাড়া বাড়ে। ওই মাসেই আবার ডিজেলের দাম ৫ টাকা কমে। ১ সেপ্টেম্বর ভাড়া কমে ৫ পয়সা। ২০২৪ সালে ডিজেলের দাম আবার ৩ টাকা কমলে ভাড়াও কমে ৩ পয়সা। আবার ২০১১ সালে ২ পয়সা, ২০১৬ সালে ৩ পয়সা করে বাসভাড়া কমানোর হিসাবও কাগজে ছিল। তবে বাস্তবে এসব কমানোর কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব ছিল না।
আসলে পরিবহন মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর অঙ্কটা হয়তো বিআরটিএরও পুরোপুরি বোধগম্য নয়। যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির কাছে হয়তো সেবার মান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাটাও তেমন গুরুত্ব পায় না।

