টিটন হত্যার এক মাস
তদন্তে নেই অগ্রগতি, ধোঁয়াশায় পুলিশ
- এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি কাউকে
- আটিবাজারের পর পাওয়া যায়নি খুনিদের গতিবিধি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন নামে এক ব্যক্তিকে। পুলিশের দাবি, নিহত ব্যক্তি ছিলেন একজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’। সেই ঘটনার পেরিয়েছে প্রায় এক মাস। কিন্তু এখনো রহস্যের জট খুলতে পারেনি পুলিশ। এই হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, কার নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে ‘কিলিং মিশন’ কিংবা হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীই বা কারা— এখনো অজানা এসব প্রশ্নের উত্তর।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যার আগে দীর্ঘদিন ধরে করা হয়েছিল পরিকল্পনা ও রেকি। ঘটনার পর খুনিদের পালানোর রুট শনাক্ত করা গেলেও শেষ পর্যন্ত তারা কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে, এখনো তা অজানা।
ঘটনাটি গত ২৮ এপ্রিলের। রাত পৌনে ৮টার দিকে টিটনকে লক্ষ্য করে চালানো হয় গুলি। পরদিন নিউ মার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন তার বড় ভাই খন্দকার সাঈদ রিপন। মামলায় আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয় আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের নাম। সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনের নাম।
সে সময় নিহতের ভাই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তার দাবি ছিল, বসিলার পশুর হাট নিয়ে টিটনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল পিচ্চি হেলাল, বাদল, রনি ও শাহজাহানের। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মামলার তদন্তের সঙ্গে জড়িত একটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘কিলিং মিশন’ শেষ করে খুনিরা মোটরসাইকেলে জিগাতলা হয়ে ইরানি মাঠের পাশ দিয়ে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে ওঠে। এরপর দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায় আটিবাজার দিয়ে। সেখান থেকে তাদের গতিবিধি কেমন ছিল, সেই তথ্য আর পাওয়া যায় না।
তবে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২৩টি বাড়ির সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যার আগে খুনিদের গতিবিধি, ব্যাকআপ টিমের উপস্থিতি এবং পালানোর রুট সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ডিবি পুলিশের ধারণা, প্রতি মঙ্গলবার নিউ মার্কেট বন্ধ থাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনের এলাকায় পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা না থাকায় পরিকল্পিতভাবেই বেছে নেওয়া হয় জায়গাটি।
তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনার দিন মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে বের হননি টিটন। ফলে কোথায় যাচ্ছিলেন বা কে তাকে সেখানে ডেকেছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী টিটনের ঘনিষ্ঠ কাউকে ব্যবহার করে তাকে নিউ মার্কেট এলাকায় ডাকা হয়, যাতে বাসায় ফেরার পথে তিনি ব্যবহার করেন নির্ধারিত রুট।
সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা গেছে, হত্যার দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকেই ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিলেন মোটরসাইকেলে থাকা সন্দেহভাজন দুই কিলার। রাত ৭টা ৫০ মিনিটে তাদের দেখা যায় নীলক্ষেত মোড়ে। একই সময় নীলক্ষেতে ছিলেন টিটনও। পরে তিনি হেঁটে ঘটনাস্থলের দিকে যেতে থাকলে মোটরসাইকেলে তাকে অনুসরণ করেন খুনিরা। রাত ৭টা ৫৪ মিনিটে টিটনের ওপর হামলা চালিয়ে পরপর ছয়টি গুলি করেন তারা। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র চার মিনিটে।
সূত্র জানিয়েছে, মোটরসাইকেলে থাকা দুই কিলারের বাইরে আরও দুজন ব্যাকআপ সদস্য ছিল। ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী ওই দুই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় টিটনের গতিবিধি অনুসরণ করে শুটারদের তথ্য দিচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। রেকি করা স্থানের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নীলক্ষেত থেকে মোটরসাইকেলে রওনা দেয় শুটার ও তার সহযোগী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোটরসাইকেলের চালকের মাথায় ছিল সাদা হেলমেট ও গায়ে কালো রঙের শার্ট। শুটারের পরনে ছিল সাদা শার্ট। তার মাথায় ছিল ক্যাপ ও মুখে ছিল মাস্ক। তাদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, আধিপত্য বিস্তার, রায়েরবাজারে ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিতে প্রভাব বিস্তার এবং গরুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বকে মাথায় রেখে চলছে তদন্ত। ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, হত্যার পেছনে জড়িত থাকতে পারেন একাধিক ব্যক্তি। শুটারদের গ্রেপ্তার করা গেলে জানা সম্ভব হবে ঘটনার বিস্তারিত।’
টিটন ২০০১ সালে জোট সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ছিলেন ২ নম্বরে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্ত হয়ে ঢাকাতেই ছিলেন তিনি। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, দেশ থেকে পলাতক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জোসেফ ও তার অনুসারীরা জড়িত থাকতে পারেন এই হত্যার সঙ্গে। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকে জোসেফের ভাই টিপু হত্যার ঘটনায় টিটন ও ‘সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন’ ইমনের বিরুদ্ধে ছিল অভিযোগ। সেই বিরোধ ও প্রতিশোধের সূত্র ধরেই হত্যা হতে পারেন টিটন। যদিও এ বিষয়ে মুখ খুলছে না নিহতের পরিবার।
সূত্রগুলো বলছে, একসময় রায়েরবাজার ও জিগাতলা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন ইমন এবং টিটন। জোসেফের সঙ্গেও বিরোধ ছিল তাদের। ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা মামলায় দীর্ঘ ১৭ বছর কারাগারে ছিলেন টিটন। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কারামুক্ত হয়ে দুবাইয়ে চলে যান সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমন। অন্যদিকে দেশেই অবস্থান করছিলেন টিটন।






