বাসা ভাড়ার অতিরিক্ত চাপে দেশের ২১ শতাংশ পরিবার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর রামপুরার মহানগর প্রজেক্টে ভাড়া বাসায় থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী মনা বিশ্বাস। সন্তানের জন্য আলো-বাতাসযুক্ত বাসা চান তিনি। কিন্তু এ ধরনের বড় বাসার ভাড়া নিজের চাকরির আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব হয় না তার পক্ষে। তাই বাসা ভাড়া পরিশোধে নির্ভর করতে হচ্ছে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পদের আয়ের ওপর।
মনা বিশ্বাস বলছিলেন, ‘বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সময় বাসা ভাড়া ও যাতায়াতের ব্যয় বিবেচনা করা হয় না। অথচ আমার আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন বাসা ভাড়ায় চলে যাচ্ছে। পৈতৃক সম্পদের আয় থেকে সহায়তা পাই বলে কোনোভাবে সামলাতে পারছি। কিন্তু সব পরিবারের তো এমন সুযোগ নেই।’
তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে ওই পরিবারগুলো কি বাধ্য হয়ে ছোট, অস্বাস্থ্যকর ঘরে পাঁচজন গাদাগাদি করে থাকবে, নাকি ফিরে যাবে গ্রামে?
মনা বিশ্বাসের মতো বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার রয়েছে এমন আবাসন সংকটের ভেতরে। যা উঠে এসেছে জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি— ইউএন-হ্যাবিটাটের ‘ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্ট ২০২৬: দ্য গ্লোবাল হাউজিং ক্রাইসিস-পাথওয়েজ টু অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে।
সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আবাসন ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও মানুষের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের নিশ্চয়তা বাড়েনি। বরং আবাসন ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপে রয়েছে ২১ শতাংশ পরিবার। অর্থাৎ প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে একটির বেশি পরিবারকে আবাসন ব্যয় মেটাতে আয়ের ওপর বাড়তি চাপ নিতে হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। এ বছর যার প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’।
বৈশ্বিক আবাসন সংকট: ইউএন-হ্যাবিটাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৩৪০ কোটি মানুষ নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত আবাসন থেকে বঞ্চিত। এ সংখ্যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশের সমান। যাদের মধ্যে ১১০ কোটির বেশি মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বাস করে।
যেসব পরিবার ভাড়া বাসায় থাকে তাদের ৪৪ শতাংশকে আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি অর্থ ভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হয়। প্রতিবেদনে আবাসন সংকটকে শুধু ঘরের ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়নি; এর সঙ্গে ভাড়া, দখল, নিরাপত্তা, পানি, স্যানিটেশন, যাতায়াত, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু ঝুঁকিকেও যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের চিত্র: ২০১০ সালে বাংলাদেশে আবাসন ইউনিটের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯৭ লাখ, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৯০ লাখে। তবে আবাসন ঘাটতির চিত্রে দেখা গেছে বড় পার্থক্য। ২০১০ সালে ঘাটতি ছিল ৪৬ লাখ যা ২০২০ সালে সর্বোচ্চে পৌঁছে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৮ লাখে। পরে ২০২৩ সালে তা কমে ৬০ লাখ মিলিয়ন ইউনিটে নেমে এসেছে। তবে ২০২০-২৩ সালের মধ্যে আবাসন ঘাটতি এতটা কমে যাওয়ার কারণ প্রতিবেদনে আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। আবাসন ঘাটতি অর্থ হলো মানুষের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বা উপযুক্ত বাসস্থানের অভাব।
বাংলাদেশে নিজস্ব বাড়ির মালিকানার হারও কমেছে। ২০১০ সালে এ হার ছিল ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কমে ৮০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। বিপরীতে, ভাড়া বাড়িতে থাকার হার ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে বাড়ির মূল্য ও আয়ের অনুপাত ২০১০ সালে ছিল ৫। ২০১৫ সালে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৯, ২০২০ সালে ১৩ দশমিক ১ এবং ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। এই অনুপাত যত বাড়ে, গড় আয়ের পরিবারের জন্য বাড়ি কেনা তত কঠিন হয়ে পড়ে। আবাসন ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপে থাকা পরিবারের হারও ২০১০ সালের ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে বস্তিবাসী ও অনিরাপদ বসতিতে বসবাসকারী মানুষের মোট সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১০ সালে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে বস্তিবাসীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩২ লাখ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ২ কোটি ৯২ লাখে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে ভূমি ও সম্পদের ওপর আইনগত অধিকার বা মালিকানার নিরাপত্তা প্রায় ৫১ দশমিক ৫ শতাংশে স্থবির রয়েছে।
তবে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে সেবা খাতে। নগরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগের হার ২০১০ সালের ৯০ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া বাড়ির হার ৫০ শতাংশ এবং টেকসই উপাদানে তৈরি নগর বাড়ির হার ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
আবাসন ঋণের সুযোগ সীমিত: বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক আবাসন ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত। ইউএন-হ্যাবিটাটের হিসাবে, ২০১০ সালে আবাসন ঋণের আওতায় ছিল ৫ শতাংশ পরিবার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এক দশকের বেশি সময়ে ঋণপ্রাপ্তি বাড়লেও অধিকাংশ পরিবার এখনো আনুষ্ঠানিক আবাসন অর্থায়নের বাইরে রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি, ভাড়াটিয়া ও বস্তিবাসীর জন্য প্রচলিত ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন। কারণ, তাদের অনেকের নিয়মিত আয়, জমির দলিল, কর নথি বা ব্যাংকিং ইতিহাস নেই। ফলে নিম্নআয়ের পরিবারকে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ, মেরামত বা উন্নয়নে অনানুষ্ঠানিক ঋণ ও উচ্চ সুদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
নীতিতে পরিবর্তনের তাগিদ: ইউএন-হ্যাবিটাট বলছে, আবাসন নীতিতে শুধু নতুন বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য থাকলে চলবে না। সাশ্রয়ী ভাড়া, নিরাপদ দখল, পানি, স্যানিটেশন, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু সহনশীলতাকে একসঙ্গে পরিকল্পনায় আনতে হবে। বস্তি উচ্ছেদ করে দূরে পুনর্বাসনের বদলে যেখানে সম্ভব সেখানে সেবা-উন্নয়নের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। তারা বলছে, পানি, স্যানিটেশন, রাস্তা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা ও দখল-সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।



