রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না কেন, যে উত্তর দিলেন প্রতিমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনে প্রায় এক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখনো সফল হয়নি বাংলাদেশ। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ যেখানে পারছে না, সেখানে মালয়েশিয়া কীভাবে পারছে— এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে। উত্তরে তিনি দেশে এতদিন অগণতান্ত্রিক সরকার থাকাটাকেই কারণ হিসেবে দেখালেন।
আজ বৃহস্পতিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছেন, মিয়ানমার সরকার শেখ হাসিনা সরকারের দুর্বলতা জানত। তাই তাদের সঙ্গে আলোচনায় শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারেনি তৎকালীন সরকার।
মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশটির মুসলমান জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ইতিহাস অনেক আগের। তবে ২০১৭ সালে রাখাইন প্রদেশে সেনা অভিযান শুরুর পর একেবারে ৮ লাখ রোহিঙ্গা এসে পড়ে বাংলাদেশে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে আছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ২০১৭ সালেই মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। তবে দেশটিতে সেনাশাসন শুরুর পর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। তারপর বাংলাদেশের তাগিদ সত্ত্বেও প্রত্যাবাসন আর গতি পায়নি।
এর মধ্যে খবর এসেছে, আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া ৫ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় দেড় হাজার জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
তথ্যটি তুলে ধরে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় তো গণতান্ত্রিক সরকার ছিল। গত ১৫ বছর ধরে তাদের একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় ছিল। ফলে সেখানে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু ছিল। আমাদের তো কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই ছিল না। এখানে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার এক স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা ভর করেছিল।’
এটি কীভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রভাব ফেলেছে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে সরকার দেশের নিজের মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, বাইরের পৃথিবী তাকে কীভাবে সম্মান করবে? মিয়ানমার সরকারও শেখ হাসিনার দুর্বলতা জানত। তারা জানত যে তার কোনো জনসমর্থন বা বৈধতা নেই এবং সে নিজের দেশের মানুষের ওপরই মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে টেবিলে মুখোমুখি বসে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৎকালীন সরকারের ছিল না।’
তবে এখন বাংলাদেশেও নির্বাচিত সরকার আসায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজে গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেছেন, ‘মিয়ানমার সরকারও আমাদের এই নতুন সরকারকে অভিনন্দিত করেছে এবং তারা বুঝতে পেরেছে যে এই সরকারের পেছনে বিপুল জনসমর্থন রয়েছে। ফলে ১৫ বছর আগের অবৈধ সরকারের মতো নয়, বরং এই সরকারকে তাদের গুরুত্ব দিতেই হবে। এই শক্তিশালী অবস্থান এবং জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা ধাপে ধাপে এই সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাব।’
শুধু দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগে নয়, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বহুপাক্ষিক উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনের সভাপতিত্বকে কাজে লাগিয়ে বহুপাক্ষিক বিশ্বমঞ্চে এবং জাতিসংঘের মতো শীর্ষ ফোরামে এই সংকটের গুরুত্ব আবারও জোরদার করব।
‘এর পাশাপাশি আমাদের দ্বিপাক্ষিক অংশীদারদের সঙ্গেও আমরা কাজ করব—যাতে এই সংকটের বিষয়টি সবার নজরে রাখা যায়, আর্থিক সহায়তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যেন নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে পারে, তার একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।’
‘আমরা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উভয় পথেই সম্মিলিতভাবে কাজ করব, যাতে ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করানো যায় এবং একটি স্থায়ী সমাধান বের করা সম্ভব হয়,’ যোগ করেন তিনি।
এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা এক সাংবাদিক জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এই ধরনের জটিল বিষয়ে তো হুট করে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যায় না। ধৈর্য ধরতে হবে, তবে কূটনৈতিক তৎপরতা দ্রুত গতিতে চালাতে হবে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মিয়ানমারে অনিরাপদ পরিবেশের কথা তুলে ধরে এলেও মালয়েশিয়ার উদ্যোগের ক্ষেত্রে তেমন প্রতিক্রিয়া না আসার বিষয়টি তুলে ধরেন এক সাংবাদিক।
তখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হেসে বলেন, ‘আজ আপনি শুধু এই একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়েই প্রশ্ন করছেন দেখে আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি! আমাকে তো একবারও ভারত কিংবা চীন সম্পর্কিত বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না!’
রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার খাতিরে সীমান্ত খুলে রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচিয়েছে। কিন্তু এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একার নয়, এটি পুরো বিশ্বের সমস্যা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু মুখে সহমর্মিতা দেখালেই চলবে না, তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে এবং মিয়ানমারের সঙ্গে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। এটি না করলে এই সংকট পুরো অঞ্চল এবং তার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।





