মজুরি বোর্ড গঠনের পরেও থামেনি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন

গতকাল পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় পোশাকশ্রমিকদের। ছবি: আগামীর সময়
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে রবিবার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। মজুরি বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। তবে তাতে থামেননি আন্দোলনরত শ্রমিকরা। আজ সোমবারও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করছেন তারা।
আজ সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সময় পল্লীবিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় অন্তত ৫০টি যানবাহনে ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা মাঠে নামলে শ্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় মুখোমুখি অবস্থান ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সকাল থেকেই শ্রমিকেরা বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশের তৎপরতায় বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। তবে থেমে থেমে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা আবারও সড়কে অবস্থান নিচ্ছেন।
বেতন বৃদ্ধিসহ তিন দাবিতে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় আজও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশ ও আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সকালে নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে শ্রমিকরা অবস্থান নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
আজ নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে উৎপাদন কাজ বন্ধ রেখে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তারা বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন। পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকালে নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন ও অনন্ত গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ছুটি ঘোষণার পর শ্রমিকরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
গতকালের মতো আজও মিরপুরে আন্দোলনের চেষ্টা করছেন পোশাকশ্রমিকরা। সকালে মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় জড়ো হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ধাওয়া দেয় পুলিশ। পুলিশের বাধায় ছত্রভঙ্গ হয়ে নিজ নিজ কারখানায় ফিরে গেছেন তারা।
মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার রোজিনা খাতুন বলেছেন, পোশাকশ্রমিকরা আজও রাস্তায় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তবে পুলিশ সদস্যরা তাদের সরিয়ে দিয়েছে।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ করছেন পোশাকশ্রমিকরা। গতকাল সকাল রাজধানীর মিরপুরের কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ করেন তারা। পরে অবরোধ সরাতে উদ্যোগ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তাদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। দুপুরে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয় আন্দোলনরত শ্রমিকরা।
গতকাল সকালে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, কোনাবাড়ী, কাশিমপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে।
গতকাল আন্দোলন হয়েছে সাভারের আশুলিয়ায়। নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুর ও আশেপাশের শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেন।
এদিকে বিক্ষোভের মধ্যে গতকাল রবিবার মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। যদিও এই বোর্ড গঠনের নির্ধারিত সময় ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরে। নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই গতকাল রবিবার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও থামেনি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন।
বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। ওই বোর্ডের সুপারিশে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
এদিকে আন্দোলনের মুখে দেশের অন্তত ৫০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে এক দিনে প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে গতকাল জানায় পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
রবিবার বিজিএমইএ’র সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ঢাকা এবং এর পাশের এলাকার প্রায় ৫০০ কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হবে।







