অন্ধকারে দিশা এআই পুলিশিং
- ডিএমপির ৯ অ্যাপ চালু
- ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সফল স্পট স্থিরচিত্র মামলা

দিন বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে অপরাধের ধরন। অন্ধকার গলিতে অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই কিংবা সিঁধেল চুরির বদলে দিন দিন বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ। গ্রাহককে ডিজিটাল ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে ব্যাংক হিসাবের অর্থ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ছবি দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তি, করা হচ্ছে জিম্মিও। অবশ্য অপরাধীদের টেক্কা দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কম যাচ্ছে না। তারাও অপরাধের লাগাম টানতে নিজেদের করছে যুগোপযোগী। ঝুঁকছে এআই পুলিশিংয়ের দিকে। যার সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে নগরবাসী। অপরাধের অন্ধকার জগৎ ভাঙতে দেখাচ্ছে আশার আলো।
সম্প্রতি পুলিশিং আধুনিকায়নে ৯টি নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এআইভিত্তিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় চালু হয়েছে এআই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। উন্নত ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা।
অপরাধ বিশ্লেষক ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ সংগ্রহ ও ই-প্রসিকিউশন পরিচালনা। ফলে কমবে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ, বাড়বে আইন প্রয়োগের দক্ষতা।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলছিলেন, আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে উন্নত প্রযুক্তির সংযোজন এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অপরাধ ক্রমেই জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের যুগোপযোগী করে তুলতে হবে।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্মার্ট সিসিটিভি ব্যবস্থায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে এআই। এই ক্যামেরাগুলো শনাক্ত করতে পারে সন্দেহজনক চলাফেরা, পরিত্যক্ত বস্তু ও সম্ভাব্য হুমকি। উন্নত ভিডিও শনাক্তকরণ প্রযুক্তি দিয়ে অস্ত্র বা সহিংস আচরণও চিহ্নিত করা যাচ্ছে। আর সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি গুলির শব্দ অনুযায়ী মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অবস্থান নির্ধারণ করতে পারছে। নতুন আইনে অনুমতি ছাড়া ডিপফেক তৈরি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধে এআই ব্যবহার করে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগে অঙ্গীকার জোরদার করেছে বাংলাদেশ। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানব পাচার, দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে দেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
কোন অ্যাপ কী কাজ করছে
জননিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করতে দেশে নাগরিকবান্ধব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এগুলো সেবার সহজলভ্যতা, দ্রুত সাড়া প্রদান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমন্বয়ে সহায়তা করছে। যেমন, ‘হ্যালো সিটি’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিক গোপনে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, সাইবার অপরাধ ও মাদক-সংক্রান্ত তথ্য জানাতে পারছেন। ফলে নিরাপত্তা কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। একইভাবে ‘রিপোর্ট টু বিজিবি’ প্ল্যাটফর্ম সীমান্তে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’-এর মাধ্যমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা এবং জরুরি যোগাযোগের সুবিধা পাচ্ছেন নাগরিকরা।
সব মিলিয়ে এসব উদ্যোগ জননিরাপত্তা ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতিফলন।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অধীন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এবং বিডিজি ই-গভ সার্ট-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সাইবার অপরাধ তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিকস এবং জাতীয় তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
তবে পুলিশিংয়ে এআই ব্যবহারের বিস্তার নিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগও। বিশেষ করে গণ-নজরদারির ঝুঁকি, তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, প্রযুক্তিগত পক্ষপাত এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার পরামর্শ, জবাবদিহি নিশ্চিতে কঠোর প্রত্যক্ষ তদারকি, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং নৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থায় দিতে হবে গুরুত্ব।






