হামলা, দখল ও চাঁদাবাজিতে ৩৮ নাগরিকের উদ্বেগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভূমি ও বাড়িঘর দখল, হামলা, ভাঙচুর এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের ৩৮ বিশিষ্ট ব্যক্তি।
আজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চরের খাসজমি দখল এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য দিবালোকে এবং রাতের অন্ধকারে দখল ও হামলার ঘটনা ঘটছে।
নাগরিকদের বিবৃতিতে সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, স্থাপনা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করা হয়।
তাদের ভাষ্য, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে। বর্তমানে সেখানে শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, এর পর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কয়েকশ লোক নিয়ে হামলা ও ভাঙচুর করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সাতমসজিদ হাউজিং-সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে ওই জমিতে থাকা স্থাপনা এবং হাউজিংয়ের অফিস থেকে নগদ ১৫ লাখ টাকা, জমির দলিল, এসি, ফ্যান, জানালা-দরজা, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়।
এ ছাড়া রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ, ‘সরকারদলীয়’ চাঁদাবাজদের চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তার স্টুডিওতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
বিবৃতিতে পটুয়াখালীর চরবাংলা, নোয়াখালীর সদর উপজেলার ভাটিরটেক ও চরফ্যাশন এবং ভোলার বিভিন্ন চর এলাকার কথাও উল্লেখ করা হয়। সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসীরা চরাঞ্চলে বসবাসরত ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে জমি দখল করছে এবং জমিতে থাকা ফসল রাতের অন্ধকারে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগরসহ দেশের বড় ও ছোট শহরগুলোতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে শিশু ধর্ষণ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে বলে দাবি করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কোনো এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়ার কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩৮ নাগরিকের মতে, এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাজনক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জনমনে দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে এসব ঘটনার সঙ্গে শুধু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই নয়, শাসকদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী মহল, পতিত সরকারের সশস্ত্র অনুসারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশও সরাসরি জড়িত।
তারা এসব অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দোষী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এবং তাদের দেশে-বিদেশে মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব বা ভাড়া করা বাহিনী দিয়ে এসব ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই বলেও বিবৃতিতে মন্তব্য করা হয়।
বিবৃতিদাতারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কোনো না কোনো পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় পুলিশ যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
তারা এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারেরও জবাবদিহির দায় রয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা
১. আনু মোহাম্মদ, সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
২. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।
৩. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি।
৪. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ।
৫. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি।
৬. আবু সাঈদ খান, লেখক ও সাংবাদিক।
৭. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
৮. ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী ও অনারারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট।
৯. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
১০. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী।
১১. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি।
১২. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৩. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৪. ড. গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৫. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৬. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স।
১৭. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
১৮. ড. নোভা আহমেদ, অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯. ড. ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
২০. রেহনুমা আহমেদ, লেখক।
২১. সাঈদ ফেরদৌস, নৃবিজ্ঞানী ও লেখক।
২২. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
২৩. ডা. নায়লা খান, অধ্যাপক, নিউরোলজিস্ট।
২৪. মো. নুর খান, মানবাধিকারকর্মী।
২৫. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক।
২৬. ড. ঈশিতা দস্তিদার, নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক।
২৭. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
২৮. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকারকর্মী।
২৯. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ।
৩০. সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।
৩১. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন।
৩২. রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট।
৩৩. শাহেদ কায়েস, কবি ও প্রাবন্ধিক।
৩৪. মিঠুন রাকসাম, কবি, প্রকাশক ও আদিবাসী সংস্কৃতিকর্মী।
৩৫. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী।
৩৬. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকারকর্মী।
৩৭. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকারকর্মী।
৩৮. মুক্তাশ্রী চাকমা, অধিকারকর্মী।






