১৬ জন ডাক্তারও ধরতে পারেননি যে রোগ
- আজ সিস্টিক ফাইব্রোসিস দিবস
- বিশ্বে আক্রান্ত ১ লাখ ৬২ হাজার মানুষ
- বছরে চিকিৎসা ব্যয় ৪ কোটি ৫ লাখ
- সবচেয়ে বেশি রোগী ইউরোপে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিশু আদিলের বয়স তখন মাত্র তিন মাস। হঠাৎ করেই শুরু হলো কাশি। কোনোভাবেই তা থামছিল না। সঙ্গে দেখা দেয় অস্বাভাবিক ধরনের তেলতেলে পায়খানা। বাবা-মা ভেবেছিলেন সাধারণ ঠান্ডাজনিত সমস্যা, কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আদিলের শরীর খারাপ হতে শুরু করল। এরপর শুরু হলো চিকিৎসক দেখানোর পালা। দেশের নামকরা সব হাসপাতাল ঘুরে একে একে ১৬ জন চিকিৎসককে দেখিয়েছেন আদিলের বাবা-মা। কিন্তু কেউই বুঝতে পারেননি রোগটি আসলে কী! তিন বছর ধরে চলেছে শিশুটিকে নিয়ে এক অন্ধকার যাত্রা।
আদিলের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বলছিলেন, ‘কখনোই ভাবিনি সাধারণ কাশির মতো উপসর্গযুক্ত একটি সমস্যা বিরল জিনগত রোগে পরিণত হবে!’
মোস্তাফিজুর জানালেন, বেশিরভাগ চিকিৎসকই এটিকে সাধারণ সংক্রমণ বা ঠান্ডাজনিত সমস্যা ভেবে অ্যান্টিবায়োটিক দিতেন। এতে কিছুদিনের জন্য উপশম হলেও আবার ফিরে আসত কাশি ও শ্বাসকষ্ট। সময়ের সঙ্গে আদিলের অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। বারবার নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছিল, ওজন-উচ্চতা স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ছিল না। আর জীবন হয়ে উঠেছিল হাসপাতালকেন্দ্রিক।
চিকিৎসার একপর্যায়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক প্রবীর কুমার প্রথম সন্দেহ করেন, এটি সিস্টিক ফাইব্রোসিস হতে পারে। এরপর করা হয় ঘামের ক্লোরাইড পরীক্ষা বা সোয়েট টেস্ট। যার ফল আসে পজিটিভ। আরও নিশ্চিত হতে ভারতের দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে জেনেটিক পরীক্ষার পর রোগটি নিশ্চিত হওয়া যায়। ততদিনে আদিলের বয়স তিন বছর। তার বাবা বলছিলেন, ‘এর আগে আমরা শুধু অন্ধকারে হাতড়ে বেড়িয়েছি। কোনো চিকিৎসকই বুঝতে পারেননি যে আমার ছেলের কী হয়েছে।’
এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে সিস্টিক ফাইব্রোসিস দিবস। সিস্টিক ফাইব্রোসিস একটি জিনগত রোগ। বাবা-মা দুজনের কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে এলে এটি দেখা দেয়। এই রোগে শরীরে ঘন ও আঠালো শ্লেষ্মা তৈরি হয়, যা ফুসফুস, অগ্ন্যাশয়, যকৃৎ এবং পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। ফলে রোগীরা দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বারবার নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, ওজন না বাড়া এবং হজমের সমস্যায় ভোগে। অনেক সময় রোগটি অ্যাজমা বা যক্ষ্মা হিসেবে ভুল শনাক্ত হয়, যার ফলে সঠিক চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।
বিশ্ব জুড়ে ৯৪টি দেশে আনুমানিক ১ লাখ ৬২ হাজার ৪২৮ জন মানুষ সিস্টিক ফাইব্রোসিস (সিএফ) নিয়ে জীবনযাপন করছেন। তবে এদের মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৫ হাজার ৩৫২ জনের (৬৫ শতাংশ) রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত হয়েছে। বাকি প্রায় ৫৭ হাজার ৭৬ জন রোগী এখনো রোগ নির্ণয়ের বাইরে রয়েছেন, ফলে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন না।
গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত ট্রিপল কম্বিনেশন থেরাপি পাচ্ছেন মাত্র ১৯ হাজার ৫১৬ জন রোগী, যা মোট রোগীর মাত্র ১২ শতাংশ। আঞ্চলিক চিত্রে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ৪৭ হাজার ৬৫০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। উত্তর আমেরিকায় এ সংখ্যা ৩৭ হাজার ২ জন, দক্ষিণ আমেরিকায় ১০ হাজার ৩৪ এবং অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৫২ জন। এশিয়ার ২৮টি দেশে মাত্র ৫ হাজার ৩৪৯ জন রোগী শনাক্ত হলেও গবেষকরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। শুধু ভারতেই প্রায় ৩৭ হাজার ৪০৬ জন সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী এখনো অনির্ণীত অবস্থায় থাকতে পারেন।
৯৬ শতাংশ কম দামে চিকিৎসা: সিস্টিক ফাইব্রোসিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ‘ট্রিকাফটা’ তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালস। ইলেক্সাক্যাফটর, টেজাক্যাফটর ও আইভাক্যাফটরের সমন্বয়ে তৈরি এই ওষুধ সিএফ চিকিৎসায় পরিবর্তন এনেছে। তবে উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বের অধিকাংশ রোগীর জন্য এ চিকিৎসা এখনো নাগালের বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিকাফটার বার্ষিক তালিকাভুক্ত মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে বেক্সিমকো ফার্মার তৈরি ট্রিকোর বার্ষিক মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ হাজার ৭৫০ ডলার এবং শিশুদের জন্য ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার। অর্থাৎ মূল ওষুধের যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত মূল্যের তুলনায় ট্রিকোর দাম প্রায় ৯৬ শতাংশ কম।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ আর এম লুৎফুল কবীর বলেছিলেন, ‘এই রোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই, তবে দ্রুত শনাক্ত ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় রোগীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক, ফিজিওথেরাপি, শ্বাসনালি প্রসারক ওষুধ, এনজাইম ও পুষ্টি সহায়তা রোগীদের দীর্ঘ সময় তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনে সাহায্য করে।’
সিস্টিক ফাইব্রোসিসের সাধারণ লক্ষণগুলো জানালেন জাতীয় বক্ষব্যাধী হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম খালেদ। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া কাশি, ঘন ও আঠালো কফ, বারবার ফুসফুসের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ, বারবার সাইনাসের সমস্যা, ওজন ও উচ্চতা স্বাভাবিকভাবে না বাড়া, পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও ওজন কম থাকা, দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ডায়রিয়া, তেলতেলে এবং দুর্গন্ধযুক্ত মল এবং পেট ফাঁপা। এ ছাড়া অস্বাভাবিকভাবে নোনতা ঘাম সিস্টিক ফাইব্রোসিসের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের পর অন্ত্রে মল আটকে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস এবং বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও দেখা যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছিলেন, সিস্টিক ফাইব্রোসিসকে বিরল রোগ হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবে দেশে কতজন রোগী আছেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এ বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ নেই।





