জুনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল কেন, দুই কারণ জানাল বিদ্যুৎ বিভাগ

ফাইল ছবি
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ ও প্রশ্নের মুখে অবশেষে মুখ খুলল বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ কাঠামো এবং গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়াই বিল বৃদ্ধির মূল কারণ বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। অবশ্য বিদ্যুৎ বিভাগ এও স্বীকার করেছে, কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুল পাওয়া গেছে, যেগুলো যাচাই করে সংশোধন করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ঢাকায় বিদ্যুৎ ভবনে এক ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে বিদ্যুৎ বিভাগ। সেখানেই এমন দাবি করা হয়। তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সিস্টেম লস কমানো এবং আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়তি বিল করা হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়নি বিদ্যুৎ বিভাগ।
ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের ভুলনীতির কারণেই দেশের বিদ্যুৎ খাতের আজকের এই দুরবস্থা। বিগত সরকার চাহিদার অতিরিক্ত সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করেছে, যা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে।
সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে আন্তরিক উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলছিলেন, ‘আমরাও চাই শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ বৈষম্য না থাকুক। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হচ্ছে। আমরা এ ব্যাপারে সচেষ্ট আছি। বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে স্বাবলম্বী হতে চাই আমরা। সেজন্য বর্তমান সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। আশা করছি, জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারব।’
লিখিত বক্তব্যে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ জানিয়েছেন, জুন মাসে বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও এসেছে। বিতরণ সংস্থাগুলোকে প্রকৃত তথ্য যাচাই ও অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়, যার সিংহভাগ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, জুন মাস থেকে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হয়েছে। মধ্য ও উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ায় গ্রাহকদের বিল বেশি মনে হচ্ছে। যদিও বেশিরভাগ গ্রাহককেই জুন থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে জুলাই মাসে। বর্তমানে পোস্ট পেইড গ্রাহককে যে বিল দেওয়া হয়েছে, তা মূলত মে মাসের। সেখানেও বাড়তি বিল এসেছে।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে কম বৃষ্টিপাত, ঈদুল আজহা, তীব্র গরম, ফুটবল বিশ্বকাপ এবং এসএসসি পরীক্ষার মতো বিভিন্ন কারণে দেশ জুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, রাইস কুকারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, যা বিলের অঙ্কে প্রভাব ফেলেছে।
কৌশলে বিল বাড়ানোর অভিযোগের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মেলেনি
প্রতি বছর সাধারণত মে-জুন মাসে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ আসে। এর কারণ হিসেবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, প্রতি বছর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে সিস্টেম লস কমানোর টার্গেট দেয় আরইবি। সেই সঙ্গে থাকে বকেয়া কমিয়ে আয় বাড়ানোর চাপ। এই টার্গেট পূরণ করতেই কোনো কোনো সমিতি গ্রাহকের ঘাড়ে বাড়তি বিল চাপিয়ে সিস্টেম লস কমিয়ে আয় বাড়ানোর অপকৌশল অবলম্বন করে। অনেকে আবার আরইবির সুনজরে থাকতে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির জন্যও বেছে নেন এই কৌশল। জুলাই মাসে আবার সিস্টেম লস বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে আরইবির মৌখিক নির্দেশনা থাকারও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম বলেছেন, ‘সিস্টেম লস কমানো এবং আয় বাড়াতে বিদ্যুৎ বিল বেশি করার অনিয়ম না করতে সমিতিগুলো কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু ভুলের কারণে বিল বেড়েছে যেগুলো উচিত হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।’ গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যাওয়া এবং কারও কারও ক্ষেত্রে পুরনো বকেয়া বিল যোগ হওয়ার কারণেই মূলত কিছু গ্রাহকের বাড়তি বিল এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
‘মে-জুনে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল : নেপথ্যে তিন অপকৌশল’ শিরোনামে গত ২ জুলাই আগামীর সময়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতি বছর মে-জুনে সিস্টেম লস কমানোর যে কৌশল নেওয়া হয়, তার বেশ কিছু নমুনা আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। এর একটি সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। এই সমিতির ২০২৪ সালের জুন মাসে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এক মাস পর জুলাইয়ে তা এক লাফে বেড়ে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়। পরের বছর জুনে সিস্টেম লস ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ দেখানো হলেও জুলাই মাসে দেখানো হয় ২১ দশমিক ১৬ শতাংশ।
গত বছরের জুন মাসে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ সিস্টেম লস ২ দশমিক ২৩ শতাংশ দেখানো হয়। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ। নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এ ২০২৪ সালের জুনে সিস্টেম লস ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে জুলাই মাসে হয় প্রায় দ্বিগুণ (৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ)। এর পরের বছর তা যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হয়।
বিলম্ব মাশুল ও মিটার ভাড়া
ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, আগে প্রতি মাসে ২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বিলম্ব মাশুল আদায় করা হলেও বিইআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী এখন মোট বিলের ওপর একবারই ৫ শতাংশ হারে বিলম্ব মাশুল ধার্য হয়। এ ছাড়া প্রিপেইড মিটার কিস্তিতে নেওয়া গ্রাহকদের সিঙ্গেল ফেজ মিটারে মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারে ২৫০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। মিটার ভাড়া নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বলে জানানো হয়েছে, শিগগির এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান
কোনো গ্রাহকের বিলে সন্দেহ বা আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রয়োজনে মিটার পরীক্ষা ও বিল পুনঃযাচাইয়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গুজব ও ভিত্তিহীন প্রচারে প্রভাবিত হয়ে বিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকার জন্যও নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, সিস্টেম লস কমানো এবং প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটারিং সম্প্রসারণের কাজ চলমান।






