বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, পরামর্শক, ব্যবস্থাপনা ফিতেই ৩৯ কোটি
অনুদানের নামে নয়ছয়ের ছক জার্মান সংস্থার
- আজ একনেকে উঠছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব
- সহনশীল নগর উন্নয়নের পথ খুঁজতে এমন প্রকল্প নিচ্ছে এলজিইডি
- কোন খাতে কত খরচ— জিআইজেডের ব্যবস্থাপনা ফি ১৮ কোটি ৫২ লাখ, আন্তর্জাতিক পরামর্শক ১৬ কোটি ৫৮ লাখ, জাতীয় পরামর্শক ৪০ কোটি ৬৭ লাখ, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ২ কোটি ৬০ লাখ, দেশীয় প্রশিক্ষণ ৩ কোটি ৫০ লাখ, সেমিনার ও সম্মেলন ব্যয় ৫০ লাখ টাকা
- জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নের জন্য অতীতে কৌশলগত নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না

প্রতীকী ছবি
অনুদানের নামে কষা হয়েছে নয়ছয়ের ছক। এখন শুধু অনুমোদনের পালা। আর সেটি হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশে জলবায়ু সহশীল নগর উন্নয়নের পথ খোঁজার ‘ইনোভেশন ক্লাইমেট স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’ নামের প্রকল্প। এটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যার পুরোটাই অনুদান হিসেবে দেবে জার্মান সরকারের সহযোগী সংস্থা জার্মান ডেভেলপমেন্টে কো-অপারেশন (জিআইজেড)। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এর বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে। কারণ, অনুদানের একটি বড় অংশ ৩৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশি পরামর্শক এবং সহযোগিতা দেওয়া সংস্থা জিআইজেডের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা চার্জের পেছনেই। সেই সঙ্গে দেশি লোকজনের জন্যও রাখা আছে কিছু খরচের সুযোগ। দেখে শুনে মনে হয়, মিলেমিশে ভাগবাটোয়ারা করে খাওয়া হবে প্রকল্পের অর্থের বড় অংশ।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি আজ রবিবার উপস্থাপন করা হচ্ছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটা অবশ্যই অনিয়ম। অনুদানের টাকা বলে নিজেদের পকেটে ভরার কোনো অধিকার জিআইজেডের নেই। এক্ষেত্রে শুধু জিআইজেডই নয়, এরকম আরও কয়েকটি সংস্থা আছে, যারা আমাদের নামে অনুদান এনে বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের পকেট ভরায়। এক্ষেত্রে এ দেশের কিছু লোকজন জড়িত, যারা পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে নিজেদের লাভ খোঁজেন। এতে দেশের খুব বেশি লাভ হয় না। ইআরডির এমন মনোভাব থাকা উচিত নয় যে, অনুদানের টাকা বলেই যেটুকু পাওয়া যায়, সেটিই ভালো। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।’
প্রকল্পটি খাতভিত্তিক ব্যয় প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জিআইজেডের ব্যবস্থাপনা ফি বাবদ ১৮ কোটি ৫২ লাখ, আন্তর্জাতিক পরামর্শক ১৬ কোটি ৫৮ লাখ, জাতীয় পরামর্শক ৪০ কোটি ৬৭ লাখ, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ২ কোটি ৬০ লাখ, দেশীয় প্রশিক্ষণ ৩ কোটি ৫০ লাখ এবং জাতীয় ও স্থানীয় সেমিনার বা সম্মেলন খাতে ৫০ লাখ টাকা খরচ হবে। অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে, চারটি পৌরসভার (চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চারঘাট, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জ) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রতিকূল প্রভাব মোকাবিলায় সমস্যা চিহ্নিত করা। সেই সঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় চারটি পৌরসভায় ১২টি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পভুক্ত পৌরসভায় জলবায়ু সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়নে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু এই ১২ পাইলট প্রকল্পের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি।
ইআরডির সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আজম এর আগে আগামীর সময়কে বলেছিলেন, ‘এটা কাম্য নয়। কেননা, আমাদের দেশের কথা বলে এই অনুদান সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সেটি যদি কার্যকর ব্যবহার না হয়, তাহলে এটি এক ধরনের প্রতারণা। অনুদান বলেই হেলায় ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এরও জবাবদিহি থাকতে হবে। তাদের কঠোরভাবে মনিটরিং করা দরকার।’
খোঁজ নিয়ে ও কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জিআইজেড অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরকম করে থাকে। অনুদানের নামে বড় একটি অংশ তাদের পকেটে ঢোকানোর ফন্দিফিকির থাকে। এর আগে একটি প্রকল্পে সরকার সংশ্লিষ্টদের না জানিয়ে অনুদানের মোট ৬১ কোটি টাকার অর্ধেকই তাদের নিজেদের খেয়াল খুশিমতো খরচ করার অভিযোগ উঠেছিল। বাকি অর্ধেকের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই ছিল পরামর্শক, প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়। নামমাত্র বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সুবিধাভোগীদের জন্য।
‘স্ট্রেনদেনিং আরবান ইন্টিগ্রেটেশেন ক্যাপাসিটিজ অব ইন্টারনালি ডিসেপ্লেসড পারসন অ্যান্ড সার্পোটিং হোস্ট কমিউনিটিজ’ প্রকল্পে ঘটেছিল এমন ঘটনা। প্রকল্পটি ছিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। অথচ খরচের বিষয়ে কোনো খবরই জানতেন না সংশ্লিষ্টরা। পরে প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। ইআরডির দায়িত্বশীলদের মনোভাব হলো, অনুদানের টাকা যেটুকু পাওয়া যায়, তা-ই লাভ। ফলে এখানে খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বন করা হয় না।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছে, একনেকে উঠতে যাওয়া প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার বলেছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জলবায়ু সহনশীল নগর তৈরির পরিকল্পনা পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে সে অনুযায়ী কার্যক্রম অন্য সব পৌরসভায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এটি বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ বৈদেশিক অনুদান থাকায় একনেকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভেতরে কী আছে না আছে, সেটি দেখা হয়নি।




