ঢাকায় মাদকের ৪৮৩৯ জোগানদাতা
- কারবারি ২৩ হাজার, মাদকাসক্ত ১ কোটি
- কারবারিতে শীর্ষে ঢাকা, সবচেয়ে কম সিলেটে
- ইয়াবা আসক্তির হার সবচেয়ে বেশি, দ্বিতীয় গাঁজা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাদকের বিস্তার রাজধানী থেকে মফস্বল— সব জায়গায়। এমন কোনো পাড়া-মহল্লা নেই যেখানে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ নেশার উপকরণ পাওয়া যাবে না। এই সর্বনাশা মাদকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ জড়িয়ে গেছেন প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) জরিপ বলছে, দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি মাদকাসক্ত। শতকরা হিসাবে যা মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৮৮ ভাগ।
পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ওই তালিকায় দেখা যায়, দেশে ২৩ হাজার ৩৬ জন মাদক কারবারি এর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে থাকা ঢাকা বিভাগে কারবারির সংখ্যা ৪ হাজার ৮৩৯ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগে কারবারির সংখ্যা ৪ হাজার ৭৬৬ জন। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে— ১ হাজার ১৯৭ জন। জেলাভিত্তিক সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারির বসবাস কক্সবাজারে। আর দেশে মাদকাসক্তদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছে ইয়াবা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে মাদকে সবচেয়ে বেশি আসক্ত ছাত্রছাত্রীরা। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হুমকি দেখা দিয়েছে জাতি মেধাশূন্য হওয়ার। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেছেন, মাদকদ্রব্য এ দেশে উৎপাদন ও তৈরি হয় না, বাইরে থেকে আসে। আসার পথ বন্ধ করা হলে দেশের অভ্যন্তরে মাদকদ্রব্য পাওয়া যাবে না। এ পথে সঠিক ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেই দেশে মাদক আসা বন্ধ করা সম্ভব।
যে পরিমাণে মাদকদ্রব্য দেশে আসছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও এসআরবি মিলে তার বিন্দু পরিমাণ উদ্ধার করতে পারছে না। সর্বনাশা মাদক প্রতিরোধে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে সীমিত জনবলে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা তালিকায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের পর রয়েছে রাজশাহী বিভাগে ৪২৩৫, খুলনায় ৩১৮৪, রংপুরে ১৯৬৯, ময়মনসিংহে ১৬০৯, বরিশালে ১২৩৭ এবং সিলেটে ১১৯৭ জন।
দেশে একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারি কক্সবাজারে। জেলার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বললেন, পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জেলার মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, মাদক নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের স্বার্থ জড়িত। সীমান্ত এবং অভ্যন্তরে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা থাকায় এ চক্র ভাঙা কঠিন। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
তিনি আরও বললেন, মাদক কারবারে অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ হওয়ায় এতে জড়িয়ে পড়ছেন নতুন নতুন মানুষ। কারবারিদের কাছে দেশের মানুষ জিম্মি। কারবারিরা গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়ালে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
৩টি করিডর
অন্তত ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের চোরাচালান। আর এসব মাদকের প্রধান গন্তব্য ঢাকা। ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রধানত তিনটি করিডর— ভারত সীমান্তের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক ঢুকছে দেশে।
কুরিয়ার ও অনলাইনকে বাহক হিসেবে ব্যবহার
ডিএনসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চোরাকারবারিরা স্থলসীমান্তের পাশাপাশি উপকূলীয় ও নদীপথ ব্যবহার করে মাদক দেশে নিয়ে আসে। পরে কুরিয়ার সার্ভিস ও অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়। অবৈধ এ কাজে তারা ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, কুরিয়ার সার্ভিস ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও চোরাচালানের একটি প্রধান রুটে অবস্থান করায় আন্তঃসীমান্ত মাদক চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজধানীতে ২৪৭ স্পট
ডিএনসি ঢাকা মহানগর এলাকার আটটি ‘অপরাধ জোনে’ ২৪৭টি স্থানকে মাদক বেচাকেনার স্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব জায়গায় প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, আইস, হেরোইন ও ফেনসিডিল। মাদকের হট স্পটের মধ্যে— কারওয়ান বাজার রেললাইন, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুরের বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প ও রাতে বিভিন্ন পার্ক এলাকা অন্যতম। এ ছাড়া বাড্ডা, মহাখালী, তেজগাঁও, তুরাগ, শনির আখড়া, ডেমরা, মুগদা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, গাবতলী-বাগবাড়ী, ফকিরাপুল কালভার্ট বস্তি, গোলাপবাগ, সিটি কলোনি, আগারগাঁওয়ের বস্তি, গোপীবাগ মেথরপট্টি রেললাইন, সায়েদাবাদ জনপদের মোড় থেকে দয়াগঞ্জ সড়ক, মান্ডা, যাত্রাবাড়ী এবং ঢাকার রিকশা গ্যারেজগুলোও পরিচিতি পেয়েছে নতুন করে মাদকের স্পট হিসেবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আকতার হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, রাজধানীতে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে শুধু রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
কারবারিদের সম্পদের হিসাবের তদন্তে সিআইডি
মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকায় মাদক কারবারে জড়িত ৪০৬ জন ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের অবৈধ সম্পদ নিয়ে তদন্ত করছে সিআইডির মানি লন্ডারিং ইউনিট। সিআইডি জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে মাদক কারবারিদের নিজের ও স্বজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনে গতি বাড়ছে ডিএনসির
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে— জনবল, আধুনিক মাদক শনাক্তকরণ সরঞ্জাম, যানবাহন ও গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর অভিযান পরিচালনায় কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে সংস্থাটির। তবে নতুন ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এ ডিএনসির অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
ডিএনসির এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, সংশোধিত আইনের আওতায় ডিএনসির নিজস্ব সাইবার ইউনিট ও ডগ স্কোয়াড থাকবে এবং বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত সুযোগ পাবে তারা। এ ছাড়াও নারী ও শিশুসংশ্লিষ্ট মামলা পরিচালনার জন্য থাকা বিশেষায়িত ডেস্কের মতো থানাগুলোতেও মাদক মামলার জন্য আলাদা ডেস্ক থাকবে।



