মত বিশিষ্টজনের
শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়লেও এখনো সার্কে পিছিয়ে বাংলাদেশ

জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘কেমন হলো শিক্ষা বাজেট: বাস্তবতা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা, ছবি : আগামীর সময়
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে উন্নয়ন বাজেট ব্যাপক হারে বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের মোট ব্যয়ে এখনো বেশ পিছিয়ে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।
আজ বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘কেমন হলো শিক্ষা বাজেট : বাস্তবতা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।
গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংস্থার উপপরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা বাজেটের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, গত অর্থবছরের তুলনায় এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশ বাড়ানো হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষায় উন্নয়ন বাজেট ছিল ২০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়িয়ে ৫২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। একইভাবে গত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট ব্যয় ছিল জিডিপির ১.৪১ শতাংশ, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৭৯ শতাংশে। তবে শিক্ষায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেই।
মূল বক্তব্যে ড. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী একটি দেশের শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয় করা উচিত। সেই তুলনায় বাংলাদেশের মোট বরাদ্দ এখনো অনেক কম।
সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ভুটানে শিক্ষা খাতে জিডিপির ব্যয় ৭ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫.২ শতাংশ, নেপালে ৫ শতাংশ, ভারতে ৪.৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ২.৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১.৯৭ শতাংশ। এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশেই শিক্ষা খাতে বাজেটে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। তবে সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতের এই বাজেট ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এবারের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। সরকার শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা এবং ব্যাগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি মিড ডে মিল, স্কুলে মালটিমিডিয়া ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং শিক্ষকদের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণের মতো বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এসব ভালো উদ্যোগের পাশাপাশি বাজেটে শিক্ষা খাতের বেশ কিছু ঘাটতিও তুলে ধরেন বক্তারা। তারা বলেছেন, দেশের গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল শিক্ষার মানের মধ্যে এখনো বড় বৈষম্য রয়ে গেছে। এ ছাড়া যারা বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে বা স্কুলের গণ্ডির বাইরে আছে, তাদের কীভাবে আবার শিক্ষায় যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো ভাবনা প্রকাশ পায়নি। এই সংকট কাটাতে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিনের ভাষ্য, বর্তমানে একটি গভীর শিক্ষণ ঘাটতি বা লার্নিং ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা আরও গুরুতর হচ্ছে। দেশের একজন শিক্ষার্থী গড়ে ১০ বছর স্কুলে গেলেও প্রয়োজনীয় বা মানসম্মত শিক্ষা পায় মাত্র ৬ বছর। বাকি ৪ বছর যে সময় অপচয় হচ্ছে, সেটাই আমাদের বড় সংকট। দরদ এবং দায়বদ্ধতা একসঙ্গে চিন্তা করে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক বাড়ানোর মাধ্যমেই এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব।
সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে রাশেদা কে চৌধুরী জানালেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রায়ই হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেমন কিছুদিন আগে শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার ফি চাপিয়ে দেওয়া হলো, আবার তীব্র সমালোচনার মুখে তা তুলে নেওয়া হলো। শিক্ষাক্ষেত্রে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোই প্রকৃত উন্নয়ন নয়, সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে সেটাই বড় বিষয়। সরকারি বরাদ্দ বাড়ালেই শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে না। অনেক সময় দেখা যায় বছরের শেষে বরাদ্দ পুরোপুরি ব্যয় হয় না, আমলাতান্ত্রিক পাইপলাইনে আটকে থাকে। তাই আমাদের খরচের দক্ষতা বাড়াতে হবে। দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে গুরুত্ব দিতে গিয়ে শিক্ষার গুণগত মানের মতো অদৃশ্য ও প্রয়োজনীয় উন্নয়নগুলো যেন প্রাধান্য না হারায়, সেদিকে পুরো বছর ধরে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।






