আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস আজ
দুর্যোগে ঘরছাড়া মানুষের ক্ষতি ১২০০ কোটি
- ২০০৮-২০২৫ সালে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি স্থানচ্যুত
- ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বন্যাতেই ক্ষতি ৯১%

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সুন্দরবনের কোলঘেঁষে থাকা মানুষের জীবন-জীবিকা দাঁড়িয়ে আছে বনের মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণের ওপর। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে রাস্তা ভাঙে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মৎস্যঘের প্লাবিত হয় এবং ক্ষতি হয় গবাদি পশুর। ঝড় থেমে যায়, কিন্তু দুর্যোগের ক্ষত রয়ে যায় দীর্ঘদিন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সুজায়েত হোসেন ওরফে মানিক মোড়ল বলছিলেন, ‘আমাদের ৯৯ শতাংশ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় রাস্তার ভাঙন। সড়ক ভেঙে গেলে মৎস্যঘের প্লাবিত হয়। এ এলাকার ৯৫ শতাংশ মানুষের ঘর কাঁচা; ঝড়-বৃষ্টিতে এসব ভেঙে যায়। একটি দুর্যোগ থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আসে আরেক দুর্যোগ।’ সুজায়েত হোসেনের এই বক্তব্যের চিত্রই যেন উঠে এসেছে গবেষণা প্রতিবেদনেও। নতুন গবেষণায় তথ্য উঠে এসেছে, ২০০৮-২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত হয়েছে। এর ৯১ শতাংশের বেশি ঘটেছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে। এই ১৭ বছরে স্থানচ্যুতির ফলে দেশে প্রায় ৮৯ হাজার ‘জীবন-বছর’ ক্ষতি হয়েছে, যার বার্ষিক গড় মূল্য প্রায় ১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা।
যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সংস্থা ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) এবং অভিবাসনবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত গবেষণাটির অর্থায়নে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা (সিডা)।
এমন বাস্তবতায় আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস। জাতিসংঘের দুর্যোগ হ্রাসবিষয়ক দপ্তর ইউএনডিআরআরের এ বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘রেজিলিয়েন্স স্টার্টস অ্যাট হোম’ অর্থাৎ, দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবিলার প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তৈরি হতে হবে ঘর থেকেই।
জাতিসংঘ দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দপ্তর (ইউএনডিআরআর) বলছে, দুর্যোগের ক্ষতি প্রথমেই পড়ে ঘর ও পরিবারের ওপর। তাই দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে হলে নিরাপদ, টেকসই ও দুর্যোগ-সহনশীল ঘর এবং পরিবারের প্রস্তুতিতে জোর দিতে হবে।
কোন দুর্যোগে বেশি ক্ষতি
সাধারণত দুর্যোগের প্রতিবেদনে শুধু স্থানচ্যুত মানুষের সংখ্যা বা ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ক্ষতির হিসাব তুলে ধরা হয়। কিন্তু দুর্যোগে ঘরছাড়া হওয়ার ক্ষতি শুধু ঘর ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
আইডিএমসি এবং রামরুর গবেষণায় ঘরছাড়া হওয়ার পর বাসস্থান, জীবিকা, জরুরি সেবা ও সামাজিক যোগাযোগে যে বিঘ্ন ঘটে এবং জীবনযাত্রার মান কতদিন কমে থাকে— তার সম্মিলিত প্রভাব হিসাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দুর্যোগজনিত স্থানচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত জীবনমানের ক্ষতি ৮৯ হাজার জীবন-বছরের সমান।
এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ও ঝোড়ো জলোচ্ছ্বাস মোট মানবিক ক্ষতির ৫৯ শতাংশ বা প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বন্যার অংশ ৩২ শতাংশ বা প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা মিলে মোট মানবিক ক্ষতির ৯১ শতাংশ। বাকি দুর্যোগগুলোর অংশ ৯ শতাংশ।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি বৃহত্তম দুর্যোগ মোট মানবিক ক্ষতির প্রায় ৩১ শতাংশ তৈরি করেছে। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে ছোট ও মাঝারি মাপের বারবার ঘটা স্থানচ্যুতি থেকে। বিশেষ করে উপকূলীয়, চরাঞ্চলের ও নদীতীরের অনেক পরিবার এক দুর্যোগ থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আরেক দুর্যোগের মুখে পড়ে।
সাতক্ষীরা জেলা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক ই এলাহির মতে, দুর্যোগে মানুষের মৃত্যু অনেক কমেছে। কিন্তু ঘরবাড়ি, গবাদি পশু ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষতি সেই তুলনায় কমেনি। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘সরকার বিভিন্ন সময় ঘর ভাঙলে টাকা দেয়। কিন্তু সেই টাকা না দিয়ে আগে থেকেই উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ঘর পুনর্বাসন ও দুর্যোগ-সহনশীল করা হলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। তাই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে শেল্টার, আশ্রয়ণ ও ঘর পুনর্বাসনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলে সম্পদ ও গবাদি পশুর ক্ষতি কমবে।’
দরিদ্ররাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
গবেষণায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার ১ হাজার ৭৪৯টি স্থানচ্যুত পরিবারের ওপর জরিপ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৬৭টি পরিবার স্থানচ্যুতির আগেই দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। জরিপে দেখা গেছে, দরিদ্র পরিবারগুলোর আয় কিছুটা বাড়লেও তারা মূলত দারিদ্র্যসীমার নিচেই রয়ে গেছে। ১ হাজার ৪৬৭টি দরিদ্র পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩৮১টি স্থানচ্যুতির পর দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পেরেছে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর প্রায় ২০ শতাংশ স্থানচ্যুতির পর আয় কমেছে বলে জানিয়েছে। এর মধ্যে ১১ শতাংশ পরিবারের আয় ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে।
নিরাপদ ঘর না থাকায় ক্ষতি
গবেষণা বলছে, ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, জীবিকা বন্ধ হওয়া, সেবা বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং পুনরুদ্ধারে দেরি হওয়া— এসবই ক্ষতি বাড়ায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে গড়ে ১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকার মানবিক ক্ষতি দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার দুর্যোগ-সহনশীল ঘর নির্মাণ করা সম্ভব হতো। একই অর্থে ১০ লাখের বেশি পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তা বা প্রায় ৮০ লাখ মানুষের এক মাসের খাদ্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব হতো। অর্থাৎ, নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল ঘরের অভাবই প্রতি দুর্যোগে ক্ষতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে স্থানচ্যুতি ও ক্ষতি আরও বাড়বে বলে গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বন্যায় বার্ষিক ক্ষতি বর্তমানে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা; খারাপ জলবায়ু-পরিস্থিতিতে তা প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। জলোচ্ছ্বাসে বার্ষিক ক্ষতি বর্তমানে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা; খারাপ পরিস্থিতিতে তা প্রায় ২ হাজার ২৭০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ নিরাপদ ঘর, বন্যা প্রতিরোধ ও উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগ না বাড়লে ভবিষ্যতে ক্ষতি ৮ থেকে ১০ গুণ বাড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প— দুর্যোগ দেশে অনিবার্য বাস্তবতা। এমন প্রেক্ষাপটে মানুষ যখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে, তখনই পাশে এসে দাঁড়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। দুর্যোগের দুর্ভোগ প্রশমনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
কী করা দরকার
গবেষণায় বলা হয়েছে, আগাম সতর্কতা ও সরিয়ে নেওয়ায় মৃত্যুহার কমেছে; কিন্তু স্থানচ্যুতির ক্ষতি কমাতে হলে দ্রুত ঘর, জীবিকা ও মৌলিক সেবা পুনরুদ্ধার করতে হবে। দুর্যোগ-সহনশীল ঘর, বন্যা প্রতিরোধ, দ্রুত পুনরুদ্ধার, দরিদ্রদের জন্য নগদ সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। বিশেষত উপকূলীয়, চরাঞ্চলের ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ দরকার।
গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের নারীরা বহু বছর ধরে পরিবারের খাদ্য, পুষ্টি, জ্বালানি ও বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছেন। যাদের আমরা গৃহকর্মী বা হোমমেকার বলি, তারা আসলে সারা বছর ধরে দুর্যোগের প্রস্তুতি নেন। যেমন— তারা বড়ি তৈরি করে রাখেন, পাটের পাতা শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন, বীজ সংরক্ষণ করেন। এসব কাজ শুধু গৃহস্থালি নয়; এগুলো দুর্যোগের প্রস্তুতি ও পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার অংশ। তাই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে নারীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাহলে পরিবার ও কমিউনিটির সহনশীলতা বাড়বে।’



