আবার গণভোট হলে আগের গণভোটের কী হবে

সংগৃহীত ছবি
যদি আবারও গণভোটের আয়োজন করা হয়, তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়ের কী হবে? সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নতুন গণভোটের প্রস্তাব ঘিরে সামনে এসেছে এমন প্রশ্ন। সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন— এ বিতর্কে সরকার ও বিরোধী জোটের মতপার্থক্য যখন স্পষ্ট, তখন আগের গণভোটের রায় উপেক্ষা করে নতুন গণভোটের উদ্যোগকে স্ববিরোধী বলে মনে করছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। অন্যদিকে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, বর্তমান সংবিধানে গণভোটের বিধানই পুরোপুরি কার্যকর নেই। ফলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা নিয়েও।
সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন— এ প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী জোটের বিরোধ এখন সংসদের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও সেই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যরা। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের এমপিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এই বিরোধের জেরে সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধী দল।
তবে বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও বিশেষ কমিটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত রবিবার গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হতে পারে। এতে সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের প্রস্তাব থাকবে। বিলটি সংসদে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটের আয়োজন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষ কমিটির এই প্রস্তাবের পরই সামনে এসেছে আগের গণভোটের রায় নিয়ে প্রশ্ন। এরই মধ্যে যে গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে, সেই রায়ের পর আবার গণভোটের প্রয়োজন কেন? নতুন গণভোট হলে আগের গণভোটের সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক অবস্থান কী হবে? আর জনগণের দেওয়া প্রথম রায় বাস্তবায়ন না করেই দ্বিতীয় গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা কতটা যুক্তিসংগত হবে—এমন প্রশ্নও তুলছেন আইনজ্ঞরা।
আগামীর সময়কে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হলে গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে। তবে জুলাই সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে অস্বীকার করে আবার নতুন গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলে, তা হবে স্ববিরোধী।
তিনি বললেন, দেশে এরই মধ্যে একটি বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটেছে। সরকার পরিবর্তন ও সাংবিধানিক সংকটের প্রেক্ষাপটে জনগণ তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটে অংশ নিয়েছে। সেই গণভোটে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সংস্কার কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়েও জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে।
শরীফ ভূঁইয়ার ভাষ্য, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং ভোটাভুটির প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা ছিল। ফলে সেই আদেশ ও গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তার অভিযোগ, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে এবং গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধনের পথে হাঁটছে। অথচ এই পদ্ধতিতে সংস্কার করতে হলে সংসদকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সংশোধনী পাসের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে গণভোট আয়োজনের বাধ্যবাধকতাও সৃষ্টি হবে।
সংবিধানকে শুধু একটি আইনগত দলিল হিসেবে দেখতে নারাজ এই আইনজীবী। তার মতে, এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলিল। তাই সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হলে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে পরিবর্তনের বৈধতা ও জনগ্রহণযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হয়।
অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শরীফ ভূঁইয়া বললেন, একতরফা সাংবিধানিক সংশোধন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী এবং তার আগে চতুর্থ সংশোধনীর উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, জনগণের দাবি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উপেক্ষা করে সংবিধান পরিবর্তনের পরিণতি অতীতে দেখা গেছে। বিএনপির ক্ষেত্রেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর মতো জনদাবি উপেক্ষিত হওয়ার নজির রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটিকে মনগড়া ও সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা বলে মনে করছেন তিনি। তার মতে, পঞ্চম সংশোধনী ও পঞ্চদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলার রায় এবং পঞ্চদশ সংশোধনীকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টির প্রকৃত সাংবিধানিক অবস্থান স্পষ্ট হবে।
শিশির মনিরের বক্তব্য, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী গণভোট আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে— এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তার মতে, ১৪২ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পুনর্বহাল হলেও গণভোটের বিধান পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এটি কার্যকর করতে হলে পৃথক সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদকে নতুন করে সংবিধানে যুক্ত করতে হবে।
এদিকে বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। ফলে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানে পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে জনগণের সরাসরি মতামত নিতে হবে।
১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে এই বিধানের আওতায় সংবিধানের প্রস্তাবনা ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদে বিল পাসের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটের ব্যবস্থা ছিল। তবে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হয় এবং গত জুলাইয়ে আপিল বিভাগও সেই রায় বহাল রাখেন।
সব মিলিয়ে সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু আইনি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে গণভোটের রায়, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রশ্নে। একদিকে সরকার প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সংশোধনের পথে এগোতে চাইছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট চাইছে, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন। এই দুই অবস্থানের মধ্যবর্তী দূরত্ব না কমলে নতুন গণভোটের প্রস্তাব সাংবিধানিক জটিলতা নিরসনের বদলে বিতর্ক আরও বিস্তৃতি লাভ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



