জুলাইয়ের ১২৯ মামলায় চার্জশিট
১০ হাজার আসামির ৬ হাজারই তদন্তে নির্দোষ

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শিহাব উদ্দীন। চব্বিশের গণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর শেষ দিকে এসে শিকার হয় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার। শরীরের কয়েকটি জায়গা যায় কেটে ছিলে। অথচ এই দুর্ঘটনাকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সাজিয়ে আদালতে করা হয় হত্যাচেষ্টা মামলা। যাতে আসামি করা হয় অন্তত ৩২ জনকে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দীর্ঘ তদন্তে উঠে এসেছে সাজানো এই মামলার আদ্যোপান্ত। পুরো বিষয়টি তুলে ধরে এরই মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে করা হয়েছিল ওই মামলা।
এমন সাজানো মামলার সংখ্যা আরও অনেক। শুধু সাজানো মামলা নয়, জুলাই আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোয়ও আসামির সংখ্যায় বাড়বাড়ন্ত। এমন ১২৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পিবিআই। যেগুলোর তদন্তে ৯ হাজার ৮৬৫ আসামির মধ্যে ৬ হাজার ৮৯ জনই নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় অভিযোগপত্র থেকে দেওয়া হয়েছে অব্যাহতি। এ হিসাবে শতকরা ৬২ ভাগ আসামির বিরুদ্ধেই মেলেনি অভিযোগের সত্যতা। আর ২৫ মামলার তদন্তে পুরো অভিযোগই সাজানো প্রমাণিত হওয়ায় সব আসামিকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট)। আগামীর সময়-এর হাতে আসা নথিপত্র ঘেঁটে মিলেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা পারুল খাতুন। ছেলে কাওছার মিয়া জুলাই আন্দোলনে উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে ছাত্র-জনতার মিছিলে গিয়ে গুলি খেয়ে হারান প্রাণ, লাশ করা হয় গুম— এমনই অভিযোগে ৪০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পারুল। সেই কাওছারই ডাকাতি প্রস্তুতির মামলায় গত বছরের ২ জুন গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে। ফলে পারুল খাতুনের অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে ‘হত্যা ও লাশ গুমের’ এ মামলাটিও সাজানো জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পিবিআই।
পিবিআইপ্রধান পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামালের সঙ্গে আলাপেও উঠে এলো একই ধরনের তথ্য। তিনি জানালেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় হওয়া অধিকাংশ মামলারই শেষ হয়েছে তদন্ত। যদিও কয়েকটি মামলার এখনো পাওয়া যায়নি এমসি (মেডিকেল সার্টিফিকেট)। প্রক্রিয়া চলছে সেগুলো সংগ্রহের। এ ছাড়া কিছু মামলার তদন্তকাজ বাকি রয়েছে সামান্যই। দ্রুতই এগুলোরও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে আদালতে। অনেক মামলাতেই নির্দোষদের আসামি করার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে মোস্তফা কামাল বললেন, ‘কোথাও কোথাও ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, এমন ব্যক্তিদেরও মামলায় জড়ানো হয়েছে। এসব আজগুবি মামলা থেকে নির্দোষদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’
সাজানো মামলার উদাহরণও টানেন পিবিআইপ্রধান, ‘নারায়ণগঞ্জের একটি ঘটনায় করা মামলায় হাতিয়া, সন্দ্বীপ কিংবা পঞ্চগড়ের বাসিন্দাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের কেউ জীবনে কখনো ঢাকাতেই আসেননি। তদন্তে এমন অসংগতির প্রমাণ পাওয়ায় বহু মামলায় নির্দোষ ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।’ আরেকটি ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে জানালেন, আহত একজনের মামলায় তার নিজের মাকেও করা হয়েছিল আসামি। মায়ের পরিবারেরও কয়েকজনের নাম তুলে দেওয়া হয় এজাহারে। পরে তদন্তে জানা যায়, ভুক্তভোগীর বাবার সঙ্গে মায়ের হয়েছিল বিবাহবিচ্ছেদ। আর এ নিয়ে বিরোধের জেরে ছেলের অজান্তে বাবা এসব নাম যোগ করেছিলেন এজাহারে। তদন্ত শেষে ওইসব নাম বাদ দিয়েই জমা দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন।
সারা দেশে আদালতে ও থানায় ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের ঘটনায় হয় অসংখ্য মামলা। যেগুলোর মধ্যে ২৭০টির তদন্ত করছে পিবিআই। এর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা (সিআর) মামলা ১৯৩টি ও থানায় হওয়ার (জিআর) মামলা রয়েছে ৭৭টি। আগামীর সময়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, আদালতে করা ১৯৩টি মামলার মধ্যে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে ৯২টির অভিযোগ। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল ৮ হাজার ৯৬১ জনকে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ২০৯ জনকে অভিযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে চার্জশিট। বাকি ৫ হাজার ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় সুপারিশ করা হয়েছে অভিযোগ থেকে তাদের অব্যাহতির। অর্থাৎ এসব মামলার মোট আসামির ৬৪ দশমিক ১৮ শতাংশই নির্দোষ বলে উঠে এসেছে তদন্তে। বাকি ৫৪ মামলার মধ্যে ২৫টি অপ্রমাণিত, যার ১৪টির অভিযোগ মিথ্যা আর ৫টি সত্য, কিন্তু হয়নি প্রমাণিত।
অন্যদিকে থানায় হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৭৭টির মধ্যে ৩৭টি নিষ্পত্তির জন্য আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল ৯০৪ জনকে। তদন্তে তাদের মধ্যে ৫৬৭ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে অভিযোগ। সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বাকি ৩৩৭ জনের। ফলে সুপারিশ করা হয়েছে তাদের অব্যাহতির। অর্থাৎ থানার মামলায় শতকরা ৩৭ দশমিক ২৮ ভাগ আসামি নির্দোষ। আর ৬২ দশমিক ৭২ ভাগ দোষী প্রমাণিত হয়েছে প্রাথমিকভাবে। জিআর ও সিআর মামলায় মোট আসামি করা হয়েছিল ৯ হাজার ৮৬৫ জনকে। যাদের মধ্যে ৬ হাজার ৮৯ জনে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে তদন্তে। অর্থাৎ ৬১ দশমিক ৭২ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে সত্যতা পাওয়া যায়নি অভিযোগের। যে কারণে তাদের নাম বাদ দিয়ে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে তদন্ত সংস্থাটি।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস অব বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদের মতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা কেন্দ্র করে হওয়া অনেক মামলাই এখন প্রশ্নের মুখে। আগামীর সময়কে বললেন ‘প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। ফলে এসব মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করে আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’
‘কোনো হত্যা মামলায় যদি তদন্তে এমন ব্যক্তিদের দায়ী করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই, তাহলে সেই মামলা আদালতে টিকবে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। তারা যে ন্যায়বিচারের আশা করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যেতে পারে’— যোগ করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।






