ভালোবাসার শেষ পরিণতি হত্যায়
প্রিয় মানুষটিই যখন খুনি!
- আমবাগানে নারীর মরদেহ, পরিচয় মেলেনি ফিঙ্গারপ্রিন্টেও
- নিহতের ছবি ফেসবুকে পোস্টের পর মেলে পরিচয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমবাগানে পড়েছিল পরিচয়হীন নারীর মরদেহ। ফিঙ্গারপ্রিন্টেও মেলেনি পরিচয়। ফেসবুকে ছবি পোস্টের এক দিন পর জানা গেল, তিনি মিথিলা আক্তার পিংকী। এরপর মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ আর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে প্রেম ও বিয়ের জন্য চাপ ঘিরে হত্যার রহস্য। পিংকীর পরিচয় শনাক্তের পর ঘুরে যায় তদন্তের মোড়। প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত করা হয় সন্দেহভাজন খুনিকে। শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে যিনি পিংকীকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে দেন জবানবন্দিও। এরপর সবকিছু তুলে ধরে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ঘটনাটি মানিকগঞ্জের শিবালয় থানা এলাকার। ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ উথলী ইউনিয়নের ইছাইল গ্রামের একটি আমবাগান থেকে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শিবালয় থানা-পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে করে হত্যা মামলা।
প্রাথমিকভাবে থানা-পুলিশ দুদিন তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন বা শনাক্ত করতে পারেনি নিহতের পরিচয়। পরে পিবিআই নিজ উদ্যোগে গ্রহণ করে মামলাটির তদন্তভার। শুরুতে পিবিআইয়ের মানিকগঞ্জের ক্রাইমসিন দল ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করে নিহতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট। তবে জাতীয় ডেটাবেজে তার আঙুলের ছাপের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। মরদেহের পরিচয় খুঁজে বের করতে তখন ভিন্ন কৌশল নেয় পিবিআই। নিহতের ছবি পোস্ট করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এক দিন পরই আসে সাফল্য। শনাক্ত হয় ওই নারীর পরিচয়। তিনি মিথিলা আক্তার পিংকী। পরিচয় পাওয়ার পর তদন্তের গতি আরও বাড়ে। নিহতের মোবাইল ফোন নাম্বার ও কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে আনা হয় সন্দেহের তালিকায়। যাদের গতিবিধি পর্যালোচনা করে পিবিআই। সন্দেহের তালিকা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ইয়াছিন হাসান হৃদয় (২২) নামে একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে মিথিলা ও হৃদয়ের সম্পর্কের তথ্য। একই কলেজে পড়ার সুবাদে তাদের পরিচয়। পরে সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাৎ এবং একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে তৈরি হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
জানা গেছে, হৃদয়ের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার উথুলী ইউনিয়নের বাড়াদিয়া গ্রামে। আর মিথিলার বাড়ি মানিকগঞ্জ পৌরসভার পশ্চিম সেওতা মহল্লায়। ২০২৪ সালে তারা মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে বিএ (পাস) ডিগ্রির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একপর্যায়ে মিথিলার আগের স্বামী ও একাধিক ‘প্রেমিক’-এর তথ্য জানতে পারেন হৃদয়। এতে তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় মিথিলার। অন্যদিকে, মিথিলা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন। বিয়ে না করলে তাদের ঘনিষ্ঠতার সব কথা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকিও দেন মিথিলা।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সম্মানহানির শঙ্কায় মিথিলাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন হৃদয়। কৌশলে তাকে ওই বছরের ১৭ মার্চ রাতে শিবালয়ের আমবাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। বাগানটিতে ঢোকার আগে মিথিলার মোবাইল ফোনে থাকা দুজনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি, ভিডিও ও মেসেজ মুছে দেন হৃদয়। এরপর রাস্তার পাশ দিয়ে আমবাগানে ঢুকতেই মিথিলা দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেন হৃদয়কে। হৃদয়ও তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দেন। একপর্যায়ে জড়িয়ে ধরা অবস্থায়ই গাছের সঙ্গে ঠেকিয়ে মিথিলার গলা চেপে ধরেন, এতে অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মিথিলা। তারপর হিজাবের কিছু অংশ দিয়ে মিথিলার গলায় গিঁট দেন এবং বাকি কিছু অংশ মুখের ভেতর ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করেন হৃদয়। হত্যার আলামত গোপন করতে নষ্ট করে ফেলা হয় মিথিলার মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড। ভ্যানিটি ব্যাগসহ মরদেহ ফেলে রাখা হয় আমবাগানে।



