শিল্পমন্ত্রী
‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করেই নেওয়া হবে প্রকল্প

‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তব্য দেন শিল্পমন্ত্রী
বিগত বছরগুলোর মতো অহেতুক কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে না বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, আগামীতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কেবল সুনির্দিষ্ট আর্থিক উপযোগিতা, জনকল্যাণ এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করেই প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
আজ বুধবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেছেন তিনি।
বিগত সময়ে অপরিকল্পিত ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন শিল্পমন্ত্রী। এর কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘অতীতে এমন সব প্রকল্প নেওয়া শুরু হয়েছিল, যেগুলোর কোনো ইভেনচুয়াল রিটার্ন বা ভবিষ্যৎ প্রাপ্তি নেই। ৫ টাকার প্রজেক্টে ১৫ টাকা ঋণ করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও উপযোগিতার ক্ষতি করা হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় এগুলোর উপযোগিতা বিচার করলে মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
তার ভাষ্য, ‘ঋণ নিয়ে যে অবকাঠামো করা হবে, তার ওপর ভর করে যেন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আসে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আগামীতে এডিপি প্রকল্প পাসের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর “থ্রি-আর” (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) নীতির পাশাপাশি প্রতিটি বিনিয়োগের একটি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান রিটার্ন থাকতে হবে। উদ্দেশ্যবিহীন কোনো প্রকল্প আর নেওয়া হবে না।’
বছরের পর বছর ধরে লোকসানে থাকা এবং অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানাগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলছিলেন, ‘শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৬টিই বন্ধ। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সাপেক্ষে আমরা এগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে দিতে চাই। পুরনো কারখানার জায়গায় যে আগের শিল্পই করতে হবে এমন নয়, বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন শিল্প করবেন।’
তিনি জানান, সরকারি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরির তিনটি কারখানায় নতুন বিনিয়োগের জন্য রোড শো করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সার কারখানাগুলো যেন গ্যাসের অভাবে বন্ধ না থাকে, সেজন্য একটি ডেডিকেটেড গ্যাস নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। চিনিকলগুলোতে আখের পরিবর্তে কম সময়ে বেশি লাভজনক ‘সুগার বিট’ ব্যবহারের ফিজিবিলিটি স্টাডিও করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিল্পমন্ত্রী বললেন, ‘নতুন কোম্পানির ব্যবসা শুরু ও মেশিনপত্র আমদানির প্রাথমিক লাইসেন্স পাওয়ার সময়সীমা ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনব। ফায়ার লাইসেন্সসহ অন্যান্য সেবাও যেন অনলাইনে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ভোগান্তিহীনভাবে পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা হবে।’
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক খরচ জিডিপির ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। জানালেন, বন্দরে হ্যান্ডলিং দক্ষতা বাড়িয়ে এই খরচ কমানো হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত অনুযায়ী পণ্যের ‘ট্রেসেবিলিটি’ নিশ্চিত করা হবে, যাতে ঠাকুরগাঁওয়ের ১৫ টাকার কৃষি পণ্য কারওয়ান বাজারে এসে অযৌক্তিকভাবে ১১৫ টাকা না হয়। সাপ্লাই চেইনের এই বাড়তি খরচ রুখে দেওয়া হবে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, ‘এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় জিডিপি ও রপ্তানি সক্ষম দেশ হলেও আমাদের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আয়ের বর্তমান বাস্তবতায় এই উত্তরণ যেন টেকসই ও স্থায়ী হয়, সেজন্য আমরা সময়সীমা আরও তিন বছর পেছানোর অনুরোধ করেছি।’
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। আগামীতে এই খাতে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পাশাপাশি সিলেট, পাবনার ঈশ্বরদী এবং ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন করে বিসিক শিল্প পার্ক সম্প্রসারণ করা হবে এবং একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ল্যাব তৈরি করা হবে ঠাকুরগাঁওয়ে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর নীতি বিষয়ক সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।






