একটি জুতার আত্মকাহিনী

এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি
আমি একটি পুরনো জুতা। এক কলেজ ছাত্রের পায়ে ছিলাম কিছুদিন। কলেজে যাওয়ার সময় একদিন হঠাৎ করে হোঁচট খায় সে। তখন আমার ফিতা ছিঁড়ে যায়। আমাকে ঠিক করার জন্য আমার মালিক ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে নিয়ে আসে।
তখন মোহন লাল দাস (ছদ্মনাম) নামের এক মুচির দোকানে আমাকে দিয়ে, এক জুতা পরেই আমার মালিক কলেজে চলে যায়। সেই যে গেল আর ফেরেনি!
সেই থেকে আজ ১২ বছর ধরে আমি আছি মোহন লালের কাছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে সে আমাকে আগলে রেখেছে। যদি আমার মালিক আসে তাহলে যেন ফিরিয়ে দিতে পারে।
নিজের সততা আর ব্যক্তিত্বে এতটা শক্তিশালী মোহন লাল সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রেমে পড়েছি মোহন লালের। সেটিও অনেক আগে থেকে। নিজের পুরনো মালিকের কথা আর মাথায় আসে না। মোহন লালকেই নিজের মালিক মনে হয়। এত দীর্ঘ সময় ধরে তার সাথে আছি, তার চোখের জল, মুচকি হাসি সবকিছুর সাক্ষী হয়েছি। তার দুঃখ দেখেছি, সুখ দেখেছি। তবে দুঃখের সাগরে সুখ ছিল সামান্য ছিটেফোঁটার মতোই।
আসুন আমার মালিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার একটি গ্রামে মোহন লালের জন্ম। চৌদ্দ পুরুষ ধরে তারা এখানেই বসবাস করছেন। বাবা কৃষিকাজ করতেন। আবার, সওয়ারির (পালকি টানা) কাজও করতেন। এভাবেই অভাবের মধ্যে কষ্ট করে বড় করেছেন সন্তানদের।
মোহন লালও কৃষিকাজ করতেন। তবে সেটি অন্যের জমিতে। নিজের জমি বলতে শুধু বসতভিটে। কৃষি কাজের পাশাপাশি বাবার মতো সওয়ারির কাজও করেছেন মাস ছয়েক। হঠাৎ একদিন কোমরে চোট পেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে যান তিনি। বিছানায় পড়ে থাকেন টানা ৮মাস। পরবর্তী সময়ে কৃষিকাজ করার মতো শরীরে আর সামর্থ্য ছিল না। বাড়তি নড়াচড়া শরীর সহ্য করতে পারতো না।
তাই একরকম বাধ্য হয়েই জুতা সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন মোহন লাল দাস। তারপর থেকে টানা ১৫ বছর ধরে ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে জুতা সেলাইয়ের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বাজারের এক কোণে, রোদ-বৃষ্টি আর ধুলোমাখা ফুটপাতে বসে প্রতিদিন মানুষের ছেঁড়া জুতা সেলাই করেন তিনি। তার হাতে নতুন জীবন পায় পুরোনো জুতা। কিন্তু সেই হাতের মালিকের নিজের জীবন যেন প্রতিনিয়ত জোড়া লাগানোর সংগ্রামে ব্যস্ত।
সেই জোড়া লাগানোর গল্পের সাক্ষী আমি। জুতা সেলাই করতে করতে চোখের পানি হাতের জুতায় পড়তে দেখার সাক্ষী আমি। উন্নতিহীন জীবন টেনে নেওয়ার কষ্টকর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সাক্ষী আমি। কিন্তু আমি তার অভাগা প্রেমিক। দেখে যাওয়া ছাড়া আমার কিছু করার নেই। যাদের করার আছে তাদের নিরবতার গল্প প্রায়ই শুনি মোহন লালের মুখে। মানুষের সাথে বলা তার আক্ষেপ আমাকে খুব পোড়ায়। আমি ব্যথিত হই। নিজের জীবনের ভাঙা স্বপ্নগুলো জোড়া লাগানোর জন্য তাকে প্রতিদিন কত লড়াই করতে হয়, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখি।
মোহন লালের বয়স এখন ৫০ বছর। প্রায় ১৫ বছর ধরে জুতা সেলাইয়ের কাজ করলেও কিন্তু তিনি জন্মসূত্রে মুচি ছিলেন না। কৃষিকাজকেই জীবিকার প্রধান অবলম্বন করেন। কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি সদয় ছিল না। কোমরে চোট পাওয়ার পরই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ভারী কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। কৃষিকাজ আর সম্ভব হয়নি। সংসার তো থেমে থাকে না। তাই বাধ্য হয়েই হাতে তুলে নেন জুতা সেলাইয়ের সরঞ্জাম।
ফুটপাতে বসে জুতা সেলাই করেন তিনি। সমাজের অনেকেই হয়তো এই কাজকে তুচ্ছ চোখে দেখে। কিন্তু তিনি কখনো নিজের কাজকে ছোট ভাবেননি। তার বিশ্বাস, সৎ উপায়ে উপার্জন করা কোনো কাজই ছোট নয়। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকেন বাজারের এক পাশে। কেউ জুতার তলা লাগাতে আসে, কেউ স্যান্ডেলের ফিতা ঠিক করতে, কেউ পুরোনো জুতা মেরামত করতে। মানুষের ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া জুতাগুলো যেমন তিনি নতুন করে বাঁচিয়ে তোলেন, তেমনি নিজের পরিবারকেও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন প্রতিদিন।
মোহন লালের ৪ ভাই। কিন্তু সবারই অভাব। তাই চাইলেও অন্য ভাইকে সেরকম সহযোগিতা করতে পারেন না কেউ। বিপদে পড়লে ভাইয়েরা সাহায্য করতে চান, কিন্তু অধিকাংশ সময় পারেন না। কারণ তাদের নিজেদের অবস্থাও সংকটাপন্ন।
সবাই আলাদা সংসার করেন। তাদের মোট বসতভিটার পরিমাণ মাত্র তিন শতাংশ জমি। সেই সামান্য জায়গার মধ্যেই সবার বসবাস।
মোহন লালের একমাত্র সন্তান পুতুল রানী। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অনেক কষ্ট করে। সেই বিয়ের জন্য নেওয়া ঋণের বোঝা এখনও তার কাঁধে রয়ে গেছে। দৈনিক রোজগার থেকে কিস্তি দিতে হয় এখনও। আমি এখন মোহন লালের চোখ দেখলেই বুঝি কবে তার কিস্তি দিতে হবে। কিস্তির তারিখ এলেই চোখ ক্লান্ত থাকে তার, কপালে ভাঁজ পড়ে।
পুতুল রানীর দুই ছেলে—অর্পন ও অর্নব। একটি মাত্র সন্তান হওয়ায় পুতুলের জন্য মন পোড়ায় মোহন লালের। তাই অভাবের সংসার হলেই মেয়েকে প্রায়ই নিজের কাছে এনে রাখেন। মেয়ের উপস্থিতি তাকে বেঁচে থাকার শক্তি দেয়। নাতিদের হাসিমুখে তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন খুঁজে পান। আমি প্রায়ই শুনি, মোহন লাল মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বিপদ এলেই তিনি এনজিও থেকে ঋণ নেন। কখনো সুদে টাকা ধার করেন। কারণ এ ছাড়া তার কোনো উপায় থাকে না। তারপর পুরো বছরজুড়ে কিস্তি শোধ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠেন।
একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে ঋণের চাপ, সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অবিরাম চক্র। এই চক্র চলছে গত ১২ বছর ধরেই, যা আমি নিজেই স্বাক্ষী হয়ে অবলোকন করছি।
আমি প্রতিদিন তার পাশে থাকি। প্রতিদিন ব্যাগে করে আমাকে নিয়ে বাড়িতে যান আবার বাজারে নিয়ে আসেন। মাঝেমধ্যে আমাকে ব্যাগের বাইরে বের করেন, মাঝেমধ্যে ব্যাগেই রাখেন। মোহন লালের অনেক কথা ব্যাগের ভেতর থেকেই শুনি আবার অনেক কথা ব্যাগের বাইরে থেকেও দেখি।
গ্রীষ্মের তীব্র রোদ যখন মাথার ওপর আগুন ঝরায়, তখনও তিনি কাজ করেন। বর্ষার দিনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফুটপাতে বসে কাজ করার কারণে বৃষ্টি নামলেই দোকান গুটিয়ে ফেলতে হয়। তখন আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে বৃষ্টির দিনে ছেঁড়া ফাটা একটি ছাতা টানান। বেশি বাতাস এলে সেটিও পারেন না। সারাদিনে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা উপার্জন হয়। কিন্তু বৃষ্টির দিনে সেই আয় অনেক সময় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।
একদিন দেখেছিলাম, দুপুরের পর প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। পুরো বিকেল বসে থেকেও একটি জুতা মেরামতের কাজ পাননি তিনি। সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন প্রায় খালি হাতে।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও মোহন লাল সরকারি সুবিধা পান না। সম্প্রতি ঈদ উপলক্ষে বিতরণ করা সরকারি চালের কার্ড পাওয়ার আশায় তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির কাছে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে জানানো হয়, কার্ড শেষ হয়ে গেছে। খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে। প্রায়ই তাকে বলতে শুনি, কোনো সরকারি সুবিধাই সে পায় না।
মোহন খুব চাপা স্বভাবের। কম কথা বলে। অনেক কিছু দেখে কিন্তু চুপ থাকে। তার দোকানের সামনে প্রায় সময়ই প্রচুর যানজট তৈরি হয়। আমি দেখি বিরক্ত হই। এত হর্ন বাজায়, বিরক্ত না হয়ে পারি না। আবার গাড়ি থেকে প্রায়ই অবৈধ টাকা তোলা হয় আমার সামনে। মেয়েদের বিরক্ত করা হয় আমার সামনে। আমি ভাবি এই সমাজের পরিবর্তন কবে হবে!
রাজনৈতিক আলাপ হয় মোহন লালের দোকানে বসে। কাস্টমাররা মোহন লালকে রাজনৈতিক জ্ঞান দেন, সে চুপ করে শুনে। আমিও শুনি। রাজনৈতিক অসামঞ্জস্যতা দেখে অবাক হই। ধনী আর গরিবের ব্যবধান দেখে হতবাক হই। অনেক অবৈধ দোকান বসে এই বাজারে। এসব দোকান থেকে টাকা নেয় প্রভাবশালী মহল। যারা কিছু করার সামর্থ্য রাখে তারা দেখেও দেখে না।
আবার যারা জানলে সমাধান হতো তারা জানে না। সাধারণ মানুষ মুখ খোলে না ভয়ে। কিন্তু তাদের সাহস দেওয়ার লোক থাকলে তারা বলতো, সমাজের পরিবর্তন হতো।
আর ঈশ্বরগঞ্জ বাজারের ময়লার কথা কী বলবো, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে বাজার সবসময় নোংরা করে রাখে। বাজারের পরিবেশের চেয়ে আমার মালিকের দোকান পরিষ্কার। ময়লা ফেলে ঈশ্বরগঞ্জের কাঁচামাটিয়া নদীর পানি দূষণ করা হচ্ছে। সেদিকেও কারো কোনো পদক্ষেপ নেই চোখে পড়ার মতো।
পৌরসভার যে দায়িত্ব সেটি তারা ঠিকমতো পালন করে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বকশিস না দিলে তারা কাজ করতে চায় না। যদিও এই কাজের জন্য তারা বেতন পায়। পৌরসভার পানি সরবরাহে সমস্যা। ঠিকমতো পানি পায় না সেবাগ্রহীতারা। সবদিকে পানির চাপ সমান না। অনেকেই পানি না পেয়েও মাসে মাসে বিল দিতে হয়। তারা আবার মাঝে মাঝে জুতা সেলাই করতে আসে। তাদের মুখে আক্ষেপের গল্প শুনি। অমুক নেতা ভালো না, তমুক নেতা ভালো না, কত গল্প!
আমি চাই ঈশ্বরগঞ্জের পরিবর্তন হোক। সব অনিয়ম দূর হোক। আমার মালিকের মতো গরিবদের ভাগ্য পরিবর্তন হোক। আমি চাই, আমার ছেঁড়া অংশ সেলাই করে দেওয়া মোহন লাল দাসের জীবনের ছেঁড়া অধ্যায়গুলো সেলাই করার মতো কেউ একজন আসুক।




