যদি

চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যানের মাথার চুলগুলো বেশ চমৎকার। ধবধবে সাদা। এত সুন্দর করে আঁচড়ানো, মনে হয় কোনো ভাস্কর্য যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন। আমি চেয়ারে বসে একমনে ওনার চুল দেখছি। তিনি চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে বিরক্ত মুখে বললেন, ‘আপনার নাম আনিসুর রহমান?’
‘জি স্যার।’
‘সিভি দেখে বুঝলাম, আপনি চার বছর ধরে বেকার। তা এই চার বছর প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কী করেন?’
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘স্যার, সত্যি কথাটা কি বলব? নাকি যেটা শুনলে আপনারা খুশি হবেন, সেটা বলব?’
চেয়ারম্যান কপাল কুঁচকে বললেন, ‘সত্যিটাই বলুন।’
‘স্যার, আমি সকালে উঠে ছাদে যাই। কাকদের বিস্কুট খাওয়াই ও তাদের সঙ্গে কথা বলি। তিন নম্বর কাকটার ডান ডানায় একটু ক্ষত আছে। ও খুব ঝগড়াটে। বিস্কুট না পেলে আমাকে গালি দেয়।’
বোর্ডের তিনজনই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মাঝখানে বসা ম্যাডাম নিচু গলায় বললেন, ‘কাক গালি দেয় মানে?’
‘জি ম্যাডাম। কাকরাও গালি দেয়। ওরা কর্কশ গলায় “কা” করে একটা শব্দ করে আর ডান চোখটা ছোট করে ফেলে। ওটা দেখলেই বোঝা যায়, গালি দিচ্ছে।’
চেয়ারম্যান সাহেব ফাইলটা ধপ করে বন্ধ করলেন। মুখ থমথমে, ‘আপনি কি ইয়ার্কি মারছেন আনিস সাহেব?’
আমি বললাম, ‘স্যার, ইয়ার্কি মারব কেন? আপনারা জিজ্ঞেস করলেন কী করি। তাই বললাম। অবশ্য মাঝেমধ্যে নীলক্ষেতে গিয়ে পুরনো বইয়ের গন্ধ শুঁকি। সেখানেও অনেক অদ্ভুত ব্যাপার আছে।’
চেয়ারম্যান সাহেব কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু গলায় বললেন, ‘আপনার কি কোনো মানসিক সমস্যা আছে আনিস সাহেব?’
‘থাকতে পারে স্যার। তবে আমি মানুষের ক্ষতি করি না। আর সত্যি বলতে, ইন্টারভিউ দিতে আসার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। আম্মা জোর করে বাসে তুলে দিয়েছে। বলেছে আজ চাকরি না পেলে আর ভাত দেবে না।’
‘তাহলে এখন কী করবেন? চাকরি তো হচ্ছে না।’
আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম, ‘কোনো সমস্যা নেই স্যার। পকেটে ৪০ টাকা আছে। ফুটপাতের হোটেল থেকে দুটো পরোটা আর ডাল কিনে খেয়ে নেব। পরের চিন্তা পরে। আর স্যার, আপনার চুলগুলো সত্যি খুব সুন্দর।’
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে চেয়ারম্যান সাহেবের গলা পাওয়া গেল, ‘আনিস সাহেব দাঁড়ান।’
চেয়ারম্যান সাহেব চশমাটা টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, ‘আগামী রবিবার থেকে জয়েন করেন। বেতন মোটামুটি। আপনার কাকদের বিস্কুটের পাশাপাশি বিরিয়ানিও খাওয়াতে পারবেন।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘চাকরিটা হয়ে গেল স্যার? আমি তো কোনো প্রশ্নের উত্তরই দিলাম না!’
চেয়ারম্যান সাহেব একটা রহস্যময় হাসি দিলেন, ‘বছরের পর বছর হাজার হাজার রোবটটাইপ মানুষকে মিথ্যা আর মুখস্থ উত্তর দিতে দেখেছি। অন্তত একজন মানুষকে পেলাম, যে কাকাতুয়া না হয়ে কাকের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসে। যান, মাকে গিয়ে বলুন রাতে পোলাও রাঁধতে।’
আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। রাস্তায় চড়া রোদ। মোড়ের নিমগাছটায় তিন নম্বর পরিচিত কাকটা বসে আছে।
আমি পকেটে হাত দিয়ে ৪০ টাকা একটু নেড়েচেড়ে দেখলাম। আজ বিস্কুটের সঙ্গে কাকটাকে একটা আস্ত পরোটাও দেওয়া যেতে পারে!





