বিশ্বকাপের ইতিহাস লেখা হবে যে ঘাসে

সংগৃহীত ছবি
ম্যাচের তখন মাত্র আট মিনিট। পুরো স্টেডিয়াম গর্জে উঠছিল। গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চিৎকার। ঢাকের শব্দ আর পতাকার ঢেউ মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক উন্মাদনা। ঠিক সেই সময় বলটি পেয়ে যান আনহেল দি মারিয়া। কানাডার এক ডিফেন্ডারের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত ছুটতে শুরু করেন তিনি।
সামনে শুধু গোলরক্ষক। কোটি দর্শক যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছিল—এবার হয়তো গোল হবেই। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বল যেন তার নিয়ন্ত্রণে থাকছিল না। দৌড়াতে দৌড়াতে কয়েকবার বল লাফিয়ে উঠল। পেনাল্টি বক্সের সামনে গিয়ে তিনি কোনোমতে দুর্বল এক শট নিলেন। কানাডার গোলরক্ষক সহজেই সেটি আটকে দিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরের মাঠে ঘাসের মান এতটাই খারাপ ছিল যে বল ঠিকভাবে গড়াচ্ছিল না। কেউ বলছিলেন, মাঠটা ‘স্প্রিংবোর্ড’-এর মতো আচরণ করছিল। কেউ আবার সরাসরি একে ‘বিপর্যয়’
মুহূর্তটি দেখে অনেকে অবাক হয়েছিলেন। কারণ দি মারিয়ার মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারের এমন ভুল খুব কমই দেখা যায়। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও কোচরা বললেন, সমস্যাটা খেলোয়াড়ের নয়, সমস্যাটা ছিল মাঠের ঘাসে।
তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরের মাঠে ঘাসের মান এতটাই খারাপ ছিল যে বল ঠিকভাবে গড়াচ্ছিল না। কেউ বলছিলেন, মাঠটা ‘স্প্রিংবোর্ড’-এর মতো আচরণ করছিল। কেউ আবার সরাসরি একে ‘বিপর্যয়’ বলেছিলেন।
সেই বিতর্ক শুধু এক ম্যাচেই থেমে থাকেনি। ২০২৪ কোপা আমেরিকার পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই মাঠের ঘাস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আর ঠিক সেই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলোর একটি হচ্ছে মাঠের ঘাস নিয়ে।
যে ঘাসের দিকে দর্শকেরা সাধারণত তাকানও না, সেই ঘাস নিয়েই গত আট বছর ধরে দিন-রাত কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ তারা জানেন, একটি খারাপ মাঠ বিশ্বকাপের ইতিহাস বদলে দিতে পারে। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি স্টেডিয়ামে হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। আর প্রতিটি ম্যাচের নিচে থাকবে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর গবেষণার ফল।
চাপটা অনেক বেশি।’ বিশেষ করে তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রাখছে ডোম স্টেডিয়ামগুলো। কারণ সেসব স্টেডিয়ামের ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছায় না
এই বিশাল প্রকল্পের নেতৃত্বে আছেন জন সোরোচান। পেশায় তিনি টার্ফগ্রাস বিজ্ঞানী। শুনতে সাধারণ মনে হলেও, বিশ্বকাপের আগে তার দায়িত্ব কোটি ডলারের তারকাদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের দৌড়, পাস, ট্যাকল আর গোল—সবকিছু নির্ভর করবে সেই ঘাসের ওপর।
সোরোচান বলছিলেন, ‘চাপটা অনেক বেশি।’ বিশেষ করে তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রাখছে ডোম স্টেডিয়ামগুলো। কারণ সেসব স্টেডিয়ামের ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছায় না।’
‘সূর্য উঠবে ঠিকই’ তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে নয়। আর গাছের বাঁচতে আলো দরকার।’
শুনতে বিষয়টা যত সহজ লাগে, বাস্তবে তত নয়। গত আট বছরে সোরোচান ও তার সহকর্মীরা ১৭০টিরও বেশি পরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা শুধু ঘাস লাগাননি—ঘাসে সার দিয়েছেন, কেটেছেন, বল ছুড়ে পরীক্ষা করেছেন, বুটের চাপ দিয়েছেন, এমনকি মেপে দেখেছেন ঠিক কত মিলিমিটার লম্বা হলে ঘাস সবচেয়ে ভালো কাজ করে। মাত্র পাঁচ মিলিমিটারের পার্থক্যও মাঠের আচরণ বদলে দিতে পারে।
একটু বেশি লম্বা ঘাস হলে বল ধীরে গড়াবে। খুব ছোট হলে বল বেশি লাফাবে। ফলে দ্রুতগতির ফুটবল খেলা কঠিন হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে তাদের গবেষণাগারে ছোট ছোট পরীক্ষামূলক মাঠ বানানো হয়েছিল। সেখানে লাল রঙের বিশেষ মেশিন দিয়ে ফুটবল ছোড়া হতো। বিজ্ঞানীরা মেপে দেখতেন বল কত দ্রুত যাচ্ছে, কতটা বাউন্স করছে।
আরেকটি যন্ত্র দিয়ে বারবার ফুটবল বুটের আঘাত করা হতো ঘাসে, যেন বোঝা যায় খেলোয়াড়েরা কতটা গ্রিপ পাবেন। কারণ একটি খারাপ মাঠ শুধু ম্যাচ নষ্ট করে না—একজন ফুটবলারের পুরো ক্যারিয়ারও শেষ করে দিতে পারে।
একটি ভুল স্লাইড। একটি পিছলে যাওয়া। একটি হাঁটুর চোট। এর মূল্য হতে পারে কোটি ডলার। কিন্তু শুধু ঘাস সুন্দর হলেই হবে না। এই বিশ্বকাপের আরেক বড় চ্যালেঞ্জ আবহাওয়া।
মিয়ামির গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া একরকম। আবার টরেন্টোর ঠান্ডা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই সব মাঠে একই ধরনের ঘাস ব্যবহার করা হয়নি। উষ্ণ অঞ্চলে ব্যবহার করা হবে বারমুডা ঘাস। ঠান্ডা অঞ্চলে থাকবে কেনটাকি ব্লুগ্রাস ও রাইগ্রাসের মিশ্রণ।
ঘাসকে আরও টেকসই করতে এর মধ্যে প্লাস্টিক তন্তুও যোগ করা হয়েছে, যাতে হাজারো বুটের চাপেও মাঠ ভেঙে না যায়। এই প্রকল্পের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ট্রে রজার্স। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সময় প্রথমবার একটি ডোম স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রাকৃতিক ঘাস বসানোর কাজ করেছিলেন তিনি। মজার বিষয় হলো, তখন তিনি জানতেনই না বিশ্বকাপ কী।
‘আমি নাকি বলেছিলাম, ‘বিশ্বকাপ আবার কী?—হেসে স্মৃতি মনে করেন তিনি। তখন স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রাকৃতিক ঘাস বসানো ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাজ। হাজার হাজার ঘণ্টা শ্রম দিয়ে তারা বিশেষ ষড়ভুজ আকৃতির ঘাসের টুকরো তৈরি করেছিলেন। সোরোচান তখন ছাত্র। তার কাজ ছিল বালু চাপা দেওয়া। সেই ছাত্রই আজ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ঘাস প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দেনবার শহরের বাইরে বিশাল এক খামারে এখন বিশ্বকাপের জন্য ঘাস তৈরি হচ্ছে। যত্ন নিয়ে ঘাসে পানি দেওয়া হচ্ছে। সার দেওয়া হচ্ছে। সামুদ্রিক শৈবাল, সিলিকা, নানা উপাদান মিশিয়ে শক্ত করা হচ্ছে শিকড়।
খামারের মালিক জো উইলকিন্স বলছিলেন, ‘ঘাস কখনো ছুটি নেয় না।’
বিশ্বকাপের কয়েক দিন আগে সূর্য ডোবার সময় বিশাল যন্ত্র দিয়ে সেই ঘাস কেটে রোল বানানো হবে। তারপর রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে করে পাঠানো হবে বিভিন্ন স্টেডিয়ামে। একসঙ্গে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে যাবে লাখ লাখ বর্গফুট ঘাস।
ডোম স্টেডিয়ামগুলোতে পৌঁছানোর পর হয়তো সেটিই হবে ঘাসের শেষ সূর্যের আলো দেখা। তারপর শুরু হবে কৃত্রিম আলোয় বেঁচে থাকার জীবন।
স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে নামানো হবে বিশেষ এলইডি গ্রো লাইট। গোলাপি রঙের সেই আলোয় ঘাস বেড়ে উঠবে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে।
ফিফা এই গবেষণার পেছনে ৫০ লাখ ডলারেরও বেশি খরচ করেছে। দর্শকেরা হয়তো মাঠে শুধু ফুটবলারদেরই দেখবেন। কেউ খেয়াল করবেন না বলটি কত সুন্দরভাবে ঘাসের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে।
কেউ ভাববেন না, সেই ঘাসের প্রতিটি ব্লেডের পেছনে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানীদের বহু বছরের গবেষণা, ব্যর্থতা আর নির্ঘুম রাত। কিন্তু সোরোচান আর রজার্স জানেন—তাদের কাজটাই তৈরি করবে বিশ্বকাপের মঞ্চ। সেই মঞ্চে কেউ ট্রফি জিতবে। কেউ কাঁদবে। কেউ ইতিহাস গড়বে। আর সবকিছুর নিচে নীরবে পড়ে থাকবে সেই সবুজ ঘাস।







