প্রকৃতি প্রত্যয়
নজরুলের ভালোবাসার সাদা সুবাস দোলনচাঁপা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্ষার বিকাল। আকাশে মেঘের আনাগোনা, চারপাশে সোঁদা মাটির গন্ধ। এমন একসময় হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে মিষ্টি এক সুবাস। চোখে পড়ার আগেই নাকে এসে জানান দেয় তার উপস্থিতি। কাছে গেলে দেখা যায়— সবুজ পাতার আড়ালে থোকায় থোকায় ফুটে আছে সাদা ফুল। এ ফুলের নাম দোলনচাঁপা।
দোলনচাঁপা শুধু একটি ফুল নয়, বাঙালির কাব্য ও স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা এক মায়াময় নাম। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ফুলটি ভালোবাসতেন। তার প্রেমের কাব্যগ্রন্থের নামই ‘দোলনচাঁপা’। সেই কাব্যে ফুলটির সৌন্দর্য যেন কবির কল্পনায় নতুন রূপ পেয়েছে— ‘যেন দেবকুমারীর শুভ্র হাসি, ফুল হয়ে দোলে ধরায় আসি।’ আবার তারই পঙ্ক্তিতে শোনা যায়— ‘দখিনার দোল লেগেছে দোলনচাঁপায়।’
নজরুলের সেই পঙ্ক্তির মতোই দোলনচাঁপা যেন হাওয়ার সামান্য দোলায় দুলে ওঠা কোনো শুভ্র হাসি। বর্ষা নামলেই তার সৌন্দর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।
দোলনচাঁপা দেখতে অনেকটা কলাবতী গাছের মতো। পাতাগুলোও অনেকটা আদাগাছের পাতার সঙ্গে মেলে। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Hedychium coronarium। এটি আদা পরিবারের Zingiberaceae একটি উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এর পরিচিতি White Ginger বা Garland Flower নামে।
বর্ষা এলেই দোলনচাঁপার গাছ যেন প্রাণ ফিরে পায়। দ্রুত বাড়তে থাকে সবুজ পাতা। প্রতিটি শাখার মাথায় একসময় বের হয় পুষ্পমঞ্জরি। তারপর একে একে ফুটতে থাকে থোকায় থোকায় ফুল। সাদা ফুলের গড়ন অনেকটা প্রজাপতির মতো। দুটি বড় পাপড়ি ফুলটির সৌন্দর্যে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
দোলনচাঁপার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার সুবাস। সাধারণত বিকাল কিংবা সন্ধ্যার দিকে ফুল ফুটতে শুরু করে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ ভরে ওঠে মিষ্টি, কোমল গন্ধে। বাড়ির উঠোন, বাগান কিংবা পথের ধারে ফুটে থাকা একটি দোলনচাঁপা দূর থেকেও তার উপস্থিতি জানান দেয় সুবাসে। রাতভর সেই গন্ধ বাতাসে মিশে থাকে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই অবশ্য ফুলটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসে।
সাদা রঙের দোলনচাঁপাই বেশি পরিচিত। তবে প্রকৃতিতে হলুদ কিংবা লাল রঙের জাতও দেখা যায়। বর্ষার ভেজা মাটি আর ছায়াঘেরা পরিবেশ এই ফুলের জন্য বেশ উপযোগী। পর্যাপ্ত পানি পেলে গাছ ভালো বাড়ে ও ফুল দেয়। তাই বর্ষার জল যেন তার কাছে শুধু ঋতুর উপহার নয়, বেড়ে ওঠারও অন্যতম অবলম্বন।
শীত এলে দোলনচাঁপা গাছের ওপরের অংশ শুকিয়ে যায়। কিন্তু মাটির নিচে তখনো থেকে যায় তার জীবন। রাইজোম বা ভূগর্ভস্থ কাণ্ড মাটির নিচে রেখে দেওয়া যায়; চাইলে তুলে সংরক্ষণও করা যায়। পরের মৌসুমে সেই রাইজোম থেকেই আবার জন্ম নেয় নতুন গাছ, নতুন পাতা, নতুন ফুল।
দোলনচাঁপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে ব্যবহারিক গুরুত্বও। এর ফুল থেকে সুগন্ধি তৈরি করা হয়। লোকজ ও ভেষজ ব্যবহারে এর রাইজোমকে হজমকারক, টনিক ও উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার করার কথা পাওয়া যায়; জ্বরেও এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। ফুলের সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক কখনো কখনো ফুলের সৌন্দর্যকেও ছাড়িয়ে যায়। দোলনচাঁপার ক্ষেত্রেও যেন তেমনই। নজরুলের কবিতায় জায়গা করে নেওয়ার কারণে ফুলটি বাঙালির কাব্যিক স্মৃতিতে আলাদা হয়ে আছে। তার সাদা পাপড়িতে যেন মিশে আছে প্রেম, বর্ষা, সন্ধ্যা আর অপেক্ষার গল্প।
আর শুধু বাগান কিংবা কবিতাতেই নয়, বাংলাদেশের পথচলার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে দোলনচাঁপার নাম। বাংলাদেশ রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেন ‘দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস’ নিয়মিত পঞ্চগড়-রংপুর-সান্তাহার রুটে চলাচল করে। ফলে একটি ফুলের নাম কখনো কবিতার পাতায়, কখনো বাগানের সুবাসে, আবার কখনো রেলপথের ছুটে চলা ট্রেনে— নানা রূপে বেঁচে আছে।
দোলনচাঁপা তাই শুধু বর্ষার একটি ফুল নয়। সে যেন বর্ষার বিকাল থেকে রাতের দিকে এগিয়ে যাওয়া এক ছোট্ট কবিতা। সন্ধ্যার বাতাসে তার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, সাদা পাপড়ি দুলতে থাকে, আর কোথাও যেন অদৃশ্যভাবে ফিরে আসে নজরুলের সেই চেনা উচ্চারণ— ‘দখিনার দোল লেগেছে দোলনচাঁপায়।’
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক






