বন্ধু থাকবে, প্রভু নয় : বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস

ছবি : এআই
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন সব সময়ই সামনে এসেছে তা হলো, আমরা কি সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন, স্বাবলম্বী ও বহুমাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করতে পারছি? নাকি আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক শক্তির বাস্তবতায় কোনো না কোনো শক্তির বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছি? ইতিহাস ও ভূরাজনীতির আলোকেও এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে এসেছে। এর উত্তর খুঁজতে গেলে যেকোনো সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টাগুলোকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম কয়েক মাসে বাংলাদেশ যে ধরনের কূটনৈতিক সক্রিয়তা দেখিয়েছে, তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কৌশলগত বহুমুখীকরণ। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করা, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করা, পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমিয়ে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্কের পথে হাঁটা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা। সব মিলিয়ে একটি নতুন বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে: বাংলাদেশ কারও শিবিরে যোগ দিতে চায় না, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সবার সঙ্গে কাজ করতে চায়।
এখানেই বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি নিহিত। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের প্রয়োজন মূলত বন্ধু, অংশীদার ও সহযোগী, কিন্তু কোনো প্রভু নয়। পৃথিবীর ইতিহাস ও ভূরাজনীতি বারবার প্রমাণ করেছে, কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত বা অতিনির্ভরতা শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করে ফেলে। তাই বন্ধুত্বের সম্পর্ককে বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে বহুমুখী করা এবং নিজ দেশের বাস্তব স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা আজকের আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতায় কেবল একটি কূটনৈতিক পছন্দ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের অপরিহার্য প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের চীন-নীতি এ কারণেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, সংযোগ, কূটনৈতিক সংলাপ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই দেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সম্ভাব্য ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের কথাও বলেছে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে বাংলাদেশ ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনকে গ্রহণ করছে বা কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক বৈরিতায় লিপ্ত হচ্ছে। বরং একটি পরিণত ও দূরদর্শী কূটনীতির আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় পর্যায়ে বজায় রাখা, কিন্তু একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করে নিজেদের কূটনৈতিক বিকল্প ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ভারত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ কখনো ভারতবিরোধী হওয়া নয়; বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর বহুগুণে বাড়ানো।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগও সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়ায়। সেখানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, কৃষি ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি শ্রমবাজার নয়; এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সেতুবন্ধন। আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে গভীরতর সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে যেতে পারে, যা এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন মাত্রাও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও শিল্পক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ক আজ পশ্চিম ও পূর্ব দুই বিশ্বের সঙ্গেই নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের মধ্যেও এখন সাধারণ বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি ও যৌথ উৎপাদনের বৈচিত্র্যময় সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশও এতে অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’-এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক দর্শন। আজকের জটিল ও বহুমেরু বিশ্বে সেই দর্শনের আধুনিক প্রয়োগ হতে পারে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, সবার সাথে স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা, কিন্তু কারো আছে আত্মসমর্পণ নয়।’
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকারের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ইতিহাস, গণহত্যা ও বাংলাদেশের স্বাধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে যে অনড় ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে, সেগুলো কোনোভাবেই বিস্মৃত হওয়ার নয়। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রশ্ন বিবেচনা করতে হবে। অতীতের ক্ষত অস্বীকার করে নয়, বরং বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বাংলাদেশের সুবিধার্থে ও স্বার্থে যোগাযোগ রক্ষা করাই পরিণত কূটনীতির চিহ্ন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাও দেখায় যে বর্তমান সরকার পূর্বমুখী নীতি গ্রহণ করলেও পশ্চিমবিমুখ হতে চায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য কাঠামোর আলোচনায় বাংলাদেশের বিমান ক্রয়, কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তিখাতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয় উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ভারত থেকে কৌশলগত নির্ভরতা কমাতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন চীনের ওপর বা অন্য কোনো দেশের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বহুমুখীকরণের সাফল্য নির্ভর করে আমরা নতুন কোনো নির্ভরতার ফাঁদে পড়ছি কি না তার ওপর।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই আমাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যতম বড় শক্তি ও সম্ভাবনা। ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র নয়; এটি ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগস্থল। একটি মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করে তার এই ভূগোলকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করা যায়।
আজকের মেরুকৃত বিশ্বে নিরপেক্ষতা মানে নিষ্ক্রিয় থাকা নয়; বরং সক্রিয়ভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো পরাশক্তির সঙ্গে শত্রুতা না করেও স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব। পররাষ্ট্রনীতি কোনো রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের সম্প্রসারণ হতে পারে না, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থই হবে তার প্রধান ভিত্তি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রাখাই আমাদের সফল কূটনীতির প্রমাণ দেবে।
চীন বা ভারত আমাদের প্রয়োজনীয় বন্ধু ও প্রতিবেশী হবে, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে, কিন্তু কেউই আমাদের সিদ্ধান্তের একক নিয়ামক হবে না। বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক বার্তাটি তাই হওয়া উচিত অত্যন্ত পরিষ্কার: আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, আমরা সর্বদা বাংলাদেশের পক্ষে। বাংলাদেশের অনেক বন্ধু থাকবে, কিন্তু কোনো প্রভু থাকবে না। ঢাকা তার নিজস্ব স্বার্থে বিশ্বমঞ্চের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীর সঙ্গে কাজ করে যাবে, কারণ আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের কূটনীতির মূলনীতি একটাই, জাতীয় স্বার্থকে সর্ব উর্ধ্বে রাখা।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



