মানব শিশুর চেয়ে পোষা প্রাণী বেশি জাপানে

টোকিওর ইন্টারপেটস সম্মেলনে দুটি পোষা প্রাণী। ছবিটি ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল তোলা
জাপানে কমছে শিশুর সংখ্যা, বাড়ছে পোষা প্রাণী। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে শিশুপণ্যের অনেক প্রতিষ্ঠান। এখন তারা নতুন পণ্য তৈরি করছে পোষা প্রাণীর জন্য। এতে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে দেশটির পেট কেয়ার শিল্প।
জাপানের গিফু প্রিফেকচারের ইকেদা শহরের একটি পার্কে নিজের টয় পুডল কুকুরটিকে হাঁটাতে নিয়ে গিয়েছিলেন শিন ওহতা। হাঁটার সময় মাঝেমধ্যেই থেমে যেত কুকুরটি। তখন তাকে কোলে তুলে নিতে হতো। প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের কুকুরটিকে বারবার বহন করতে গিয়ে একসময় কষ্টকর হয়ে ওঠে বিষয়টি।
ওহতা বলেছেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, এর নিশ্চয়ই আরও ভালো কোনো সমাধান আছে।’
ওহতা কাজ করেন জাপানের সবচেয়ে পুরনো বেবি ক্যারিয়ার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লাকি ইন্ডাস্ট্রিজে। ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ৪ কোটির বেশি শিশুবহনকারী ক্যারিয়ার তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন শিশুবহনকারী ক্যারিয়ার তৈরির অভিজ্ঞতা থেকে ওহতার মনে প্রশ্ন জাগে, একই প্রযুক্তি কি পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়?
একজন পশুচিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে কুকুরের জন্য নকশাটি উপযোগী কি না নিশ্চিত হন। এরপর ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘নু-ই’ নামে কুকুর বহনের বিশেষ হিপ ক্যারিয়ার বাজারে আনে।
চলতি বছরের শুরুতে টোকিওতে আয়োজিত বার্ষিক ইন্টারপেটস প্রদর্শনীতে অংশ নেয় লাকি ইন্ডাস্ট্রিজ। জাপানের দ্রুত সম্প্রসারিত পোষা প্রাণী পরিচর্যা শিল্পের এই প্রদর্শনীতে অংশ নেয় আরও কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহান্তে টোকিওর বিগ সাইট কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ প্রদর্শনী। এতে পোষা প্রাণীর জন্য ওয়াক-ইন ড্রায়ার থেকে শুরু করে প্রদর্শিত হয় জৈব বিড়ালের খাবার পর্যন্ত নানা ধরনের পণ্য।
প্রদর্শনীতে আসা অনেকেই দড়িতে হাঁটিয়ে আনেননি পোষা প্রাণীকে। বরং শিশুদের স্ট্রলারের মতো বিশেষ পোষা প্রাণীর স্ট্রলার কিংবা বেবি স্লিংয়ের আদলে তৈরি ক্যারিয়ারে করে নিয়ে এসেছেন। অনেক কুকুর ও বিড়ালকে রঙিন পোশাক, লোমের অলংকার এবং ডায়াপার পরিয়ে আনা হয়।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানের পোষা প্রাণী পরিচর্যা বাজারের আকার দাঁড়ায় ৮৮০ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে যার পরিমাণ ছিল ৬৮৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইয়েন।
জাপানে জন্মহার কমতে থাকায় এবং শিশুর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় যেসব প্রতিষ্ঠান একসময় ডায়াপার, বেবি স্লিং ও স্ট্রলার তৈরি করত, তারা এখন ধীরে ধীরে পোষা প্রাণীর বাজারের দিকে ঝুঁকছে।
ইন্টারপেটস প্রদর্শনীতে বড় পরিসরে অংশ নেয় জাপানি প্রতিষ্ঠান ইউনিচার্ম। তাদের স্টলে কুকুর ও বিড়ালের জন্য তৈরি সর্বশেষ ‘ম্যানারওয়্যার’ ডায়াপার প্রদর্শন করা হয়।
নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পণ্য ও শিশুর ডায়াপার তৈরি করে পরিচিতি পাওয়া ইউনিচার্ম ২০০১ সালে উৎপাদন শুরু করে পোষা প্রাণীর ডায়াপার। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির খাত হয়ে উঠেছে পোষা প্রাণীর পণ্য।
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউনিচার্মের পোষা প্রাণী পরিচর্যা বিভাগের মুনাফার হার ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে ব্যক্তিগত পরিচর্যা বিভাগের মুনাফার হার ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র ইশু উয়েহারা জানালেন, ২০২৫ সালে কোম্পানির মোট বিক্রয়ের ১৭ শতাংশ এসেছে পোষা প্রাণী খাত থেকে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
উয়েহারা বলেছেন, ‘জাপানে জন্মহার কমছে। দেরিতে বিয়ে, অবিবাহিত জীবন, সন্তানহীন কর্মজীবী দম্পতির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেকেই এখন পোষা প্রাণীর মধ্যে মানসিক বন্ধন খুঁজে পাচ্ছেন।’
তার ভাষ্য, ‘এ কারণে পেট হিউম্যানাইজেশন বা পোষা প্রাণীকে পরিবারের সদস্য কিংবা সন্তানের মতো দেখার প্রবণতা বেড়েছে। মানুষ এখন তাদের জন্য উন্নতমানের পণ্য কিনতে চায়, দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে চায় এবং তাদের সঙ্গে ক্যাফেতে যাওয়া বা বাইরে সময় কাটানোর মতো অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিতে চায়।’
শুধু ইউনিচার্ম নয়, জাপানের স্ট্রলার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারবাগি এবং মাতৃত্বকালীন পোশাক নির্মাতা সুইট মমিও এখন নতুন পণ্য আনছে পোষা প্রাণীর বাজারে।
লাকি ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিরোয়ুকি হিগুচি বলেছেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি যখন যাত্রা শুরু করে, তখন জাপানি পরিবারে অনেক সন্তান থাকত। তাই মায়েদের কাজের সুবিধার জন্য বেবি ক্যারিয়ারের প্রয়োজন ছিল।’
কিন্তু এখন ছোট হয়ে এসেছে জাপানের পরিবার। একক পরিবার, সন্তানহীন কর্মজীবী দম্পতি এবং সংখ্যা বেড়েছে এক সন্তানের পরিবারের।
জাপানের জাতীয় জন্মপ্রবণতা জরিপ অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এক সন্তানের পরিবারের হার ১০ শতাংশ থেকে প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।
শিন ওহতা বলেছেন, ‘শিশুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় কমে গেছে নতুন বেবি পণ্য উদ্ভাবনের সুযোগও। এখন আমার জীবন যেমন আমার কুকুরকে ঘিরে, তেমনি আমার অনেক বন্ধুর জীবনও তাদের পোষা প্রাণীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।’
হিরোয়ুকির ভাষ্য, ‘শিশুপণ্যের বাজারের তুলনায় পোষা প্রাণীর বাজার এখন ভালো করছে। কোম্পানিগুলো এটিকে স্থিতিশীল ও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখছে। কুকুরকে পরিবারের শিশুর মতোই মনে করেন জাপানে অনেকেই। তাই যেমন শিশুকে ক্যারিয়ারে বহন করা হয়, তেমনি স্বাভাবিক হয়ে উঠছে কুকুরকেও বহন করা।’
জার্মান ইনস্টিটিউট অব জাপান স্টাডিজের পরিচালক ও সমাজবিজ্ঞানী বারবারা হোলথুস বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয়ে অনেকটা বেড়েছে পোষা প্রাণীকে পরিবারের সদস্যের মতো দেখার প্রবণতা।
তার ভাষ্য, ‘আগে কুকুর বা বিড়াল শুধু পরিবারের একটি সদস্য ছিল। কিন্তু এখন পরিবার ছোট হয়ে যাওয়ায় এবং ঘরে কমে গেছে শিশু। তাই পুরো মনোযোগ অনেক সময় একটি প্রাণীর ওপরই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।’
তবে তিনি মনে করেন, ‘এটি শুধু সন্তানের বিকল্প নয়। অনেক সময় পোষা প্রাণী জীবনসঙ্গীর অভাবও পূরণ করে। কেউ বিবাহবিচ্ছেদের পর, কেউ জীবনসঙ্গী হারানোর পর পোষা প্রাণী গ্রহণ করেন। আবার একমাত্র সন্তানের খেলার সঙ্গী হিসেবেও অনেক পরিবার পোষা প্রাণী পালন করে।’
বারবারা হোলথুসের মতে, জন্মহার কমে যাওয়া, একাকিত্ব বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের মতো সামাজিক পরিবর্তনের কারণে জাপানে ‘বহু-প্রজাতির পরিবার’ বা মানুষ ও পোষা প্রাণীকে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের পারিবারিক কাঠামো।
শিশুপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কেন পোষা প্রাণীর বাজারে ঝুঁকছে, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘এটি খুবই স্বাভাবিক। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করতে চায়। আর জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে তাদের আগের বাজার দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।’
সূত্র: আলজাজিরা






