সাম্য, ইনসাফ ও মানবিকতা : সীরাতুন্নবী (সা.)-এর অনুপম আদর্শ

প্রতীকী ছবি
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বর যুগে এক পরম আলোকরশ্মি ও মুক্তির দূত হিসেবে প্রেরিত হন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ যখন গোত্রবাদ, দাসপ্রথা, চরম অমানবিকতা এবং সামাজিক বৈষম্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল, তখন তিনি এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধন করেন। তাঁর এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার ছিল আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন এবং তাঁর অনুপম চরিত্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন : ‘আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত (দয়া) স্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭) রসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সাম্য, ইনসাফ এবং সর্বোচ্চ মানবিকতার মূর্ত প্রতীক। তিনি কেবল একটি ধর্ম প্রচার করেননি, বরং মানবজাতিকে উপহার দিয়েছেন একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং কল্যাণকামী সমাজব্যবস্থা।
তৎকালীন আরবে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হতো তার বংশ, গাত্রবর্ণ, অর্থসম্পদ এবং ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। কুরাইশরা নিজেদের অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত। রসুলুল্লাহ (সা.) এই কৃত্রিম ও শোষণমূলক সামাজিক প্রাচীর ভেঙে চুরমার করে দেন এবং মানবীয় সমতার এক বৈপ্লবিক ধারণা প্রবর্তন করেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ এক আদি পিতা ও মাতা থেকে সৃষ্টি। তাই জন্মগতভাবে কেউ কারো চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.) মানবজাতির সমতার মহাসনদ ঘোষণা করে বলেন:‘হে লোকসকল! নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রেখো, কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩৪৮৯)
জাহেলি যুগে পশুর মতো ক্রীতদাসদের কেনা-বেচা করা হতো এবং তাদের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। রসুলুল্লাহ (সা.) দাসদের সামাজিক ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করেন। তিনি নির্দেশ দেন- ‘ তোমাদের অধীনরা (দাস-দাসী) তোমাদেরই ভাই; কেউ যদি তার ভাইকে অধীন হিসেবে পায়, তবে সে নিজে যা আহার করে তাকে যেন তা-ই আহার করায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩০)
এরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়, যখন তিনি আফ্রিকার এক কৃষ্ণাঙ্গ মুক্ত দাস হজরত বেলাল (রা.)-কে ইসলামের প্রথম ‘মুয়াজ্জিন’ হিসেবে নিযুক্ত করেন। বংশীয় আভিজাত্যে মত্ত কুরাইশ নেতাদের সামনে একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাসের এই রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদা লাভ ছিলো সমতা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আরব সমাজে নারীদের কোনো অধিকার ছিল না, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। রসুলুল্লাহ (সা.) এই বর্বর প্রথা বন্ধ করে ঘোষণা করেন- ‘নারীরা হলো পুরুষের অর্ধাংশ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৩৬) তিনি মাতৃত্বকে সর্বোচ্চ সম্মানিত করেছেন এবং বিবাহ, শিক্ষা ও সম্পত্তিতে নারীর আইনি অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দেন।
একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় সমাজ টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি হলো ইনসাফ। রসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ইনসাফের এক মূর্ত প্রতীক। বিচারক হিসেবে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং আপসহীন। শত্রু কিংবা মিত্র, ধনী কিংবা দরিদ্র— সবার জন্য তাঁর বিচারের মানদণ্ড ছিল সমান। তৎকালীন সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অপরাধ করলে পার পেয়ে যেত, আর দুর্বলদের ওপর আইন চাপিয়ে দেওয়া হতো। একবার মক্কার কুরাইশ বংশের ‘মাখজুম’ গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে ধরা পড়লে উসামা বিন যায়েদ (রা.) কে দিয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়। এতে রসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন-‘আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৪৭৫)
মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে মহানবী (সা.) মুসলিম এবং অমুসলিম নাগরিকের মধ্যে বিচারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করেননি। একবার এক ইহুদি ও মুসলমানের বিরোধে তিনি উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে মুসলমানের বিপক্ষে এবং ইহুদির পক্ষে রায় প্রদান করেন। অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায় তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন-‘যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করবে, কেয়ামতের দিন আমি স্বয়ং সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা লড়ব।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৩০৫২) তিনি শাসক হিসেবে নিজের ওপরও ইনসাফের আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতেন। ইন্তেকালের মাত্র কয়েকদিন আগে অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে নববীতে এসে তিনি ঘোষণা করেন- ‘আমি যদি কারো পিঠে আঘাত করে থাকি, তবে আমার পিঠ হাজির, সে যেন এসে তার বদলা নেয়।’ (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্তরে মানবজাতির জন্য যে ভালোবাসা ও দরদ ছিল, তা কেবল তাঁর অনুসারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর ঘোরতর শত্রু এবং অন্য সব সৃষ্টির ওপর। মক্কার কাফেররা দীর্ঘ তেরো বছর ধরে তাঁর ও সাহাবিদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তাঁকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং তাঁর প্রিয় চাচা হজরত হামজা (রা.)- কে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। কিন্তু অষ্টম হিজরিতে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করে তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি। ক্ষমতার চরম শিখরে থেকেও তিনি হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক বাণী উচ্চারণ করেন : ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত ও স্বাধীন।’ (সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী)
যুদ্ধবিগ্রহের যুগে তিনি সেনাপতিদের নির্দেশ দিতেন : ‘খবরদার! কোনো বৃদ্ধ, কোনো শিশু এবং কোনো নারীকে হত্যা করবে না। কোনো উপাসনালয়ে অবস্থানরত ধর্মযাজকদের আঘাত করবে না এবং কোনো ফলবান বৃক্ষ কাটবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ) রাসূল (সা.)-এর মানবিকতা কেবল মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, পশুপাখির প্রতিও ছিল সমানভাবে বিস্তৃত। এক সফরে পাখির বাসা থেকে ছানা ধরে আনায় মা পাখিটি ছটফট করতে থাকলে তিনি ব্যথিত হয়ে বলেন : ‘ কে এই পাখিকে তার ছানার জন্য কষ্ট দিয়েছে? তার ছানা তাকে ফিরিয়ে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৬৭৫)
হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাম্য, ইনসাফ ও মানবিকতা— এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই ইসলামের গৌরবময় ইমারত ও মদিনার আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন। আজকের আধুনিক বিশ্ব যখন মানবাধিকারের কথা বলে, তখন তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ চৌদ্দশত বছর আগে রসুলুল্লাহ (সা.) তা বাস্তব রূপায়ণ করে গেছেন। বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলমান বর্ণবাদ, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং মানবিক বিপর্যয় থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো মহানবী (সা.)-এর এই কালজয়ী আদর্শকে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পুনরুজ্জীবিত করা। তাঁর দেখানো পথেই কেবল একটি শান্তিময়, বৈষম্যহীন এবং মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়








