মনে পড়ে, কীভাবে শিখেছিলেন সাইকেল চালানো?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আজ বিশ্ব সাইকেল দিবস। জাতিসংঘ সাইকেলকে দেখেছে সহজ, সাশ্রয়ী, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব টেকসই পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে। ৩ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত এই দিবসের মূল বার্তাও তাই। সাইকেল শুধু চলাচলের বাহন নয়, এটি স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গেও যুক্ত এক শক্তিশালী প্রতীক।
কিন্তু এই সাইকেল প্রথম কীভাবে চালানো শিখেছিলেন? সেই স্মৃতি কারও কাছে স্বাধীনতার, কারও কাছে শৈশবের দুরন্ত বিকেলের, আবার কারও কাছে ভয়ের সঙ্গে মেশানো আনন্দের। আগামীর সময়ের কয়েকজন সাংবাদিক জানাচ্ছেন তাঁদের প্রথম সাইকেল চালানোর স্মৃতি।
আগামীর সময়ের উপসম্পাদক আশরাফুল হক রাজিব স্মৃতিচারণ করে বললেন, ‘আমি সাইকেল চালানো শিখেছিলাম ঘণ্টায় এক টাকা ভাড়া নিয়ে। বন্ধুরা পাল্লা দিয়ে চালাত, আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আমার এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বোনের মনে খুব দাগ কেটেছিল। এক বিকেলে তিনি আমাকে একটি সাইকেল কিনে দেন।'
অনলাইন সম্পাদক আনিসুর রহমান বুলবুলের ভাষ্য, ‘আব্বা সাইকেল চালাতেন, আমি পেছনে বসে থাকতাম। হারানের ভিটা পার হয়ে পূবের বিল পর্যন্ত রাস্তাটা ছিল বেশ প্রশস্ত। আব্বা সেখানে একটু দ্রুত চালাতেন। বাতাস এসে মুখে লাগত, মনে হতো পৃথিবী যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা এগিয়ে চলেছি। এরপর সরিষা ক্ষেতের আইল ধরে যেতে হতো সাবধানে। দুপাশে হলুদ সরিষা ফুল, ভোরের কুয়াশা, ভেজা মাটি আর নিস্তব্ধ গ্রাম। আমি সরিষা ফুল ছিঁড়তাম। হাতে কুয়াশা লেগে থাকত। সেই কুয়াশা শুকিয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু তার স্পর্শ আজও স্মৃতিতে ভেজা।’
সাইকেল চালানো নিয়ে স্মৃতি নেই, এমন মানুষ কমই আছে। অনলাইনের সহকারী বার্তা সম্পাদক মেহরিন জাহান জানালেন, ‘সাইকেলটি ছিল মূলত আমার ছোট বোনের। এ নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে বোনকে চালাতে দেখে একটু একটু করে ইচ্ছা হলো। আমরা তখন কুমিল্লায় নানাবাড়িতে ছিলাম। নানাবাড়ির এক ভাড়াটিয়া আঙ্কেল আমার বোনকে সাইকেল চালানো শেখাচ্ছিলেন। আমিও তাঁর কাছেই হাতেখড়ি নিই। প্রথম দিনেই অনেকটা আয়ত্তে চলে আসে দুই চাকা। পরদিন বাড়ির আঙিনার এ মাথা থেকে ও মাথা সাইকেল চালিয়ে নিজেকে পাখি মনে হচ্ছিল। বাতাসে উড়ছিল খোলা চুল। পাশে গা ঘেঁষে বসা কেউ নেই। আমিই চালক, আমিই যাত্রী, সবই যেন আমার। এ গল্প আমার টিনএজ কালের। এরপর আর সেভাবে চালানো হয়নি। জীবনে আর সেভাবে পাখির অনুভূতিও আসেনি। ইচ্ছা আছে, এবার ছেলেকে একটি সাইকেল কিনে দেব। সেই ছুতোয় নিজের দুচাকার স্কিলও ঝালাই করে নেব।’
মুফতি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ‘বয়স তখন ১২। পড়াশোনার জন্য থাকতে হতো দেশের এক প্রান্তের দ্বীপজেলা ভোলায়। ছুটিতে চাইলেও সহজে বাড়ি ফেরা হতো না। এক পরীক্ষার ছুটিতে মনটা খুব খারাপ ছিল। সেদিন এলাকার সিনিয়র ভাই শিহাব সাইকেল নিয়ে এসে বললেন, “চলো, তোমাকে সাইকেল চালানো শেখাই।” মাদরাসার মাঠে শুরু হলো কসরত। বারবার পড়ে যাওয়া, হোঁচট খাওয়া, একসময় পা কেটে রক্তও বের হলো। তবু মনে একটাই জেদ, শিখতেই হবে। দিন শেষে সত্যিই আয়ত্তে এসে গেল দুই চাকার সেই বাহন। আজও সেই বিকেলের কথা মনে হলে মনটা উদাস হয়ে যায়।’
সহকারী বার্তা সম্পাদক রাকিব হাসানের সাইকেল শেখার স্মৃতিও বেশ মজার। তিনি জানালেন, ‘শিশুকালে সাইকেল ছিল আমার স্বপ্নের বাহন। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। বাবা বলেছিলেন, সাইকেল কিনে দেবেন। খুশিতে যেন নেচে উঠেছিলাম। তবে সেই খুশি বিষাদে রূপ নেয়, যখন শুনলাম সুন্নতে খৎনার পর সাইকেল কিনে দেওয়া হবে! শেষ পর্যন্ত সাইকেলের লোভেই রাজি হয়েছিলাম। যেদিন সুন্নতে খৎনা হলো, সেদিন বিকেলেই নীল রঙের নতুন সাইকেল এল বাড়িতে। পলিথিনে মোড়ানো সাইকেলটি মাটিতে নামিয়েছিলাম এক মাস পর। এরপর সড়কে নিয়ে চালাতে গিয়েই পরপর তিনবার পড়ে যাই। আবার উঠে দাঁড়াতেই দাদা এসে সাইকেলের পেছন ধরে রাখলেন। অবশেষে সফল হলাম, প্রথমবারের মতো সাইকেল চালালাম। ২৪ বছর আগের সেই সাইকেল আজও গ্রামের বাড়িতে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সাইকেলটি অকেজো হয়ে গেছে, তবে শত শত স্মৃতি রয়ে গেছে।’
সহসম্পাদক আজিজুর রহমানের স্মৃতিতে সাইকেল শেখার গল্পটি শুরু হয়েছিল এক গ্রীষ্মের দুপুরে। তাঁর ভাষ্য, ‘বয়স তখন নয় কিংবা দশ। গ্রীষ্মের এক দুপুরে বাড়িতে বেড়াতে এলেন দূরসম্পর্কের এক চাচা। সঙ্গে আনলেন কুকিজ বিস্কুট ও আমিত্তি। কিন্তু আমার নজর পড়ল চাচার ফনিক্স সাইকেলের ওপর। আমার বোন যখন বিস্কুট খাচ্ছে, আমি তখন দুপুরের রোদে উঁচু সাইকেলের ভেতর দিয়ে পা গলিয়ে চালানোর চেষ্টা করছি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, ঘেমে নেয়ে একাকার হলেও ক্লান্ত হইনি একটুও। বিকেল নাগাদ চাচা চলে যাওয়ার সময় হলো, আর সাইকেলটির জন্য আমার মন ভেঙে যাচ্ছিল। এর কিছুদিন পর স্কুল ফাঁকি দিয়ে চলে গেলাম মেজো ফুপির বাড়িতে। তিন দিন থেকে ফুফাতো ভাইয়ের সাইকেল দিয়ে পুরোপুরি চালানো শিখেছিলাম। সেই তিন দিনে কতবার যে সাইকেল নিয়ে পড়েছি, তা মনে না থাকলেও সংখ্যাটা যে বড় ছিল, সেটি স্মৃতিতে স্পষ্ট। সেবার স্কুল ফাঁকি দেওয়ার জন্য অবশ্য স্যারের বেতের বাড়ি পড়েছিল পিঠে, তবে সেটি ছিল সার্থক।’
সহসম্পাদক আইরিন মিমের স্মৃতিতে সাইকেল যেমন আনন্দের, তেমনি ভয়েরও। তিনি বললেন, ‘সাইকেল চালানো নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত, তবে বেশ ইন্টারেস্টিং। এক শীতে নানুবাড়িতে গিয়ে মামাদের সাইকেল চালাতে দেখে খুব ইচ্ছা হলো, আমিও চালাব। যেই কথা, সেই কাজ। এক দিনের মধ্যেই ছোট মামার কাছ থেকে সাইকেল চালানো শিখে ফেললাম। এরপর সারাদিন সাইকেল নিয়েই পড়ে থাকতাম। তৃতীয় দিন খুব ফুরফুরে মনেই সাইকেল চালাচ্ছিলাম। কিন্তু উঁচু-নিচু রাস্তায় চালাতে গিয়ে চাকা ছোট একটি গর্তে পড়ে যায়। আমিও উল্টে পড়ে হাতের কনুই, হাঁটু ও কপালে বেশ চোট পাই। এরপর ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সেদিনই আমার শেষবারের মতো সাইকেল চালানো। ভয়ে আর সাইকেল চালানোর সাহস না হলেও সাইকেল এখনো আমার প্রিয় বাহন।’
সিনিয়র সহসম্পাদক হাসান আদিল জানান, ‘সাইকেল চালানো শিখেছি দোকান থেকে ভাড়া নিয়ে। সম্ভবত ঘণ্টায় দুই বা তিন টাকা ছিল ভাড়া। আধা ঘণ্টার চেষ্টাতেই চালানো শিখে যাই। সেই সাইকেলে ভর করে কত বিল, মাঠ, রাস্তা আর পাহাড় মাড়িয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। পুরো মৌলভীবাজার জেলা ঘুরেছি সাইকেল চালিয়ে।’
প্রতিবেদক এমিল হোসাইন শাহীন জানাচ্ছেন, ‘বাবা কাজ থেকে ফিরে সাইকেলটি বাইরে রেখে দিতেন। আমি চুপি চুপি সাইকেল নিয়ে মাঠে চলে যেতাম। সেখানেই নিজে নিজে শিখেছি সাইকেল চালানো।’
তৈবুর তানভীরের সাইকেল শেখার গল্প একটু ভিন্ন। তাঁর ভাষ্য, ‘কোনো আত্মীয় সাইকেল নিয়ে এলেই সেটি নিয়ে চলে যেতাম বাড়ির উঠানে। সাইকেলগুলো বড় হওয়ায় নিচু হয়ে কোনোভাবে হ্যান্ডেল ধরে চালানোর চেষ্টা করতাম। স্কুল দূরে হওয়ায় একদিন আম্মু আমাকে একটি সাইকেল কিনে দেন। কিন্তু সাইকেলে উঠতে ও নামতে পারতাম না। কেউ তুলে দিলে শুধু চালাতে পারতাম। তখন উঁচু কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে সাইকেলে উঠতাম, আবার স্কুলে গিয়ে উঁচু জায়গায় পা নামিয়ে নামতাম। এভাবেই ধীরে ধীরে পুরোপুরি সাইকেল চালানো শিখে ফেলি।’
মাহমুদুল হাসান রিফাত বলেছেন, ‘জীবনে প্রথম সাইকেল চালানো শিখি অষ্টম শ্রেণিতে থাকার সময়, ২০০৯ সালে। আমার চেয়ে বয়সে তিন বছরের ছোট আপন ভাই এর বছর দুয়েক আগেই একটি সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেলের মালিক হয়েছিল। বাসায় সাইকেল থাকার পরও কেন জানি শিখতে ইচ্ছা করত না, হয়তো ভয়ে শিখিনি। হুট করে ক্লাসের এক মেয়ে বন্ধুকে ভালো লাগতে শুরু করে। বন্ধুদের অনেকেই ক্লাস শেষে সাইকেল চালিয়ে তার পিছু নিত। ওই সময়ে হবিগঞ্জ শহরে ইভটিজিং বা কাউকে বিব্রত করার পরিবেশ ছিল না। শুধু নির্দিষ্ট এলাকায় সাইকেলে রাউন্ড দেওয়া। এমন বাস্তবতায় ছোট ভাই আমাকে সাইকেল চালানো শেখায়। প্রথমে আমার আগ্রহের কথা শুনে সে চমকে উঠলেও পরে তার কাছেই ধরা পড়ে যাই। ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় ওই বন্ধুর সঙ্গে প্রেম আর এগোয়নি, তবে বিশেষ এক দক্ষতা শেখা হয়ে গেছে।’
কনটেন্ট এক্সিকিউটিভ সোহানুর রহমানের মনে পড়ে ছোট মামার কাছে শেখার কথা। তিনি বলেন, ‘সাইকেল চালানো শিখেছিলাম ছোট মামার কাছে। যখন একটু একটু করে ব্যালান্স রাখতে শিখলাম, তখন আমাকে একা সাইকেল চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমি বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে ডান দিকে একটি মোড় এল। কিন্তু মোড়ের কাছে গিয়ে এমন নার্ভাস হয়ে গেলাম যে ভুলেই গেলাম, ডানে যেতে হলে হ্যান্ডেলও ডানে ঘোরাতে হয়।’
সবার স্মৃতিতেই সাইকেল। এটি কারও কাছে শৈশবের রোদেলা দুপুর, কারও কাছে কুয়াশাভেজা গ্রাম, কারও কাছে প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ, আবার কারও কাছে পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্প। দুই চাকার এই ছোট্ট বাহন মানুষকে শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয় না, ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু পুরোনো দিনে, যেখানে ছিল ভয়, আনন্দ, কৌতূহল, সাহস আর শেখার অদম্য ইচ্ছা।




