হাফ প্যাডেল থেকে ফুল প্যাডেল, তারপর সোজা পুকুরে

ছবি: আগামীর সময়
আমরা যারা নব্বইয়ের দশক কিংবা শূন্য দশকের গোড়ার দিকে মফস্বল শহরে বেড়ে উঠেছি, তাদের শৈশবের অনেক স্মৃতিই একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায়। তার মধ্যে অন্যতম হলো সাইকেল চালানো শেখার গল্প।
তখন সাইকেল চালানো শিখতাম বাবা কিংবা বড় ভাইদের সাইকেলে। সেগুলো ছিল আমাদের উচ্চতার তুলনায় অনেক বড়। তাই শুরুটা হতো ‘হাফ প্যাডেল’ দিয়ে। অর্থাৎ সিটে না উঠে সাইকেলের বাঁ প্যাডেলে পা রেখে, ডান হাত দিয়ে সিট আঁকড়ে ধরে, হ্যান্ডেলের নিচ দিয়ে ডান পা নিয়ে ডান প্যাডেলে ভর দিতে হতো। আমিও এভাবেই সাইকেল চালানো শিখেছিলাম।
শুধু শেখাই নয়, শেখার পরও অনেক দিন এভাবেই সাইকেল চালিয়েছি। কারণ সিটে উঠলে প্যাডেলে ঠিকমতো পা পৌঁছাত না। হাফ প্যাডেলেই বাজারে যেতাম, বাজার করে আনতাম, দোকানে যেতাম, ঘুরতে বের হতাম। বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে সাইকেল রেসও দিতাম।
একদিন দোকান থেকে সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। আমাদের দোকান থেকে বাসার দূরত্ব আধা কিলোমিটারেরও কম। মহল্লার সরু গলি পেরিয়ে আসা-যাওয়ার পথ। সেদিন একটু জোরেই সাইকেল চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আজ ফুল প্যাডেলে চালানোর চেষ্টা করা যাক।
যেই ভাবনা, সেই কাজ।
হ্যান্ডেলের নিচ থেকে ডান পা বের করে রডের ওপর দিয়ে ডান প্যাডেলে দেওয়ার চেষ্টা করতেই কোনোমতে সিটে উঠে পড়লাম। সম্ভবত সাইকেলটা ছিল হিরো। তখন হিরো আর ফিনিক্স সাইকেলই বেশি দেখা যেত।
সিটে উঠতে পেরেছি ঠিকই, কিন্তু তারপরই বিপদ।
সাইকেল আর থামাতে পারি না।
একবার বাঁ প্যাডেলে চাপ দিচ্ছি, ডান প্যাডেল অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। আবার ডান প্যাডেল কাছে আসতে না আসতেই বাঁ প্যাডেল দূরে সরে যাচ্ছে। এভাবে প্যাডেল মারছি আর সাইকেল ছুটছে। থামানোর উপায় নেই। থামাতে গেলেই নিশ্চিত আছাড় খাব।
একেবারে ব্রেকফেল গাড়ির মতো অবস্থা।
তখন আমাদের পাড়ার রাস্তার পাশেই ছিল বড় বড় দীঘি আর পুকুর। সাইকেল চালাতে চালাতে একসময় পৌঁছে গেলাম আবরণী খালেক চাচার বিশাল পুকুরের কাছে। তাকে সবাই ‘আবরণী খালেক’ বলেই চিনত। কারণ তার কাপড়ের দোকানের নাম ছিল ‘আবরণী ক্লথ স্টোর’।
উপায়ান্তর না দেখে সাইকেলসহ পুকুরের ঢালে নামিয়ে দিলাম নিজেকে।
এভাবেই সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম।
তবে বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। এবার শুরু হলো পুকুর থেকে সাইকেল তোলার যুদ্ধ। অবশ্য সেটাও খুব বেশি কঠিন হয়নি। তখন পাড়া-মহল্লার পুকুরগুলো সারাক্ষণই ছেলে-মেয়েদের কোলাহলে মুখর থাকত। একদল গোসল শেষ করে উঠত, আরেকদল নেমে পড়ত। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত সাঁতার আর জলকেলি।
সেখানেই থাকা কয়েকজন ছেলে এগিয়ে এসে আমার সাইকেলটা পুকুর থেকে তুলে দিয়েছিল।




