কিন্তু

বৃষ্টি আমার ভালো লাগে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বৃষ্টি আমাকে ভালোবাসে না। যখন বাসায় থাকি, তখন সে আসে না। অফিসের জন্য বের হলেই ঢাকঢোল পিটিয়ে হাজির হয়। ছাতা নিয়ে বের হইনি। কারণ আত্মবিশ্বাস ছিল বৃষ্টি আসবে না। আকাশ পরিষ্কার। এমন আলোকিত দিনে ছাতা বড্ড বেমানান। কিন্তু বাসা থেকে বের হয়েই দেখলাম আমি ভুল। আকাশটা ঠিক। বলতে না বলতেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টির সঙ্গে ছাতার এই রসায়নটা বুঝি না। যেদিন ছাতা নিয়ে বের হই, সেদিন রোদ হাসে। আর যেদিন ছাতা রেখে আসি, বৃষ্টি সেদিন তার ভয়ংকর রূপ দেখায়। ঢাকার বৃষ্টির বিশেষ একটা গুণও আছে। অন্য কোথাও বৃষ্টি হলে মানুষ ভেজে। কিন্তু ঢাকায় বৃষ্টি হলে রাস্তা েভজে না, হারিয়ে যায়। পানি এমনভাবে সবকিছু ঢেকে দেয়— কোনটা রাস্তা আর কোনটা ড্রেন বোঝা মুশকিল।
আমি অবশ্য এখন অভিজ্ঞ। পানি দেখে আর হাঁটি না। আগে একজনকে হাঁটতে দিই। তিনি যদি হঠাৎ গায়েব হয়ে যান, বুঝে নিই ওটা রাস্তা না। নতুন কোনো জলাশয়। আর কারও পা যদি কোনো গর্তে ঢুকে যায়, নিশ্চিত বলতে পারি, ওটা ছিল ড্রেন।
জলাবদ্ধতার কিছু সুবিধাও আছে। রিকশাওয়ালারা ভাড়া বাড়াতে পারেন ইচ্ছামতো। পানিতে জুতা হারিয়ে গেলে পাদুকাশিল্পের ব্যবসাও ভালো যায়। তবে সবচেয়ে উপকার হয় রোজ অফিসে দেরি করা ব্যক্তির। শক্ত একটা অজুহাত পাওয়া যায়। দেরি করে গেলেও এদিন সমস্যা হয় না। কাজ শুধু একটাই— অফিসে ঢুকেই বিরাট একটা চিৎকার দিতে হয়। তারপর উচ্চৈঃস্বরে বসকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে হয়— ‘দেশটা রসাতলে গেল। পুরোপুরি ডুবে গেল। এই দেশে আর বসবাস করা সম্ভব নয়। ভাবা যায়, প্যান্ট-শার্ট পরে সাঁতরে অফিসে আসতে হয়। কোথায় আছি আমরা!’
অফিসে এলেও কাজ শুরু হয় ধীরে-সুস্থে। দল পাকিয়ে জলাবদ্ধ রাস্তার বর্ণনা চলে কিছুক্ষণ। কে কোন দিক দিয়ে ডুবে গেল, কোন রিকশা উল্টে গেল, কে স্লিপ খেয়ে চামড়া ওঠাল— নানা রকম গল্প চলে রসিয়ে রসিয়ে।
আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে রাস্তার মানুষগুলো দেখে। কেউ জুতা হাতে হাঁটছে, কেউ প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে যাচ্ছে। কেউ মোবাইলে সেলফি তুলছে। কারও মুখে খুব বেশি অভিযোগ নেই। মনে হয়, শহরের মানুষগুলো বুঝে গেছে— বৃষ্টির সঙ্গে তর্কে গিয়ে লাভ নেই। পানি একসময় নেমে যাবে। কিন্তু আবার বৃষ্টি হবে। আর বৃষ্টি হলে একই ঘটনা ঘটবে। আমরা অবাক হব, বিরক্ত হব। আবার মানিয়েও নেব খুব দ্রুত।
ঢাকার মানুষের অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে। এরা সব সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। বর্ষাকালের জলাবদ্ধতার সঙ্গেও ঢাকার মানুষের সম্পর্ক হয়তো খুব বেশি খারাপ না। পানি একসময় নেমে যায়। রাস্তাও আবার দেখা যায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই এ শহর কয়েক ঘণ্টা আগেও বিশাল একটা নদী ছিল।




