সীমান্তের চর থেকে জাতীয় বাজারে : তাঁতশিল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী রৌমারী উপজেলার ৬ নম্বর চর শৌলমারী ইউনিয়নের নাম একসময় উচ্চারিত হতো নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও মৌসুমি অভিবাসনের প্রসঙ্গে। বছরের একটি বড় সময় কৃষিকাজ না থাকায় অনেক পুরুষকে জীবিকার সন্ধানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ইটভাটা, নির্মাণকাজ কিংবা কৃষি অঞ্চলে চলে যেতে হতো। পরিবার চালানোর দায়িত্ব পড়ে থাকত ঘরে থাকা নারী ও বৃদ্ধদের ওপর। অনিয়মিত আয়, সীমিত কর্মসংস্থান এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ছিল এই চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
মাত্র ছয়-সাত বছরের ব্যবধানে পাল্টাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। এখন চর শৌলমারীর একাধিক গ্রামে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শোনা যায় তাঁতের নিরবচ্ছিন্ন শব্দ। ঘরের বারান্দা, টিনের ছোট ঘর কিংবা উঠান- সবখানেই চলছে মনিপুরী নকশার শাড়ি তৈরির কাজ। মনিপুরী শাড়ির ঐতিহ্যগত উৎপাদনকেন্দ্র সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ হলেও, উৎপাদনের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে গত কয়েক বছরে চর শৌলমারীতেও এই শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। পরিবারের প্রবীণ নারীরা সুতা প্রস্তুত করছেন, তরুণীরা তাঁতে শাড়ি বুনছেন, পুরুষরা সুতা রং, নকশা, তাঁত বসানো এবং বাজারজাতকরণের দায়িত্ব পালন করছেন। একটি কুটিরশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রামীণ উৎপাদনব্যবস্থা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু এই ইউনিয়ন থেকেই প্রতি মাসে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকার মনিপুরী শাড়ি বাজারজাত হচ্ছে। ইউনিয়নের অন্তত ৮ থেকে ১০টি গ্রামে বর্তমানে শাড়ি উৎপাদন হচ্ছে এবং প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত। যদিও এসব তথ্য সরকারি যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে, তবু স্থানীয় অর্থনীতিতে এর দৃশ্যমান প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একটি গ্রামের গল্প, জাতীয় অর্থনীতির বার্তা
চর শৌলমারীর এই পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সম্ভাবনার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সর্বশেষ জাতীয় তাঁতশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার তাঁত ইউনিট, ৫ লাখের বেশি তাঁত (লুম) এবং ১ লাখ ১৭ হাজারের বেশি তাঁতি পরিবার রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
একসময় দেশের মোট কাপড় উৎপাদনের বড় অংশই তাঁতশিল্প থেকে এসেছে। বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্প বিস্তারের ফলে সেই অংশ কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তাঁতশিল্প এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টাঙ্গাইল জামদানি, রাজশাহী সিল্ক কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক হ্যান্ডলুমের মতো চর শৌলমারীর মনিপুরী শাড়িও একটি সিলেট অঞ্চলের মনিপুর শাড়ির বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং এসএমই সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আওতাভুক্ত। জাতীয় কর্মসংস্থানেরও একটি বড় অংশ এই খাত সৃষ্টি করে। ফলে চর শৌলমারীর মতো উদ্যোগ শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়নের গল্প নয়; এটি গ্রামীণ শিল্পায়নের জাতীয় কৌশলেরও কার্যকর উদাহরণ। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান চর শৌলমারীর মনিপুরী শাড়ি কোনো একক তাঁতির শ্রমের ফল নয়। একটি শাড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকেন সুতা প্রস্তুতকারী, রং করার শ্রমিক, নকশা প্রস্তুতকারী, তাঁত বসানোর কারিগর, তাঁতি, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার ও ব্যবসায়ী।
গ্রামের অসংখ্য নারী চরকার সাহায্যে সুতা প্রস্তুত করেন। প্রতিদিন একজন নারী গড়ে দুই থেকে তিন কেজি সুতা প্রস্তুত করতে পারেন এবং প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা মজুরি পান। এরপর সেই সুতা রং করা হয়, নকশা অনুযায়ী সাজানো হয় এবং তাঁতে বসানো হয়। সব শেষে দক্ষ তাঁতিরা দেড় থেকে দুই দিনের শ্রমে একটি শাড়ি বুনে শেষ করেন। স্থানীয় তাঁতি মনোয়ারা খাতুনের ভাষ্য, ‘আগে মাটি কাটার কাজ করতাম। এখন তাঁতের আয় দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছি, নতুন ঘর করেছি।’ এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি উৎপাদনভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব রূপান্তর।
নারীর হাতে আয়, পরিবারের উন্নয়ন
চর শৌলমারীর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে। যেসব নারী একসময় শুধু গৃহস্থালির দায়িত্ব পালন করতেন, আজ তারাই এই শিল্পের অন্যতম প্রধান উৎপাদক। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) গবেষণা অনুযায়ী, দেশের হস্তশিল্পভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ৫১ শতাংশের বেশি নারী মালিকানাধীন এবং এই খাতে কর্মরত মানুষের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী। চর শৌলমারীতেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। সুতা প্রস্তুত থেকে শাড়ি বোনা পর্যন্ত উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে।
উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, নারীর হাতে আয় গেলে তার বড় অংশ ব্যয় হয় সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও আবাসনের উন্নয়নে। চর শৌলমারীর বাস্তবতাও সেই তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়। স্থানীয় অনেক নারী জানিয়েছেন, তাঁতের আয় দিয়েই সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, নতুন ঘর নির্মাণ কিংবা পরিবারের সঞ্চয় সম্ভব হয়েছে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদন অর্থনীতিতে উত্তরণ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম এখনো দেশের তুলনামূলক দরিদ্র জেলাগুলোর একটি। নদীভাঙন, চরাঞ্চলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং মৌসুমি কৃষিনির্ভরতা এখানকার শ্রমবাজারকে দীর্ঘদিন অনিশ্চিত রেখেছে। চর শৌলমারীর তাঁতশিল্প সেই বাস্তবতায় একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। আগে যেখানে কৃষি মৌসুম শেষ হলে মানুষ কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় চলে যেতেন, এখন অনেকেই নিজ এলাকায় সারা বছর আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি কৃষির বাইরের গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই ধরনের শিল্পই গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে টেকসই করার অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষির বাইরে এমন উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানই গ্রামীণ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল করে তোলে।
স্থানীয় অর্থনীতির বহুস্তর
চর শৌলমারীর তাঁতশিল্পকে শুধু কুটিরশিল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একটি লোকাল ইকোনমিক মাল্টিপ্লিয়ার সৃষ্টি করেছে। একজন তাঁতির আয় স্থানীয় মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, পরিবহন, গবাদিপশু, নির্মাণসামগ্রী কিংবা পোশাকের দোকানের বিক্রিও বাড়াচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, গত কয়েক বছরে নতুন ঘর নির্মাণ, মোটরসাইকেল ক্রয় এবং সন্তানদের শিক্ষায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনীতিতে একে কনসাপশন-লিড রুরাল গ্রোথ বলা হয়। অর্থাৎ মানুষের হাতে নগদ অর্থ বাড়লে স্থানীয় বাজারেও চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্ব
চর শৌলমারীর গল্পটি আসলে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানি ও উৎপাদনের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। চর শৌলমারীর মতো ক্ষুদ্র উৎপাদনকেন্দ্রগুলো সেই বৈচিত্র্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্ববাজারে বর্তমানে হ্যান্ডমেড টেক্সটাইল, এথনিক ফ্যাশন, সাসটেইনেবল ফ্যাশন এবং স্লো ফ্যাশনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। হাতে বোনা, পরিবেশবান্ধব এবং ঐতিহ্যনির্ভর পণ্যের জন্য ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও জাপানের বাজারে আলাদা মূল্য তৈরি হয়েছে। যদি মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল বিপণন এবং রপ্তানি সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে চর শৌলমারীর মনিপুরী শাড়িও বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় নিশ রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে।
সাফল্যের আড়ালে যে সংকট
তবে এই সাফল্যের ভেতরেও রয়েছে কয়েকটি বড় কাঠামোগত সমস্যা। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অধিকাংশ তাঁতি এখনো স্থানীয় মহাজনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি তাদের হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। কাঁচামালের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে উৎপাদকরা মূল্য বাড়াতে পারেন না। সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় অগ্রিম অর্থের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা তাদের দর-কষাকষির সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, চর শৌলমারীর নিজস্ব কোনো স্বীকৃত ব্র্যান্ড গড়ে ওঠেনি। অনেক শাড়িই অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে বাজারজাত হয়। ডিজিটাল বিপণনের অভাবও উৎপাদকদের সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর পথ সীমিত করে রেখেছে।
করণীয় যা
অর্থনীতিবিদদের মতে, চর শৌলমারীকে একটি হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার হিসেবে গড়ে তোলা হলে এর প্রভাব শুধু কুড়িগ্রাম নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
এর জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। যেমন এই শিল্পকে আরও বিকশিত করতে হলে সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক তাঁত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, নকশা উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল বিপণন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ, উৎপাদক সমবায় গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে মনিপুরী শাড়ির সম্ভাব্য ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি নিয়েও উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
চর শৌলমারীর তাঁতের শব্দ শুধু কাপড় বোনার শব্দ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের প্রতিধ্বনি। এই চরাঞ্চল দেখিয়ে দিয়েছে, উন্নয়ন সব সময় বড় শিল্পাঞ্চল কিংবা মেগা প্রকল্প দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো একটি পরিবারভিত্তিক তাঁত, কয়েকজন দক্ষ কারিগর এবং স্থানীয় উদ্যোক্তার সম্মিলিত উদ্যোগই একটি অঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশ যখন রপ্তানি বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং বিকেন্দ্রীভূত শিল্পায়নের নতুন পথ খুঁজছে, তখন চর শৌলমারীর মনিপুরী শাড়ি কেবল একটি স্থানীয় পণ্য নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক মডেল। প্রয়োজন শুধু সঠিক নীতি, বাজারসংযোগ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। সেই সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সীমান্তের এই চর একদিন বাংলাদেশের গ্রামীণ শিল্পায়নের অন্যতম সফল উদাহরণে পরিণত হতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




