অথচ

আমার ধারণা, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট হয় ফেসবুক রিলসে। রিলস খুললে প্রথম ভিডিওটা দেখি। তারপর দ্বিতীয়টা। দ্বিতীয়টার পর তৃতীয়টা। একসময় মনে হয়, মাত্র ৫ মিনিট দেখেছি। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি— ৪০ মিনিট। এই ৪০ মিনিট কোথায় গেল, তার কোনো হিসাব নেই।
রিলসের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, সে আপনার সময় নষ্টটা বুঝতে দেয় না। বরং মনে হয়, গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা দেখছি।
একজন রান্না করছে। আরেকজন নাচছে। তৃতীয় জন বলছে, ‘এই তিনটা কাজ করলে জীবন বদলে যাবে।’ চতুর্থ জন বলছে, ‘এই পাঁচটা খাবার খেলে শরীরের সব রোগ ভালো হবে।’ পঞ্চম জন এত জোরে চিৎকার করছে যে, কথাটা কী সেটা না জানলেও ভিডিওটা দেখা হয়ে যায়।
আগে মানুষ অবসর পেলে বই পড়ত, পত্রিকা পড়ত, কারও বাসায় যেত, ছাদে হাঁটত। এখন অবসর পেলে মোবাইল ফোন বের করে, অবসর না পেলেও মোবাইল ফোন বের করে।
বাসে বসে রিলস। খাবার খেতে খেতে রিলস। বিছানায় শুয়ে রিলস। এমনকি কারও সঙ্গে কথা বলার সময়ও মানুষ ফোনের দিকে তাকায়। মনে হয়, সামনের মানুষটা একটু বিরতি দিলেই একটা রিলস দেখে নেওয়া যায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, রিলস আমাদের ধৈর্য কমিয়ে দিচ্ছে। আগে একটা গল্প শুনতে ১০ মিনিট লাগলে আমরা শুনতাম। এখন বিরক্ত হই। বইয়ের একটা অধ্যায় পড়তে বসলে ৫ মিনিট পর মনে হয়, এখানে কী ‘স্কিপ’ বলে কোনো বাটন নেই?
বাস্তব জীবন কোনো রিলস নয়। এখানে একই দৃশ্য বারবার দেখা যায়। একই মানুষকে প্রতিদিন দেখতে হয়। অফিসে একই কাজ করতে হয়। সন্তানের একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। বাজারে একই দোকানে যেতে হয়। বাস্তব জীবনে ‘নেক্সট’ বলে কোনো বাটন নেই। আর এই জায়গাটিতেই রিলস আমাদের সবচেয়ে বেশি ঠকিয়েছে।
রিলস দেখলে একটার পর একটা নতুন মানুষ আসে। নতুন জায়গা আসে। নতুন ঘটনা আসে। নতুন শব্দ, নতুন মুখ, নতুন হাসি। বাস্তব জীবন এত বৈচিত্র্যময় না। ফলে বাস্তব জীবনকে একসময় সাদামাটা মনে হতে শুরু করে।
একদিন আমার ছেলে জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা তুমি কী করছ?’
আমি বললাম, ‘রিলস দেখছি।’
সে বলল, ‘কীসের?’
আমি একটু ভেবে বললাম, ‘জানি না।’
সত্যিই জানি না। এই ‘জানি না’-টাই সম্ভবত রিলসের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
আমরা কী দেখছি, জানি না। কেন দেখছি, জানি না। কতক্ষণ ধরে দেখছি, জানি না। শুধু জানি, আঙুলটা ওপরের দিকে যাচ্ছে। তারপর আবার নতুন একটা ভিডিও আসছে।



