Agamir Somoy E-Paper
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
অসহায় মানুষের পাশে সরোয়ার
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাহিত্য

মুখোমুখি সৈয়দ শামসুল হক

এ মুহূর্তে দেশ যে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০
এ মুহূর্তে দেশ যে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

আলাপচারিতার বিশেষ মূহূর্তে কবি সৈয়দ শামসুল হক ও শিমুল সালাহ্উদ্দিন ছবি: সানজিদা ইসলাম পদ্মা

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫–২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬) লেখালেখি করেছেন ছয় দশক ধরে। নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। পঞ্চাশের দশকে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীদের সঙ্গে যাত্রা শুরু করা প্রথিতযশা এই কবি একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, চিত্রনাট্য-রচয়িতা, সংলাপ-লেখক ও গীতিকার। সৈয়দ শামসুল হক জন্মগ্রহণ করেন কুড়িগ্রামে। বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায়, কবিতা, নাটক, গল্প ও উপন্যাসে সৈয়দ শামসুল হক তৈরি করেছেন নিজস্ব ধারাক্রম। সাহিত্যের ফর্ম বিভাজন নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই বলে প্রকাশ করলেও, কবিতার ধ্রুপদী আঙ্গিক কাব্যনাট্যে তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম।

সৈয়দ শামসুল হক (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬)পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬), গণনায়ক (১৯৭৬), নুরুলদীনের সারা জীবন (১৯৮২), এখানে এখন (১৯৮৮), আর ঈর্ষার মধ্য দিয়ে চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে নিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে। তাঁর বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা (১৯৭০), পরানের গহীন ভিতর (১৯৮০), বেজান শহরের জন্য কোরাস (১৯৮৯), এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি (১৯৮৯), ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর (২০০৯) কিংবা ‘অন্তর্গত’র মতো কথাকাব্য কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না সচেতন কবিতার পাঠক। সীমানা ছাড়িয়ে (১৯৬৪), নীল দংশন (১৯৮১), মৃগয়ায় কালক্ষেপণ (১৯৮৬), স্তব্ধতার অনুবাদ (১৯৮৭), এক যুবকের ছায়াপথ (১৯৮৭), স্বপ্ন সংক্রান্ত (১৯৮৯), বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ (১৯৯০) কিংবা খেলারাম খেলে যা’র মতো উপন্যাসে অমর পদচিহ্ন এঁকেছেন বাংলা উপন্যাসের ধারায়। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস নিষিদ্ধ লোবান অবলম্বনে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’ জয় করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার।

বাংলাসাহিত্যের ছোটগল্পের অমৃতভাণ্ডারে সৈয়দ হক যুক্ত করেছেন অমূল্য সব রত্ন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে রেকর্ডগড়া বয়সে অর্থাৎ সবচেয়ে কম বয়সে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, মাত্র ২৯ বছরে। একুশে পদক পেয়েছেন ১৯৮৪ সালে। কবির ৭৭তম জন্মদিন উপলক্ষে কবির মুখোমুখি হয়েছিলেন কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন। সাক্ষাৎকারের সময় সঙ্গে ছিলেন আলোকচিত্রী সানজিদা ইসলাম পদ্মা ও শিল্পী সোহরাব রাব্বি। এ সাক্ষাৎকারের সংক্ষেপিত অংশ কবির জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক কালের কণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকী শিলালিপিতে। পরে পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় অধুনালুপ্ত সাহিত্য ম্যাগ পরস্পরে। কবি সৈয়দ শামসুল হকের প্রয়াণদিবসে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো আগামীর সময়ে। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ২৯ নভেম্বর, ২০১২ সালে, ঢাকায় কবির বাসভবন, মঞ্জুবাড়ি, গুলশানে।

বাংলাসাহিত্যের ছোটগল্পের অমৃতভাণ্ডারে সৈয়দ হক যুক্ত করেছেন অমূল্য সব রত্নশিমুল সালাহ্উদ্দিন: শুরু করতে চাই আসলে আপনার শৈশব দিয়ে, ঐ যে আপনি লিখেছিলেন ‘আমার জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে…’

সৈয়দ শামসুল হক: অন্যকথা বলো, শৈশবের কথা অনেক বলেছি, লেখায়, আত্মস্মৃতিতে, কবিতায়। শৈশবের কথা বলার এখন ধৈর্যও নেই, ইচ্ছেও নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হক ভাই, আমি আসলে একটা বায়োগ্রাফিকাল ইন্টারভিউ করতে চাইছি বলে শৈশবের প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে চাইছিলাম, আপনি আগে থেকেই যদি বলেন যে, এটার উত্তর দিবো না তাহলে তো আপনার ড্রাইভ করা সাক্ষাৎকার নিয়ে গাড়িতে উঠতে হবে আমাকে। অনেক ইন্টারভিউ দিয়েছেন জীবনে…

সৈয়দ শামসুল হক: ইউ ইয়াং পিপল, সহজ রাস্তা পছন্দ করো, ইন্টারভিউ নিলে লিখতে হয় না, ভাবতে হয় না, সহজ রাস্তা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সহজ রাস্তা না হক ভাই। নিজের লেখালেখি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সময়ের কথা ভাবলে, আর না ভেবে, না পড়ে, না খোঁজ নিয়ে আসি নাই যে সহজ রাস্তা বলবেন! আসলে আমি চেয়েছি আপনার হাজারো সাক্ষাৎকারে আনটাচ্‌ড, না বলা বা অ-বলা জায়গাগুলো স্পর্শ করতে। ঠিক আছে, আমরা অন্যভাবে চেষ্টা করি, আমার জানামতে আপনার পাঁচটি নাটক এখন ঢাকার মঞ্চে চলমান। যেমন, নাগরিকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, কণ্ঠশীলনের ‘উত্তরপুরুষ’, গাজী রাকায়েতের দ্বিভাষিক নাটক ‘ডেড পিকক বা মরা ময়ূর’ বা নারীগণ। নাটক হবে হবে, মানে মঞ্চে উঠবে উঠবে করছে আরো কয়েকটা। চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’ তো চললই, দর্শকনন্দিত হলো। সামগ্রিক সৈয়দ শামসুল হককে একটা সাক্ষাৎকারে তুলে ধরার ভার আমাকে দেয়া হয়েছে, আমি যদি শৈশব থেকে না শুরু করতে পারি—

সৈয়দ শামসুল হক: আমার শৈশব আর যে কোনো বাঙালি কিশোর ছেলে বা মেয়ের মতোই। কোনো বিশেষত্ব নেই। শহরে বসে কথা বলছি, আমার জন্ম গ্রামে। এছাড়া আর কোনো বিশেষত্ব নেই, দশজনের মতোই এবং আমি অসাধারণ মানুষ নই, খুবই সাধারণ। আমার নাটকে আমি বলেছি, ঈর্ষা নাটকে বলেছি, শিল্পী যখন সৃজনকাজে মগ্ন থাকেন সেই মুহূর্তে অসাধারণত্বের দিকে একটা উল্লম্ফন হয়তো তাঁর ঘটে, পরমুহূর্তেই তিনি আর তার ভেতর থাকেন না। সৃষ্টি শেষেই তিনি সাধারণ। এবং আমি নিজেকেও তাই মনে করি, আমার জীবনের বিশেষ কোনো গল্প নেই। বিশেষ কোনো ইশতেহার নেই, ইতিহাস নেই, কেবল যখন লিখি তখন হয়তো আমারও একটু উত্তোলন ঘটে, যে সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, সৃষ্টির সেই মুহূর্তের একটা অনুরণন ভেতরে হয়, সেইটাকে ভাষায় প্রকাশ করবার চেষ্টা করি এবং ভাষাটাই আমার কাজ। আমার কাছে কবিতা গল্প উপন্যাস নাটক এগুলো আলাদা করে ভাববার নয়। সবই ভাষার ডাক। ভাষার কাজ। এটাকে আমার একজন চিত্রকরের কাছে রঙের ব্যবহার করার মতো মনে হয়, যেমন তিনি কখনো তেলরঙে আঁকছেন, কখনো জলরঙে, কখনো কলমে আঁকছেন, কখনো পেন্সিলে আঁকছেন, আমার কাছেও তেমনি।

স্ত্রী আনোয়ারা হকের সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকশিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঈর্ষায় যে তিনটি ক্যারেক্টার ছিল তার বর্ষীয়ান চিত্রকরের মতোই যেন বললেন, কিন্তু ১৯৩৫ থেকে আজ ২০১২ এই দীর্ঘ সময়ে এমন কোনো প্রথম মুহূর্তের কথা কি আপনি স্মরণ করতে পারেন, যে মুহূর্তে আপনি নিজেকে অসাধারণ ভাবা শুরু করলেন?

সৈয়দ শামসুল হক: গোড়াতেই বলেছি, বলেছি তো, আবার অসাধারণ কথাটা আসলো কেন? আমি একেবারেই সাধারণ। আমি অনুভব করি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। আমি অসাধারণ হলে জনগণের সাথে মিশতে পারতাম না। সাধারণ মানুষের দিকে তাকাতে পারতাম না। সাধারণের ভিতরে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারতাম না। কোনো অর্থেই আমি অসাধারণ নই। লেখার ক্ষেত্রে যতটুকু যা করেছি সেটা হচ্ছে আমার একটা কাজ হিসেবে দেখতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার যে কাব্যনাট্যগুলি, আমার যে চারটি পড়া আছে, ঈর্ষা, গণনায়ক, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ও নুরুলদীনের সারাজীবন, এর মধ্যে গণনায়কে বঙ্গবন্ধুর একধরনের ছাঁচ পাওয়া যায়, তার প্রেক্ষাপটটা জানতে চাই। একসাথে অনেক লেখা লেখেন আপনি, এ কাব্যনাট্যটি লেখার সময় আপনি কি আরো কোনো লেখা লিখছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক: পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় যে রাতে শেষ করি এটা সেই রাতেই আমি ধরি, এটা গণনায়ক, শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজারের একটা বাংলা রূপান্তর আমি করতে চেয়েছিলাম, ১৯৭৫ সালের পর, তো, মে মাস, জুন মাসের কথা, সেই সময় বাংলা রূপান্তর করতে গিয়ে প্রত্যেকটি অঙ্কের প্রায় সমান্তরাল রূপান্তর করি, শেষ দুটি অঙ্ক আমার নিজের করা। রিভিউয়ের সময় পুরোটাই প্রায় পাল্টে গেছে, ছাপার ঠিক আগে আগে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবিতা নিয়ে প্রচুর কথা বলেছেন আপনি, ফর্ম নিয়ে, আবেগের ব্যবহার নিয়ে, মার্জিনে মন্তব্য-এ, আপনার কিছু পূর্বপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম প্রস্তুতির জন্য, প্রায় সব সাক্ষাৎকারেই আপনার একটা কাব্যগ্রন্থ যা আমার খুব প্রিয়, সেটার কোনো রকম উল্লেখ নাই। এক আশ্চর্য সঙ্গমের স্মৃতি, ছোট্ট একটা বই, যতদূর মনে পড়ে ফরিদ কবির বোধহয় প্রকাশ করেছিলেন বইটি। খুব মিষ্টি মিষ্টি কিছু কবিতা ছিল, আপনার অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় এটা অনালোচিত, তা কেন? লিখে ফেলবার এতদিন পরে এই কবিতাগুলিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

সৈয়দ শামসুল হক: এখনো আমার কাছে ভালো লাগে। ওর ভেতরে কতকগুলো দিক ছিল, কারিগরি দিক। সেটা হলো, গদ্যে লেখা, কিন্তু সমিল গদ্য, আর ভেতরে একটা গল্প আছে। গল্পভিত্তিক কবিতা সাধারণত লিখি নাই আমি অন্য কোনো কাব্যগ্রন্থে। কিন্তু যে দুয়েকটি কাজ করেছি তার মধ্যে এটা একটা। যেমন অনেক দিন পরে সম্প্রতি আমার একটি কবিতার বই বেরিয়েছে, বাল্যপ্রেমকথা, এটা একটা গল্পভিত্তিক কবিতার চেষ্টা, তেমনি এক আশ্চর্য সঙ্গমের স্মৃতি, এটারও আবছায়া গল্প আছে ভেতরে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা প্রকরণের দিক থেকে গদ্যে লেখা, গদ্যছন্দে লেখা, সমিল গদ্যে লেখা, প্রেমের কবিতা এবং এখানে যে আশ্চর্য সঙ্গম বলা হয়েছে সেটা নারীপুরুষের সহবাস অর্থে নয়, এটা হচ্ছে একটা মিলন অর্থে, যেমন নদীসঙ্গম, সাগরসঙ্গম বলা হয় সেই অর্থে। আর, এখন লিখলে হয়তো ঐ আশ্চর্য কথাটিকে বাদ দিতাম।

সবচেয়ে কম বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন সৈয়দ শামসুল হকশিমুল সালাহ্উদ্দিন: ‘এক আশ্চর্য সঙ্গমের স্মৃতি’ই বলতেন? কবি কি প্রতিনিয়ত নিজের ভেতর ভাঙতে গড়তে থাকেন? সম্পাদনা করতে থাকেন?

সৈয়দ শামসুল হক: আগের লেখায় নয় এটা, তবে, এখন কথা উঠল বলে মনে হয়, বইয়ের শিরোনামগুলির দিকে যখন তাকাই তখন এটা মনে হয়, এই যে ‘আশ্চর্য’ বিশেষণটার মনে হয় দরকার ছিল না। কিন্তু তুমি যখন বলছ ভালো লেগেছে, তাহলে তো মনে হয় কাজে দিয়েছে বিশেষণটি। এখন মনে হয়, আশ্চর্য শব্দটা আসলে কিছুই বলে না। এটা আমাদের যখন শব্দ ব্যবহারের দৈন্য ঘটে তখন ব্যবহার করি। এটা তেমন কিছু না বা এটা আশ্চর্য ভালো বলতে আমরা আশ্চর্য বলি, এই যে তুমি বললে অনবরত ভেতরে এডিট হতে থাকে কিনা? নিজের পুরনো লেখার দিকে আমি তাকাই না, দেখিও না, পড়িও না, বর্তমানগুলো নিয়ে ভেবেই সময় করা যায় না আসলে। আমার পড়বার বা তাকাবার দরকার হয় নি-ও কখনো। আমার শ্রুতি কত শক্তিশালী আমি জানি না, তবে এই দীর্ঘ জীবনে আমি লেখার জন্য কোনো নোট নিই নি কখনো, সবই আমার মনে থাকে, তেমনি কী লিখেছি সেটাও আমার মনে থাকে। তো সেটা নিয়ে যদি আবার নাড়াচাড়া করতে হয় তাহলে তো হলো না। এখন তুমি সামনে বললে বলে বললাম। যে লেখাটা হয়ে যায় তার আর কোনো মূল্য থাকে না আমার কাছে। একটা কথা আমি আগেই বলেছি যে, মনোবল তো বুকের ভেতরে, যে অনুরণন ঘটে সেটাকে ভাষায় প্রকাশ করি, কখনো কবিতায়, কখনো গল্পে, কখনো নাটকে, কিন্তু এই যে যদি আমি প্রকাশ না করতে পারি, তাহলে আমি অস্থির থাকি। অসুস্থ থাকি। এই অসুখ থেকে মুক্তি পাবার, চিকিৎসিত হবার একমাত্র উপায় হলো লেখা, আমার লেখা এবং লিখে আমি চিকিৎসিত হই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি সেই সাহসী লোক যে কোনো কিছু না করে শুধুমাত্র লিখতে চেয়েছেন এবং লেখাকেই পেশা করেছেন। এবং আমাদের এই ভূ-খণ্ডের প্রথম ডিজিটাল রাইটার।

সৈয়দ শামসুল হক: ডিজিটাল কিনা জানি না, এটা ফ্যাশনেবল ওয়ার্ড। আমি যন্ত্রে অর্থাৎ টাইপরাইটারে লিখতে শুরু করি ১৯৭২ সালে। এর আগে মুনীর চৌধুরী যখন বাংলা হরফে অপটিমাম টাইপটি উদ্ভাবন করেন, দশটি টাইপরাইটার তিনি আনিয়েছিলেন জার্মানি থেকে, পূর্ব জার্মানিতে তৈরি মেশিন উনার কাছে এসেছিল, বাংলায় টাইপ করে দেখা হোক এটা কেমন কতটা কাজে আসবে, মুনীর ভাই আমাকে দিয়েছিলেন একটা টাইপরাইটার কিছুদিনের জন্য, লিখবার ক্ষেত্রে তা সহায়তা করছে কিনা তা বোঝার জন্য, তো যাই হোক, তারপরে তো মুক্তিযুদ্ধ, ৭২ সালে লন্ডনে যখন আমি বিবিসিতে কাজ করতে ঢুকলাম, তখন আমি টাইপরাইটার বানিয়ে নিয়েছিলাম বার্লিন থেকে, পূর্ব বার্লিন থেকে, অপটিমাম মুনীর। ৭২ থেকেই আমার যাবৎ লেখা টাইপরাইটারে, কবিতা ছাড়া। যাবৎ লেখা বলছি এইজন্য, আমি কবিতা কখনো লিখতে পারি নি, কবিতা আমাকে হাতে লিখতে হয়, কলমে। নাটকও আমাকে খানিক হাতে কাগজে আর খানিক টাইপরাইটারে। কিন্তু গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ আমি বরাবর টাইপরাইটারে লিখেছি। টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটারে এলাম ১৯৮৯ সালে, ৮৯ সালে ডেক্সটপ ব্যবহার করতাম, ৯৪-এ এল ল্যাপটপ, সে ভীষণ ভারী ছিল, সে তো আজকের কথা নয়, এখন আমি ল্যাপটপ, একেবারে ছোট ল্যাপটপ যেটা আমি হাতে ক্যারি করতে পারি, নোটবুক, সেটাতে লিখি। সঙ্গে রাখি এবং যখন তখন লিখতে পারি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পেশার জায়গায়…এটা তো ঠিক যে এখনো অনেকেই এই সাহসটা করে না…

সৈয়দ শামসুল হক: হুম পেশাগতভাবে, এটা ঠিক যে ১৯৫৪ সাল থেকে আমি লেখার উপর নির্ভরশীল, উপার্জনের দিক থেকে। তবে সবটা নয়, যেমন, আমি তিন সাড়ে-তিন বছর সাংবাদিকতা করেছি, চিত্র-সাংবাদিকতা যাকে বলে, ‘চিত্রালী’র সহ-সম্পাদক ছিলাম, মাঝখানে আমি আট বছর বিবিসিতে প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছি, ৭২ থেকে আটাত্তরের শেষ অবধি। এই সময়গুলো বাদে আর সবসময়ই আমি লেখার উপর নির্ভর করেছি, এবং এ কথাটাও বলতে হবে একইসঙ্গে, দুর্দিন যায় নি তা নয়, দুর্দিন গেছে এবং কাজ কম এসেছে, উপার্জন কম হয়েছে, কিন্তু আমার একটা সৌভাগ্য যে, আনোয়ারা সৈয়দ হক, যিনি আমার জীবনসঙ্গী, তার একটা পেশা আছে, চিকিৎসক, সেটা আমাকে অত্যন্ত বেশি সহায়তা করেছে, এই অর্থে যে আমি লেখাকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে পেরেছি। উপার্জন আমার শিথিল হলেও সেটা আমাকে খুব বড় পীড়া দিতে পারে নি, কিন্তু দিয়েছে, প্রথমদিকে, ৫৪ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত। এই ষোল বছর খুব সংগ্রাম করতে হয়েছে। এবং সিনেমার জন্য আমাকে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়েছে, যদিও সেটা লেখা, কিন্তু সাহিত্য তো আর নয়, সেটা করতে হয়েছে। আবার ৫৪ থেকে ষাট সাল অবধি এই সময়টায় আমি টেক্সটবুক লিখেছি, ছাত্রদের জন্য অর্থের বই লিখেছি, গাইড বই লিখেছি বাংলার, সেসব দিনের কথা মনে পড়লে, নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হই, হ্যাঁ, একটা কষ্টের জীবন অতিক্রম করেছি। আমি মনে করি, লেখাটা হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার কাজ, অন্য কোনো কাজ করে, অন্তত আমার পক্ষে এটা সম্ভব হতো না। আমি জানি, পৃথিবীর অন্য ভাষাতে বা আমাদের ভাষাতেও, এমন লেখক আছেন, সাংবাদিক কিন্তু খুব বড় লেখক, অধ্যাপক কিন্তু খুব বড় লেখক, চিকিৎসক কিন্তু খুব বড় লেখক, আমার দ্বারা সেরকম হয়ে ওঠে নি। আমি প্রথম থেকেই লিখতেই কেবল চেয়েছি, আমার জীবনসঙ্গিনী আনোয়ারা সৈয়দ হক, যিনি নিজেও লেখেন বলে বেদনাটা বুঝেছেন, আমার কষ্ট হয়নি।

সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক, চিত্রশিল্পী বিপদভঞ্জন সেন কর্মকারশিমুল সালাহ্উদ্দিন: লেখকের জীবনে সকলই সামগ্রিকভাবে লেখার জন্য উৎসারিত বলেই আপনাকে এ প্রশ্ন করা! এই যে প্রচণ্ড কষ্টের সেই দিনগুলোতে কি কখনো এমন মনে হয় নি যে জীবন, লেখালেখি, সংসার, প্রেম প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা অস্তিত্বশীল হয়ে উঠেছে?

সৈয়দ শামসুল হক: না, না, সবটা মিলে জীবন হচ্ছে একটাই। তার একমাত্র উদ্দেশ্য নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করা। আমি সবসময় জোর দিয়েছি আমি যে কাজই করি না কেন, সংসার করি কি সাহিত্য করি, কি প্রেমের ভিতরে থাকি, কি অপ্রেমের ভিতরে থাকি, বিরহে থাকি কি মিলনে থাকি, বর্ষায় থাকি কি বৃষ্টিতে থাকি আই মাস্ট ফিল দ্যাট আই এক্সিস্ট। আই হ্যাভ টু ফিল দ্যাট আই এক্সিস্ট। এবং মানুষ যখন নিজে এই অনুভবটা ভুলে যায় বা ব্যর্থ হয় তখনি কিন্তু সে মৃত, তার হাত পা চলমান কিন্তু সে মৃত। কাজেই অস্তিত্বকে আমি আমার জীবনের সমস্ত রকম কাজের ভেতর দিয়ে ছেনে নিতে চেষ্টা করেছি, এবং এর ফলে আমি নিজেকে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছি যে আমি বেঁচে আছি, দ্যাট আই এক্সিস্ট। দ্যাট আই লিভ। নইলে ভাত খাওয়া, মাছ খাওয়া, সংসার করা, সন্তান উৎপাদন করা, চাকরি করা, হলিডেতে যাওয়া এগুলো কিছু নয়। আমার কাছে লেখাটা জরুরি। এই যে লিখছি এটা হয় আমি অনুভব করতে পারি বলে, জীবিত আছি বলে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হক ভাই, শৈশবে, বাবা চেয়েছিল ডাক্তার বানাতে আপনাকে…

সৈয়দ শামসুল হক: এ তো বিখ্যাত গল্প, আমার জীবনের গল্প, আমি যে অস্তিত্বশীল তার এক প্রামাণিক গল্প। বহুবার বলেছি আমি, লিখেছিও…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি আবারও শুনতে চাই, আপনি মানুষ এবং লেখক, আপনার এখনকার বলা আগের মতো হবে না, আপনি পালিয়েছিলেন বাবার পীড়াপীড়ির জবাবে… এক্কেবারে বম্বে… পালিয়েছিলেন কেন?

সৈয়দ শামসুল হক: পালিয়েছিলাম, একগুঁয়ে ছিলাম বলে, জোর করে বলছে ডাক্তারি পড়তে হবে, তা আমার পছন্দ না। বাবা জোর করে ডাক্তার বানাবেন, তো পালিয়ে গেলাম। বাবা বুঝলেন না এ ছেলেকে দিয়ে জোর করে কিছু হবে না। বাবা শুধরেছেন পরে। আমি এক বছর পর ফেরত আসলাম। বাবা বুঝেছেন এ ছেলে তো নিজের পথে নিজের মতে চলবে। আবার সেই আর্টস পড়েছি, ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবার দু’বছর পর মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে কিছু শেখাতে পারে না, অধ্যাপকদের পড়ানো আমার ভালো লাগে না, আমার কাছে মনে হলো আমি অর্থহীন সময় ব্যয় করছি, বেরিয়ে চলে এলাম। যদি আমি থেকে যেতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাহলে কিন্তু আই উড হ্যাভ বিন এ ডেড ম্যান। আমি সবসময়ই তাই করেছি যা আমি করতে চেয়েছি। তাই করেছি যা কিছু আমাকে এটা অনুভব করিয়েছে যে আমি বেঁচে আছি। আমি অস্তিত্বশীল আছি। আমি জীবনে কখনো কোনো কিছু মেনে নিইনি, পছন্দ না হলে। আপোস করি নি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বলব, আপোস করি নি বলেই যে আমি ঘাড়ত্যাড়া লোক, এটাও না, আমার মর্যাদাবোধ আছে। অহঙ্কার নয়, আত্মমর্যাদাবোধ আছে যে আমি যা ভাবি, যা ভেবেছি সেটা ঠিক এবং সেইটা মেনে চলি। আমি জীবনে কারো উপদেশ গ্রহণ করি নি, জীবনে কারো পরামর্শ চাইও নি, আমার কাজেও লাগে নি। যা করেছি আমি, একা করেছি। সাহিত্য করেছি, আমি সমালোচকের কথায়…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কখনো কান দেন নি!

সৈয়দ শামসুল হক: বা হাসি নি। প্রশংসায় যেমন স্ফীত হই নি, অপ্রশংসাতেও নিজেকে ক্ষুণ্ন হতে দিই নি। কারণ আমি কোথায় ব্যর্থ হয়েছি, কোথায় আমার খামতি, কী আসে নি সেটা আমিই জানি। এবং আমি বিশ্বাস করি, সবসময় বলে থাকি, একজন লেখক যদি সত্যিকার অর্থে লেখক হন, তাহলে তিনিই তার সবচেয়ে বড় সমালোচক। লেখকের জন্য সমালোচনা সাহিত্যের দরকার নেই। লোকে বলে দেবে তবে আমি আমার ভুল দেখতে পাব, হা হা, এভাবে হয় না। কোনো শিল্পীই এভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। তার নিজের পথ নিজেকে করতে হবে, নিজের সমালোচনা নিজেকে করতে হবে, নিজের পথ নিজেকে কাটতে হবে। কোথায় পা ফসকালো, কোথায় আরেকটু চলনটা ভালো হতে পারত, কোথায় যাওয়া উচিত ছিল, কোথায় যাওয়া উচিত ছিল না, এগুলো নিজেকেই বুঝতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হক ভাই, শৈশবে আপনি বম্বে পালিয়ে গিয়ে একটা সিনেমা ইউনিটে জুটেছিলেন, পরবর্তীতে আপনি যখন বাংলাদেশে সিনেমার চিত্রনাট্য লিখলেন, এমনকি টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করলেন, বাংলা সিনেমার জন্য বিখ্যাত গান ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ লিখলেন, বাংলা সিনেমায় আপনার যে কর্মকাণ্ড সেটা কি শৈশবের বম্বের স্মৃতিপ্রাণিত? আপনার সিনেমা ভালো লাগা বা শৈশবের পালিয়ে থাকা রঙিন দিনগুলোর কোনো প্রণোদনা কি সেখানে কাজ করেছে?

সৈয়দ শামসুল হকের লেখা বইসৈয়দ শামসুল হক: মোটেই না। আমার সিনেমায় কাজ করাটা পুরোপুরি আমার উপার্জনের সাথে জড়িত। আমি বাংলাদেশেও যখন চলচ্চিত্রে ফিরে আসি, সেটা করার প্রধান কারণই ছিল উপার্জন। যখন আসি চলচ্চিত্রে, সদ্যই আমার বাবা মারা গেলেন, আমার নিচে সাতটা ভাইবোন, নিজেকে দেখতে হচ্ছে, যথাসাধ্য তাদের দেখতে হচ্ছে, সব মিলিয়ে আমাকে সেই বয়সে, আঠারো উনিশ বছর বয়সে, একটা বিশাল সংসারের ভার নিতে হয়েছে, সবটা যে আমি করেছি তা নয়, কিন্তু আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এগুলি নিয়ে বেশি কথা বলবার কিছু নেই, এটা সবার ক্ষেত্রেই হয় বাংলাদেশে। হয়তো তোমারও এমনি। বহু বহু মানুষের জীবন এমন যে অকালে পিতার মৃত্যু হয়েছে বলে সংসারের জোয়াল টানতে হচ্ছে। বলেছি তো, আমার জীবন কোনো অসাধারণ জীবন নয়, আমি খুবই সাধারণ। তো, সেইদিক থেকে আমার উপার্জন করবার দরকার ছিল, আমি সেটা সিনেমা থেকে করেছি। উচ্চাশাটা ছিল আমার বরাবর, সারা জীবনই। আমি যদি আজকালকার জমানায় ব্যবসা করতাম তাহলে আমি এদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী হতাম, আমি রাজনীতি করলে রাজনীতির একটা ঊর্ধ্বস্তরে পৌঁছুতে পারতাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রাজনীতি করলে নিশ্চিত আপনি মঞ্চ-কাঁপানো বক্তা হতেন, আপনার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় বা গণনায়ক-এর সংলাপ খুবই শক্তিশালী… তো বিরাশির পর আপনি আর চিত্রনাট্য লিখলেন না?

সৈয়দ শামসুল হক: না না, আমার সময়টা আমি সাহিত্যে ব্যয় করতে চাই, সিনেমার পরিবেশও আর সেরকম পরিচ্ছন্ন রইল না, আর এটা তো একটা পরিশ্রমের কাজ, বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট কাজ—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: চিত্রনাট্য?

সৈয়দ শামসুল হক: চিত্রনাট্য কেন শুধু হবে, পুরো সিনেমার কাজই, আমি তো শিল্পনির্দেশনাও দিয়েছি, শ্যুটিংয়ে থেকেছি, আর এটা একটা শিল্প তো, এর একটা লগ্নি আছে তো, আমার কথার ওপর একটা লোক লগ্নি করছে বিশাল পরিমাণের অর্থ, আমাকে সময় দিতে হবে না! সেই সময়টা আমি সাহিত্যে দিলে… আসলে দ্যাখো, আমার কাছে, একটা জিনিস, জীবনে কে কী হবে, এটা জানাটাও কিন্তু অত্যন্ত জরুরি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি ঠিক এ জিনিসটাই জানতে চেয়ে শুরু করতে চেয়েছিলাম হক ভাই, আপনি প্রথম কবে টের পেলেন যে আপনাকে দিয়ে লেখাই হচ্ছে, আপনি শুধুমাত্র লিখবেন?

সৈয়দ শামসুল হক: সবসময়, সবসময় আমি তা টের পেয়েছি। আমার অভাবের সময়ে, আমার কষ্টের সময়ে, আমার প্রচণ্ড পরিশ্রমের সময়ে। সিনেমায় সময় দেবার সময়গুলোতে আমি একা কেঁদেছি, প্রতিজ্ঞা করেছি লেখাকেই সময় দেবো। এরপর একসময় চলে এসেছি, সিনেমা ছেড়ে দিয়েছি। আমার আর দরকার নেই, আমার যথেষ্ট এসেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যখন চলে এলেন, তখন কি স্বচ্ছলতা চলে এসেছে আপনাদের জীবনে?

সৈয়দ শামসুল হক: হ্যাঁ, চলে এসেছে, স্বচ্ছলতা কাকে বলে! আমার কি কোটি টাকার দরকার? আমি যা করতে চাই, আমার যা মনে ইচ্ছে করে সেইটে যদি আমি করতে পারি, মেটাতে পারি, তাহলে আমার থেকে ধনী আর কে আছে!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কেউ নেই।

সৈয়দ শামসুল হক: সে-ই। লেখার তাড়নাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর সিনেমায় নয়, আমার এত সময় নেই যে অর্থোপার্জনের জন্য সময় নষ্ট করব।

সৈয়দ শামসুল হকের লেখা বইশিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক বা বড় সাহিত্যিক যারা, যারা প্রতিনিধিত্বশীল, আপনি তাদের মধ্যে একজন। তাই সামাজিক দায়বোধ আপনি এড়াতে পারেন না। আপনি যে ফিল্মইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘসময় রুটিরুজি জোগার করেছেন, কাজ করেছেন, সব মানুষগুলোকে চেনেন এবং এফডিসির প্রত্যেকটি ফ্লোর চেনে আপনাকে, সেই আপনার চোখের সামনেই কিন্তু বাংলাদেশের সিনেমা-ইন্ডাস্ট্রি একভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। সিনেমায় কাজ করে বাংলা সিনেমার দুর্দিনের সময় অর্থাৎ নব্বইয়ের দ্বিতীয়াংশে কিভাবে নীরব রইলেন?

সৈয়দ শামসুল হক: চুপ থেকেছি যে এমন নয়, তবে সাহিত্যে আমার মনোযোগ থাকায় ও-পাড়া ছেড়ে আসার পর খুব একটা খোঁজ রাখি নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার তর্ক-উগারী উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে নাসিরউদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’ দেশে-বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছে। অন্য কেউ সিনেমার স্ক্রিপ্ট চাইলে দেবেন? এখনো আগ্রহ আছে?

সৈয়দ শামসুল হক: আমার যেকোনো গল্প বা উপন্যাস থেকে যে কেউ ইচ্ছে করলে করতে পারে, এরকম দুয়েকজনের প্রস্তাবও আমার কাছে এসেছে। অনেকে মনে করে আমার রচনার দৃশ্যময়তা খুব ভালো। প্রস্তাব তো আছেই লাগাতার আসলে। অনেকে আসে, আমি বলি যে আমাকে একটু দেখিয়ে নেবে। বা একটু আলোচনা করে শুনতে চাই যে কিভাবে করতে চায়, আমি নিজে এখন এসব করতে চাই না খুব একটা, বড্ড সময়সংহারী এ মাধ্যমটা। তাই চাই না, কারণ আমি জানি আমার কাজ অন্য জায়গায়। আর তোমার আগের প্রশ্নটা মনে রেখেই বলি, আমার হাতে ভুবনের ভার নেই। একেবারে সব কাজ আমাকেই করতে হবে! হাজার রকমের পোশাক আছে বাজারে, আমার হয়তো দুটি বা একটিই ভালো লাগে, তিনটা পছন্দ বা পাঁচটা পছন্দ, কিনি হয়তো, পরি না পাঁচটা, তেমনি হয়তো আমার সাতটা মাধ্যমে কাজ করার মতো বুদ্ধি বা দক্ষতা আছে, তাই বলে আমি সাতটা মাধ্যমে কাজ করব না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু আপনি তো সব্যসাচী!

সৈয়দ শামসুল হক: সে তো সাহিত্যের কথা বলো তোমরা, সাহিত্যে। আর এ পদবিটা আমি দিই নি, আমি ঠিক পছন্দও করি না। আর সাহিত্যে আসলে কবিতা, উপন্যাস, নাটক এসবের ফর্ম আলাদা হলেও লেখকের কাছে সেটা একটা সাহিত্য-অনুষঙ্গ, আদতে সৃষ্টিকর্ম, ফর্মে আলাদা হলেও স্রষ্টার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি জানি, আপনি দীর্ঘসময় লেখা নিয়ে ভাবেন, একেবারে সাজিয়ে নিয়ে টেবিলে বসেন যন্ত্রের মুখোমুখি, ফিকশনের বেলায়। এখনো কোনো কোনো বড় লেখার পরিকল্পনা বাকি রয়ে গেল কি?

সৈয়দ শামসুল হক: হা হা হা (অট্টহাসি)। কত লেখা রয়ে গেল! এটা প্রশ্ন হলো তোমার! মাথায় দশটা লেখার ভাবনা, লিখতে না লিখতে আরো পাঁচটা, তাহলে বারোটা হয়ে গেল! সেইগুলো লিখতে লিখতে আরো পাঁচটা চলে আসে… এটা তো একটা সতত চলমান প্রক্রিয়া…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না, হক ভাই, আপনি একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আপনি মাথায়ই আগে লিখে ফেলেন…!

সাহিত্যের প্রায় সব প্রকরণে সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন সিদ্ধহস্ত, প্রতিকৃতি আনিসুজ্জামান সোহেলসৈয়দ শামসুল হক: এটা হচ্ছে আমার লেখার অভ্যেস, দীর্ঘদিনের, আমি যেকোনো লেখা অনেক দিন ধরে ভাবি, বিশেষ করে গদ্য; গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক এইগুলো। কবিতার ব্যাপারে একটা ছক থাকে সেটা একটু একটু করে কাজ করি, রেখে দেই, আবার লিখি, কবিতা নির্মাণ-প্রক্রিয়া আলাদা, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ভাবি, লিখতে আমার কম সময় লাগে। কারণ ভেবে রাখার কারণে তখন আমার পুরোটা লেখা দ্রুত হয়ে যায়। এটা একেক জনের একেক রকম অভ্যেস। অনেকে লিখতে লিখতে চরিত্র নির্মাণ করেন, আমি এদের দলে না। এই যে এখন ‘কালি ও কলম’-এ আমার নদী কারো নয় নামে যে উপন্যাসটি বেরুচ্ছে, এটার চিন্তাবীজ ষাট বছর আগের।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ষাট বছর!

সৈয়দ শামসুল হক: ষাট বছর, ফিফটি থ্রি-তে প্রথম এটা মাথায় আসে যে, এ ধরনের আবহের উপরে একটা কিছু লেখা যায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তো, চিন্তাবীজ বলেন আপনি এটাকে?

সৈয়দ শামসুল হক: হ্যাঁ চিন্তাবীজ। ধরো ষাট বছর ধরে এটাকে আমি লেখার জন্য মাথায় রেখেছি, আমার কখনোই মনে হয় নি যে এটা ঠিক লেখার জন্য সব রসদ আমার মাথায় তৈরি হয়ে গেছে, এই বছর-দুই আগে হঠাৎ করেই মনে হলো যে, নাহ! এবার বোধ হয় লিখে ফেলা যায়! আর তখন এক আকস্মিক যোগাযোগ, কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত আমাকে বললেন, হক ভাই, ধারাবাহিক একটা উপন্যাস লিখবেন কিনা! তো উনাকে যখন বললাম, অবাক হয়ে গেল বললেন, এত দীর্ঘদিন পর লিখছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি তো এমন জমিয়ে রাখি। তো এখন লিখছি এটা সহ আরেকটা ধারাবাহিক উপন্যাস, কালের খেয়ায় ছাপা হচ্ছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার গদ্য পড়তে পড়তে আমার মনে হয় আপনি এই আঠালো আকর্ষক গদ্যভঙ্গি কই পেলেন! কবির গদ্য কেমন হবে বলে মনে করেন হক ভাই?

সৈয়দ শামসুল হক: আমি যেটা বলি, যিনি কবি তার গদ্যও কিন্তু তার কবিতার মতো হবে। আমার কাছে মনে হয়, যদি কোনো কবির গদ্য দুর্বল হয় তবে আমার একটা সন্দেহ হবে তার কবিতার ভাষা তার কবিতার স্বর বোধ হয় ততটা নিজের নয় যতটা তিনি জাঁক করে বলেন বা লোকে যতটা মনে করে! শুধু গদ্য বা পদ্য বা প্রবন্ধ নয়, সামগ্রিকভাবে, ভাষাকে নিয়ে কাজ করতে হলে ভাষাকে জানতে হবে, এবং তার সর্বোচ্চ, সর্বোত্তম, সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করতে হবে। দক্ষতার সাথে। গল্প বা উপন্যাস লিখতে গিয়ে শুধু চলতি, ভাসা ভাসা ভাষাজ্ঞান দিয়ে লিখে যাব, হ্যাঁ ঠিক আছে একটা গল্প হয়তো দাঁড়াবে, কিন্তু টিকবে না, মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খেলারাম খেলে যা কিংবা মৃগয়ায় কালক্ষেপণ কিংবা স্তব্ধতার অনুবাদ, এই যে তিনটি উপন্যাসের কথা বললাম, আপনার এই গদ্যটাকে আমি বলি সান্দ্র গদ্য, দীর্ঘ বাক্যেও সরলতা মাখা যেন…

সৈয়দ শামসুল হক: আমার গদ্য নিয়ে তুমিই তো বলে দিচ্ছ, আমি আর কী বলব!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হক ভাই, আমি জানতে চাই, এই গদ্যটাকে আপনি আবিষ্কার করলেন কবে প্রথম?

সৈয়দ শামসুল হক: আমার লেখক জীবনের প্রথম বিশ বছর আমি প্রায় কিছু না জেনেই ভাষা প্রয়োগ করেছি। এটা হঠাৎ কখন কিভাবে হয়েছে তা নয়, বিশ বছর পর আসলে গদ্যটা দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে বোধটা তো জাগ্রত হয়, দেখি উপকরণ নিয়ে কী কী করা যায় এমন ক্রমশ চেষ্টায়। সব উপকরণকে ঠিক চিনি কিনা জানি কিনা এমন দেখতে দেখতেই হয়। একটা কাঠ নিয়ে যে কাঠমিস্ত্রি কাজ করে, হ্যাঁ, ঠিক আছে, সব মিস্ত্রিই কাজ করছে, কোনো কোনো মিস্ত্রি জানে কোন কাঠের আঁশটা ঠিক কেমন! কোন কাঠে কোন কাজটা ভালো হয়! ম্যাটেরিয়ালটা জানতে হয়। আমি গদ্য লিখি আমার মতো। এখন আমার গদ্যকে তুমি যদি সান্দ্র গদ্য বলো, সেটা তো তোমার অধিকার আছেই বলবার। তোমার কাছে যেটা মনে হয় সেটা বলবে না কেন! তবে আমি যেটা লিখি, আমি আমার চিন্তার সমান্তরাল একটা ভাষা তৈরি করতে চেয়েছি। আসলে আমরা চিন্তা করি তো ভাষাতেই। ভাষাহীন কোনো চিন্তা নাই, ভাবনা নাই, এমনকি যে শিল্পী অন্য মাধ্যমে কাজ করেন তাকেও ভাষা দিয়েই ভাবতে হয়। আর ভাবনাটাকে যখন সাহিত্যে আনা যায় তখন ভাষাটাকেও চিন্তার সমান্তরালে আনা যায়। রাজা রামমোহন রায়ের আগে বাংলা গদ্য অত্যন্ত দুর্বল ছিল, রাজা রামমোহন রায়কে যে কথাগুলি বলতে হয়েছে লিখতে হয়েছে সে কথাগুলি তৈরি করতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকেও করতে হয়েছে, বড় সমস্ত মানুষকেই এটা করতে হয়েছে। ছোট পর্যায়ে হয়তো নিজের জন্য আমাকেও এই কাজটিই করতে হয়েছে। এখনো হচ্ছে, এখনো শিখছি, এখনো ভাষা তৈরি করছি।

সৈয়দ শামসুল হকের লেখা বইশিমুল সালাহ্উদ্দিন: হক ভাই, ১৯৮০ সালে বেরিয়েছে আপনার বহুল পঠিত কাব্যগ্রন্থ পরানের গহীন ভিতর। ‘জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক / চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশাহ’র মোহর / মানুষ বেকুব চুপ; হাটবারে সক্কলে দেখুক / কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর / চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও / বুকের ভিতর থিকা পিরিতের পুন্নিমার চান’ -এই যে কবিতা, কবিতার উচ্চারণ, এটাকে কি আপনি আপনার কবিতার স্বাতন্ত্র্য মনে করেন? পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-তেও এমন উচ্চারণ বা শব্দাবলি ব্যবহার করেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক: কবিতা মানে কি জানো, কবিতা হচ্ছে কানে শোনার জিনিস। ছাপার অক্ষরে যেটা লিখি সেটা শুধু মনে রাখার জন্যে, বা স্থায়িত্ব দেবার জন্য যে এটা থেকে যাক, কিন্তু কবিতা তখনই কবিতা যখন তা উচ্চারিত হয়। কবিতা আমার কাছে যেভাবে আসে, বা যেভাবে আমি পাই, বা যেভাবে আমি ধরি, সেটা কেবলি উচ্চারণের মাধ্যমে। আর আমি কবিতা পড়ি, পড়তে চাই মুখোমুখি, শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে, বই বিক্রি হচ্ছে হোক, ভালো কথা, কিন্তু কবিতা উচ্চারণের মধ্য দিয়েই কবিতা। যারা আমার কবিতার বই কিনছে তাদের আমি বলি যে, তারা আমার বই কিনে জানালার ধারে নিরিবিলি নীরবে উচ্চারণ না করে পড়ছে তবে পুরো কবিতাটির স্বাদ গ্রহণ করা হবে না, উচ্চারণ করে আবৃত্তি করে পড়তে হবে। উচ্চারণেই কবিতার মুক্তি। আমি খুবই আগ্রহ বোধ করি সবার সামনে কবিতা পড়তে। সবার মধ্যে, সমাবেশে কবিতা পড়তে। আমি বেশকিছু অনুষ্ঠান করেছি একক আবৃত্তি, আমার, এখনো আমি এই বয়সেও, দেড় ঘণ্টা আমি একটানা কবিতা আবৃত্তি করতে পারি। এখন তো বসে আছি, পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আমি দেড় ঘণ্টা আবৃত্তি করতে পারি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: চমৎকার!

সৈয়দ শামসুল হক: কারণ আমি জানি, আমি যেহেতু কবিতা লিখি, আমাকেই পৌঁছুতে হবে কবিতা, আর মরমে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় উচ্চারণ, এবং আমি যেভাবে শুনেছি লেখার সময়, সেভাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি লিখেছেন ‘কবিকে কখনো খুব কাছে নিও না তোমার, দিও না দরোজা খুলে তোমার বাড়ির’, আর আপনার সময়ের প্রধান কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘কবিকে দিও না দুঃখ, দুঃখ দিলে সে জলে স্থলে ও হাওয়ায় হাওয়ায় বুনে দেবে দুঃখের অক্ষর’। ঘটনার পরম্পরা আলাদা, কিন্তু দুটি অক্ষরবৃত্তের কবিতাতেই কেন্দ্রীয় বিষয় কবি সহানুভূতিশীল। কবি শামসুর রাহমান, এ শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের, যাকে আপনি ঘনিষ্ঠজন বলে নিজের লেখার বিবৃত করেছেন, শুরুতে আপনাদের বেড়ে ওঠা, সে সময়ের আড্ডার কথা জানতে চাই।

সৈয়দ শামসুল হক: তুমিও কবিতা লেখ শিমুল, তুমি জানো, কবিতা ধার করে লেখা যায় না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি ধার করার কথা বলি নি হক ভাই! একদম বলি নি।

সৈয়দ শামসুল হক: কবিতা এমন, অন্য কারো অভিজ্ঞতা শুনেও লেখা যায় না। কাঁচা লেখক অন্যের কাছে একটা গল্প শুনে গল্পটি লিখতে পারেন, কিন্তু কবিকে ভেতর থেকে অনুভব করে লিখতে হয়। আমার যে তিন খণ্ড কবিতাসমগ্র তার মধ্যে অসংখ্য কবিতা আছে কবি এবং কবিতাকে নিয়ে। সম্ভবত বাংলাদেশে আর কোনো কবি, কবি এবং কবিতাকে নিয়ে এত কবিতা লেখেন নি। আর ‘কবিকে দিও না দুঃখ’তে শামসুর রাহমানের অভিজ্ঞতা শামসুর রাহমানের, ‘কবিকে খুব কাছে নিয়ো না তোমার’ এর অভিজ্ঞতা আমার। আমি তো দুঃখের কথা বলছি না, আমি বলছি তাকে যদি কাছে টেনে নাও তাহলে তোমার এই এই ক্ষতিই হয়ে যাবে। এবং বলেছি, তোমার যে-পথে সাহস নেই যাবার সেই পথেই কবিকে তুমি যেতে দিও। তোমার যে ভার বইবার ক্ষমতা নেই, কবিকে তুমি সেই ভার দিও। এবং এ কাজটাই কিন্তু সমাজ প্রতিনিয়ত করছে। এটা যতটা না ব্যক্তিগত তার চেয়ে বেশি কবির সামাজিক অবস্থানগত, ঐতিহাসিক অবস্থানগত। যে কবিকেই সবসময় অগ্রপথিকের ভারটা বহন করতে হয়েছে। এটা বোঝা যায় না বাইরে থেকে, কবিকে মনে হতে পারে উদ্ভ্রান্ত, বেভুল, উদাসীন। কিন্তু আদতে তা নয়, কবি অনেক গভীরে কাজ করেন। একটি জনগোষ্ঠী, একটি ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতিকে কবি আকার দেন। কবিদের তো এখন দ্বীপবাসীর মতো করে দেখা হয়, একদম আলাদা করে, তা তো নয়, কবি ইজ ভেরি মাচ ইন্টেগ্রেটেড টু ন্যাশনাল লাইফ অ্যান্ড ইন পলিটিকাল লাইফ।

১৯৮৪ সালে একুশে পদক পেয়েছেন সৈয়দ শামসুল হকশিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলাদেশের যে চিত্রকলা তার দ্বিতীয় দশকে শিল্পীদের প্রচণ্ড ঘনিষ্ঠ আপনি। বাংলাদেশের চিত্রকলা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?

সৈয়দ শামসুল হক: এটা সবাই জানে আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের অধিকাংশই চিত্রকর। একেবারে এদেশের চারুকলা পাঠ শুরুর সময়টার অগ্রপথিক চিত্রকররাই আমার বন্ধু। সেই প্রথম যারা ছবি আঁকতে শুরু করেন সেই আমিনুল, কিবরিয়া, দেবদাস, মুর্তাজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী, নিতুন কুণ্ডু, বাসেত, রাজ্জাক, এমদাদ, কত নাম বলব! এরা আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, কারো সঙ্গে হয়তো একটু বেশি ঘনিষ্ঠ, কারো সঙ্গে এতটা নয়, কিন্তু আন্তরিকতার দিক দিয়ে সকলেই আমার সঙ্গে গাঢ় সম্পর্কে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রাণশক্তি অপার। খুব ভালো অবস্থা এখন বাংলাদেশের শিল্পকলার। বাংলাদেশের যারা চিত্রকর রয়েছেন এ সময়ে, আমি নিয়মিত প্রদর্শনীগুলো দেখি তো, তারা অনেক বেশি ভাইব্র্যান্ট, এনার্জেটিক, এক্সপেরিমেন্টাল। প্রচণ্ড পরিশ্রমও করছে তারা। একটা কিছু তো বেরুবেই এখান থেকে। সারাবিশ্ব খুব দ্রুতই টের পাবে। এবং বাংলাদেশে চিত্রশিল্প একটা সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বাঙালির কাছে পেইন্টিং হ্যাজ বিকাম এ পার্ট অব দেয়ার লাইফ। আমাদের সংগ্রাহক বেড়েছে, গ্যালারি বেড়েছে, পৃষ্ঠপোষকতা বেড়েছে। ঘরে ঘরে ছবি রাখার প্রবণতা বেড়েছে, ছবির রিপ্রোডাকশন হচ্ছে। এটা খুব ভালো একটা প্রচেষ্টা চলছে বলা যেতে পারে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সর্বশেষ প্রশ্ন হক ভাই, বাংলাদেশের আলো হাওয়ার আপনার লেখালেখি। যেমন বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেন তার সাথে প্রাপ্তির মিল কতটুকু আসলে?

সৈয়দ শামসুল হক: বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি কেন, এ দেশের প্রতিটি মানুষের মনে একটা স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে আমরা কে কতটা কাজ করছি, প্রশ্ন হচ্ছে সেটাই। আমাদের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে যে, আমরা অধৈর্য হয়ে পড়ি। আর মনে করি ভালো কাজের দায়িত্বটা আরেক জনের। কিছুই হচ্ছে না কিছুই পাচ্ছি না বলে দৌড়চ্ছি আমরা নিজে কিছু না করেই, এটাই সমস্যা। আরে! তুমি কী করছ! এ গেল একটা সমস্যার কথা, দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকের একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করা উচিত এই মাটিকে আমার উচ্চাশার মাটি মনে করি কিনা! নাকি এই মাটির বাইরে অন্য কোনো মাটি আছে, সেইদিকে আমার চোখ পড়ে আছে! সেই দিকে যাওয়ার জন্যে আমার মন ছটফট করে যাচ্ছে! জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ার জন্য আঁকু-পাঁকু করছি কিনা আমি, ডুবন্ত জাহাজ মনে করছি কিনা বাংলাদেশকে আমি! এই আত্মজিজ্ঞাসা করলেই বেরিয়ে আসবে আমরা কিভাবে দেখছি দেশকে। এই ভাষা আমার উচ্চাশার ভাষা কিনা! যে ভাষায় আমি কাজ করি! যে ভাষায় আমি কথা বলছি এই ভাষাকে আমি আমার উচ্চাশার ভাষা বলে বিশ্বাস করি কি? বাঙালি কেন পৃথিবীর কোনো মানুষেরই স্বপ্ন মলিন নয়, কোনো মানুষের স্বপ্নই আবার পূর্ণ বাস্তবায়িতও হয় না। বাস্তবায়িত হবার পথে নতুন স্বপ্ন এসে যুক্ত হয়। এটাই হচ্ছে বিবর্তন, স্বপ্নের বিবর্তন। যে স্বপ্ন নিয়ে আমার বাবা সংসার করে গেছেন সেই স্বপ্ন তো আমি বদলে ফেলেছি। কিন্তু এই প্রজন্মান্তরের ভিন্নতার ভেতর যদি এতটাই ভিন্ন হয় যে সে তার জন্মসূত্রকেই অস্বীকার করে, তার ভাষাসূত্রকে সে অস্বীকার করে, সে যদি তার সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে অস্বীকার করে, সেইটাই আতঙ্কের। এবং সেইটা এইমুহূর্তে বাংলাদেশে ঘটবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ মুহূর্তে দেশ যে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বপ্ন বাস্তবায়ন পরে, বিপন্ন অবস্থার মধ্যে দুটি মাত্র সূত্র, একটু আগে যেটি বললাম, এই মাটিকে বিশ্বাস করতে হবে, যে এ আমার উচ্চাশার ভূমি, আর দ্বিতীয়টি এই ভাষা আমার উচ্চাশার ভাষা। এ দুটো পরিষ্কার হতে হবে আগে, তারপর অন্য কিছু।

কবিতার ধ্রুপদী আঙ্গিক কাব্যনাট্যে সৈয়দ শামসুল হক একমেবাদ্বিতীয়মশিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ হক ভাই। ২৭ ডিসেম্বর আপনার জন্মদিন। আগাম শুভেচ্ছা রইল। জন্মদিনে আপনি আপনার ভক্ত, আপনার দেশের মানুষদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

সৈয়দ শামসুল হক: তাদের উদ্দেশ্যে বলি, এই এতদিন লিখেছি, ভালো ছাড়া মন্দ কথা বলি নি, এবং আমি চলে যাবার পরে এই ভালোটুকু যেন মানুষের মনে কিছু না কিছু থেকে যায়। এটুকুই চাওয়া, দেশের কাছে, মানুষের কাছে, আর কিচ্ছু না। আমি একটা ঋণ শোধ করে গেলাম। যে-দেশের যে-সমাজের মাটিতে, হাওয়ায় আমি নিশ্বাস নিয়েছি, যারা আমাকে বড় করে তুলেছে, পালন করেছে, একটা ঋণ তো হয়েই গেল, আমি আমার কাজের ভেতর দিয়ে সেই ঋণটা শোধ করে যাবার চেষ্টা করেছি। আর এই যে ঋণটা আমি শোধ করতে পেরেছি, এইটে যদি এ দেশের মানুষ বোঝে তাহলেই আমি ধন্য। তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ, আলাপের শুরুটা বদলে দিও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না হক ভাই, রেকর্ডে যা আছে তাই থাকবে। থ্যাংকিউ, ভালো থাকবেন।

 

সৈয়দ শামসুল হক
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    বিদায় নেবেন কর্মীরা, ৩৭০ বিষধর সাপের কী হবে

    বিদায় নেবেন কর্মীরা, ৩৭০ বিষধর সাপের কী হবে

    হাসিনার বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে বাংলাদেশ-ভারত, আশা যুক্তরাষ্ট্রের

    হাসিনার বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে বাংলাদেশ-ভারত, আশা যুক্তরাষ্ট্রের

    সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ১৩ প্রার্থী চূড়ান্ত, কে কোথায়

    সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ১৩ প্রার্থী চূড়ান্ত, কে কোথায়

    প্রশাসকরাই পাচ্ছেন বিএনপির সবুজ সংকেত

    প্রশাসকরাই পাচ্ছেন বিএনপির সবুজ সংকেত

    দুই কিডনি ছিল অকেজো, মায়ের স্বপ্ন পূরণে মৃত্যুকে হারিয়ে জজ হলেন তাইজুল

    দুই কিডনি ছিল অকেজো, মায়ের স্বপ্ন পূরণে মৃত্যুকে হারিয়ে জজ হলেন তাইজুল

    কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পঞ্চগড়ে

    কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পঞ্চগড়ে

    জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যসহ আটক অর্ধশতাধিক

    জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যসহ আটক অর্ধশতাধিক

    বান্দরবানের ৪ প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ ফ্রি

    বান্দরবানের ৪ প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ ফ্রি

    তাদের জন্মই হয়নি তবু জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ

    তাদের জন্মই হয়নি তবু জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুসনদ

    বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক

    বরিশালে নাশকতার বৈঠকের অভিযোগে আ.লীগের ১২ নেতাকর্মী আটক

    মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, মামলা বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

    মধ্যরাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, মামলা বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

    পুলিশে ‘ফ্যাসিবাদের’ চর, কড়া হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

    পুলিশে ‘ফ্যাসিবাদের’ চর, কড়া হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

    সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর

    সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর

    ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, হাতবোমা বিস্ফোরণ

    ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, হাতবোমা বিস্ফোরণ

    ভেরিফিকেশন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই : মন্ত্রণালয়

    ভেরিফিকেশন নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই : মন্ত্রণালয়