লেখককে এখনকার চাহিদা বুঝতে হবে : ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম : ৩০ অক্টোবর, ১৯৫৮)
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা প্রকাশনা জগতের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক এবং প্রকাশনা শিল্পের সংগঠক। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকা ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকা সম্পাদনা ও বই প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করে চলেছেন। জনপ্রিয় বিজ্ঞানী-গোয়েন্দা চরিত্র ‘জগুমামা’র স্রষ্টা হিসেবে যেমন পাঠকের কাছে পরিচিত, তেমনি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘পত্রভারতী’ এবং কলকাতা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের নেতৃত্বেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলা বইয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, দুই বাংলার প্রকাশনা শিল্প, নতুন প্রজন্মের পাঠাভ্যাস এবং লেখালেখির নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‘আগামীর সময়’-এর সহকারী বার্তা সম্পাদক অঞ্জন আচার্য।
আগামীর সময়: আপনি একাধারে লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক এবং প্রকাশনা শিল্পের সংগঠক। এই চারটি পরিচয়ের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে কঠিন? আবার কোন পরিচয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: আমি একসঙ্গে অনেক কিছু। বলতে পারো, ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস, মাস্টার অফ নান’। তবে এর মধ্যে কঠিন হচ্ছে, প্রকাশন শিল্পের সংগঠক হওয়াটা। কারণ এখানে অনেক রকম জটিলতা। বিভিন্ন স্তর, বিভিন্ন ধরনের প্রকাশক— সাধুতা, অসাধুতা, তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, তাদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করা বড় কঠিন কাজ। প্রকাশনা শিল্প অত্যন্ত মহান একটি শিল্প। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মৃতি বিজড়িত এই শিল্প। সেই শিল্পের মধ্যে বর্তমানে এত রকম জটিলতা হয়েছে, এটা আমার কাছে খুব পীড়াদায়ক। এটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়াটাও খুব চ্যালেঞ্জিং। ব্যক্তিগতভাবে আমি অবশ্য মনে করি এগুলো কোনোটাই থাকবে না। যে পরিচয়টা থাকবে, সেটা হচ্ছে আমার লেখক পরিচয়। আমার বাবা দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন ১৯৯৫ সালে। আজও আমি বিভিন্ন জায়গায় যখন শুনি ‘ও আপনি ত্রিদিববাবু, দুরন্ত ঈগলের স্রষ্টার ছেলে?’—এই পরিচয়টা আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আগামীর সময়: আপনার বাবা দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা কিশোর সাহিত্যের এক কিংবদন্তি। তার উত্তরাধিকার বহন করার ক্ষেত্রে কখনও কি বাড়তি চাপ অনুভব করেছেন? নাকি সেটিই আপনাকে নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র হওয়ার দারুণ সুবিধে আছে, আবার ভয়ঙ্কর অসুবিধে আছে। সুবিধে হল, বাবা বিখ্যাত হওয়ায় আমার পরিচিত হওয়ার চাপ নেই। অসুবিধে হল, দুরন্ত ঈগল আমার পক্ষে তো কোনোদিন লেখা সম্ভব হবে না। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ক্লাসিক্স। এমন একজন মানুষের পুত্রের ওই পর্যায়ের লেখক হওয়া অসম্ভব! আবার বাবার যে পরিচয়গুলো ছিল না, সেইসব পরিচয়গুলো আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সে কারণে হয়তো বাবার থেকে বেশি লোক আমাকে চেনেন।
বাবা আমাকে হাতে ধরে লেখা শিখিয়েছেন। এটা অনুপ্রাণিত করেছে। বাবা আমার লেখা একের পর এক অমনোনীত করেছেন, নিজে এডিট করে লেখা কীভাবে লিখতে হয় সেটি দেখিয়েছেন। বাবাকে অনুসরণ করে আমার প্রথম লেখালেখি শুরু। অদ্ভুত একটা সময় গেছে আমার।
আগামীর সময়: ‘কিশোর ভারতী’ কয়েক প্রজন্মের পাঠক তৈরি করেছে। কিন্তু আজকের শিশু-কিশোরেরা মোবাইল ফোন, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বেড়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কিশোর সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখতে কী ধরনের নতুন ভাবনা জরুরি বলে মনে করেন?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: নতুন ভাবনা মানে যুগোপযোগী। কিশোর ভারতীকে তো সেটা করতেই হচ্ছে। আজ ৫৯ বছর বয়স হতে চলল একটা পত্রিকার। আমিও ৬৮ পেরিয়ে ৬৯-এ পা দেবো, কিশোর ভারতী ৫৯ বছরে পা দেবে। আমার যখন ১০-১১ বছর বয়স, তখন এই পত্রিকার জন্ম। তখনকার পত্রিকার কনটেন্ট, পত্রিকার স্টাইল— ইউটিউব নেই, কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নেই… তখনকার পত্রিকায় বেশি ছিল বিভিন্নরকম ফিচার। সেই ফিচারগুলো কমিয়ে এখন গল্পের ওপর জোর দিতে হচ্ছে, বিশেষ বিশেষ জঁরের লেখার ওপর জোর দিতে হচ্ছে। আর যেটা আমার সবসময় মনে হচ্ছে, লেখক-সম্পাদক জগতে নতুন রক্ত সঞ্চারিত হওয়া উচিত। আমাদের এডিটোরিয়ালে এখন যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু নতুন ছেলেমেয়ে। এসেছে লেখার জগতেও। তাদের ভাবনা, তাদের ভাষা, তাদের উপস্থাপনা অনেকটাই আমাদের সময়ের থেকে আলাদা। সেই অর্থে আমরা ব্যাকডেটেড হয়ে পড়েছি। ভাষার কারুকার্য পাল্টে গেছে, উপস্থাপনা পাল্টে গেছে। এভাবেই যুগোপযোগী করতে হচ্ছে। আশা করা যায়, লেখার বিষয়বস্তু যদি যুগোপযোগী করা যায়, তাহলে আজকের ছেলেমেয়েরা সেটা গ্রহণ করবে।
আগামীর সময়: আপনার সৃষ্ট বিজ্ঞানী-গোয়েন্দা জগুমামা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র। এত বছর পরও চরিত্রটি পাঠকের কাছে কেন এত গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন? জগুমামাকে নিয়ে কি এখনও এমন কোনো গল্প লেখা বাকি, যা আপনি লিখতে চান?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: জগুমামাকে নিয়ে প্রচুর লিখেছি। হয়তো আরও কয়েকটা লিখব। আমিও ভাবি, অবাক হই, আমার জগুমামাকে কী করে এখনো ছেলেমেয়েরা গ্রহণ করে! এখনো জগুমামার সেট ছেলেমেয়েরা কিনছে। এটা আমার কাছে সত্যি অদ্ভুত লাগে। মনে হয়, আমি সেই প্রজন্মের থেকে হয়তো খানিকটা এগিয়ে লিখতে পেরেছিলাম। এত বছর পরেও— মানে আমি যখন জগুমামা লিখতে শুরু করি, তখন আমার ২৭ বছর বয়স, আর আজকে আমার ৬৮। তার মানে প্রায় ৪১ বছর হয়ে গেল। এই ৪০-৪১ বছরে ভাষা পাল্টে গেছে, উপস্থাপনা পাল্টে গেছে, জগুমামাকে তবু মানুষ মনে রেখেছে। যেভাবে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেলকে মনে রেখেছে, যেভাবে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদাকে মনে রেখেছে। আমার বিশ্বাস মডার্ন ভাষায়, মডার্ন উপস্থাপনায় যদি প্লেস করা যায়, তাহলে সেই সাহিত্যের মৃত্যু ঘটে না। সেটা কিশোরদেরই হোক বা বড়দের।
আগামীর সময়: আপনি দীর্ঘদিন ধরে ‘পত্রভারতী’ পরিচালনা করছেন। বর্তমানে বাংলা প্রকাশনা শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট কী? কাগজের দাম, পাইরেসি, অনলাইন বিক্রি, নাকি পাঠকের পরিবর্তিত অভ্যাস?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: আমি এ বিষয়টা একটুও চ্যালেঞ্জিং মনে করি না। পত্রভারতী আজ থেকে ৩০ বছর আগে যে জায়গায় ছিল, আজকে পত্রভারতী অনেক উপরে উঠে এসেছে পাঠকদের শুভেচ্ছায়, ভালোবাসায়। যদি সাহিত্যের গুণগত মান ঠিক থাকে, পাঠকের চাহিদার সঙ্গে আমরা তাল মেলাতে পারি এবং অনলাইন বা অফলাইন সব জায়গায় পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারি, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি কেউ রুখতে পারবে না। ‘পত্রভারতী’ তার প্রমাণ।
পত্রভারতীতে এখন আমার পরবর্তী প্রজন্ম যুক্ত হয়েছে। আমার ছোট মেয়ে অন্বেষা পুরোপুরি পত্রভারতী দেখে— তার মার্কেটিং, তার কনটেন্ট ও প্রোডাকশনের একটা অংশও সে দেখে। তার টিম আছে। নবীন-প্রবীণ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সেই অনুযায়ী পত্রভারতী এগোতে পারছে। তবে যেসব প্রকাশনায় পরের প্রজন্ম আসেনি, সেসব প্রকাশনা রক্তশূন্যতায় ভুগছে।
আগামীর সময়: কলকাতা এবং বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের মধ্যে সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন? দুই বাংলার লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মধ্যে আদান-প্রদান বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: কলকাতা এবং ঢাকার প্রকাশন জগতের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আমি কলকাতা, ঢাকা এমনকী আগরতলা-ত্রিপুরার অংশও ধরছি। যেটা আমার মনে হয়েছে, দুপারের সাহিত্য দুপারে আলাদা করে প্রকাশিত হলে তার মর্যাদা বাড়ে। আমরা যেমন হুমায়ূন আহমেদ, সাদাত হোসাইন, হরিশংকর জলদাস, এম. জে. বাবু প্রমুখের বই বের করেছি। কিছু কিছু বই ভালো চলেছে, কিছু কিছু বই চলেনি। দুই বাংলার পাঠকদের রুচির তফাৎ আছে। তাদের ভাবনারও তফাৎ তৈরি হয়েছে। এ সত্ত্বেও আমাদের দুই বাংলার সাহিত্যে ভাষার যে মেলবন্ধন আছে, সেটা এতটাই শক্ত, একপারের সাহিত্য অন্যপারে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছে। যেমন হুমায়ূন আহমেদের বইগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে। তারপরেও এখানে বিক্রি হচ্ছে। এটা তো আনন্দের কথা।
আগামীর সময়: আপনি কলকাতা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক বইমেলার অভিজ্ঞতা থেকে আপনার কী মনে হয়, বাংলা বইকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি কোথায়?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হচ্ছে, বাংলা বইয়ের সেইভাবে যথাযথ ট্রান্সলেশন হয়নি। যে বইগুলোর আন্তর্জাতিক স্তরে চাহিদা থাকতে পারে সেগুলো অনুবাদ হয়নি। যেমন: দেশভাগ বা দাঙ্গা নিয়ে যে সাহিত্য— এই বইগুলো তো সারা বিশ্বের পাঠকের কাছে আগ্রহ সৃষ্টি করবে। এছাড়া আমাদের যে মিথোলজি রয়েছে, সেই মিথোলজি নিয়ে অজস্র ফিকশন লেখা হয়েছে। এগুলোরও যথাযথ ট্রান্সলেশন হয়নি। আমরা ইংরেজিতে মার্কেজের ট্রান্সলেশন পাই, যেটা পড়লে আমরা লাতিন আমেরিকার স্বাদ বুঝতে পারি। বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
আগামীর সময়: সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ই-বুক এবং অডিও বুক প্রকাশনা জগতে বড় পরিবর্তন আনছে। আপনি কি এটিকে বাংলা বইয়ের জন্য নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন, নাকি এটি মুদ্রিত বইয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: কেউ কারোর চ্যালেঞ্জ নয়। প্রথম যেটাই আসে, তখনই মনে হয়, সর্বনাশ হয়ে গেল। এআই কোনো দিন আমাদের ক্রিয়েটিভ লিটারেচারের রিপ্লেসমেন্ট হতে পারবে না। হয়তো সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে কাজ করতে পারবে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু আমাকে এআই দিয়ে লিখে পাঠাল। মানে, এআই-কে বলেছে তুমি আমাকে একটা প্রবন্ধ লিখে দাও। সে বলল, এইটা দেখো, এআই প্রবন্ধটা লিখেছে। আমি সেটা আবার এডিট করে তাকে পাঠালাম। দেখে আমার মজাই লাগল।
এই নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কতগুলো স্টাইল রয়েছে। লেখকের স্টাইলটা আগে এআইকে ফিড করিয়ে দিতে হয়। লেখকদের বিভিন্ন লেখার ক্লিপিং দিয়ে সেটি সেট করতে হয়। তারপরে এআইকে পাঠালে এআই লিখতে পারে। কিন্তু সেই লেখাটা আবার লেখককে ঘষামাজা করতে হবে। এআই একটা সাপোর্টিভ সিস্টেম হতে পারে। এআই বলো, চ্যাটজিপিটি— এগুলো সাপোর্টিভ সিস্টেম হতে পারে। দে ক্যান নট রিপ্লেস। তারা কোনো বিকল্প স্থান নিতে পারে না। ফলে ওটা নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই বলেই আমার মনে হয়।
আগামীর সময়: শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনার জন্য আপনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার থেকে শুরু করে নানা সম্মাননা পেয়েছেন। আজ যদি নতুন একজন লেখক শিশু-কিশোরদের জন্য লিখতে চান, তাহলে তার সবচেয়ে বেশি কোন বিষয়টির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: আমার সৌভাগ্য আমি রাষ্ট্রপতি সম্মান শুধু নয়, শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যাসাগর পুরস্কার এবং সাহিত্য আকাদেমির শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চিলড্রেন লিটারেচারে অল ইন্ডিয়া, সেখানেও বাংলায় আমি পুরস্কার পেয়েছি। এই দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে আমার মনে হয়েছে, সাহিত্যের প্রতি আমি সবচেয়ে কম নজর দিয়েছি। সেই আফসোস আমাকে কুরে কুরে খায়। প্রকাশনা শিল্পের সংগঠক বলো বা প্রকাশনা বলো বা কিশোর ভারতীর সম্পাদনা বলো, এগুলো আমার জীবনের অধিকাংশ সময় নিয়ে নিয়েছে।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়, লেখককে এখনকার ছেলেমেয়েদের চাহিদাটা বুঝতে হবে। এখনকার শিশু-কিশোর, এখনকার নতুন পাঠক, যারা ইয়াং, অ্যাডাল্ট লিটারেচার পড়তে চাইছে বা চিলড্রেন লিটারেচার পড়তে চাইছে, কী ধরনের লেখা পড়তে চাইছে সেটা বুঝতে হবে। কারণ তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে আছে। অনেক অ্যাডভান্সড ভাবনা-চিন্তা তাদের। সেই ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে লিখতে হলে, তাদের ভাবনার থেকে এগিয়ে যেতে হবে। সেটা খুব কঠিন কাজ। সেটা মাথায় রেখে এখন যারা সাহিত্য করতে আসবেন, তারা টিকতে পারবেন। না হলে জায়গা পাওয়া খুব কঠিন। আমাদের সময় যদিও বা সুবিধা ছিল, কিন্তু এখন একজন শিশু বা কিশোরের অবসর কাটানোর এত রকম এলিমেন্ট এসে গেছে, ফলে তাদের মনের কাছে পৌঁছানো বেশ কঠিন। তবে যদি তাদের সঙ্গে মিশে, তাদের ভাবনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলে কেন হবে না? নিশ্চয়ই হবে।
আগামীর সময়: এত দীর্ঘ সাহিত্য ও প্রকাশনা জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে যদি আপনাকে বলতে বলা হয়, বাংলা ভাষা ও বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় আশা কী, আর সবচেয়ে বড় উদ্বেগই বা কী?
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়: আমি অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ। আমি মনে করি, বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। নিজের চোখে আমি দেখেছি, আমারই একটি বই ‘লেখালেখির গল্প’— আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় টানা লিখে গেছি কোভিডের সময়। আমার কৈশোর, যৌবন, লেখকদের সঙ্গে আমার জীবনের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি নিয়ে; সেই বইটা যখন প্রকাশিত হল, তুমুল সাড়া ফেলে দিল। এখনো সে বইটা প্রচুর বিক্রি হয়। আমার অনেক স্মৃতি বিজড়িত গল্পও আছে বইটায়। খুব ভালো রেসপন্স পেয়েছি। সুতরাং, আমি উদ্বেগের কোনো কারণ দেখি না। সোশ্যাল মিডিয়া তার জায়গায় থাকবে। আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের মিডিয়া, তাদের জায়গায় থাকবে। বাংলা বা ইংরেজি বই যা-ই বলি, বই বইয়ের জায়গায় থাকবে।






