Agamir Somoy E-Paper
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
মানুষের বিপদে ছোটেন খলিল
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাহিত্য

সুধীন দত্ত: শঙ্কার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধ্রুপদি কবি

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:৩৮
শেয়ার করুন:
সুধীন দত্ত: শঙ্কার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধ্রুপদি কবি

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (৩০ অক্টোবর ১৯০১ – ২৫ জুন ১৯৬০)

“আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দু জনে সমান অংশীদার;
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,
আমাদের ’পরে দেনা শোধবার ভার।

তাই অসহ্য লাগে ও-আত্মরতি।
অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
আমাকে এড়িয়ে বাড়াও নিজেরই ক্ষতি।”

‘ক্রন্দসী’ কাব্যগ্রন্থের ‘উটপাখি’ কবিতার এই পঙক্তিগুলো পড়লেই বোঝা যায়, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠ কখনোই আর্ত বা আবেগভরা নয়—এটি এক শীতল, গণিতসম, অথচ গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠ। তিনি ‘ধ্বংসের দায়ভাগে’ দুই জনকে সমান অংশীদার বলে নিজেকেও দোষী সাব্যস্ত করেন, এবং শেষে সেই প্রশ্নটি ছুড়ে দেন যা তাঁর সমগ্র কাব্যদর্শনের সারকথা: “অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?”

এই একটি প্রশ্নেই যেন লুকিয়ে আছে সুধীন্দ্রনাথের সমস্ত বিদ্রোহ—ঈশ্বরের প্রতি, রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকারের প্রতি, এবং সেই সমস্ত সহজ সান্ত্বনার প্রতি যা মানুষের দুঃখকে ঢেকে রাখতে চায়। তাঁকে বাংলা কবিতায় ‘ধ্রুপদি রীতির প্রবর্তক’ বলা হয়, কিন্তু সেই ধ্রুপদিয়ানা কোনো আরামদায়ক শৃঙ্খলা নয়—এটি এক নির্মম সততার শৃঙ্খলা, যেখানে প্রতিটি শব্দ তার নিজের ওজনে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং প্রতিটি চিত্রকল্প যুক্তির কাটাতারে মাপা। তাঁর কবিতা সহজে পড়া যায় না, সহজে হজম করা যায় না, এবং সহজে ভোলাও যায় না—কারণ প্রতিটি পঙক্তিতে থাকে এক প্রশ্ন, যা পাঠককে তার নিজের অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহের প্রচ্ছদসুধীন্দ্রনাথের জন্ম ১৯০১ সালের ৩০ অক্টোবর, কলকাতার হাতিবাগানে, এক অভিজাত ও শিক্ষাব্রতী পরিবারে। তার পিতা হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন আইনজ্ঞ, বৈদান্তিক দার্শনিক, থিওসফিস্ট এবং জাতীয়তাবাদী—যার নাম ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের প্রচারপত্রে রবীন্দ্রনাথ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও বিপিনচন্দ্র পালের পাশে জ্বলজ্বল করত। মা ইন্দুমতি ছিলেন পটলডাঙার বিখ্যাত বসুমল্লিক পরিবারের মেয়ে। এই পারিবারিক ঐতিহ্যের সেই বুদ্ধিবাদী আবহ—পিতার প্রজ্ঞা, মায়ের ঔদার্য, এবং অভিজাত পরিবেশের সংস্কৃতচর্চা—সব মিলে সুধীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। তাঁর বাল্যকাল কেটেছে কাশীতে; ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি কাশীর থিওসফিক্যাল হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেন। পরে কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন (১৯১৮) এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯২২ সালে স্নাতক হন।

এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও আইন বিভাগে ভর্তি হন, কিন্তু ১৯২৪ সাল পর্যন্ত যথারীতি পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও কোনো বিষয়েই পরীক্ষা দেননি। এই অসমাপ্ত শিক্ষাজীবনকে অনেকে ব্যর্থতা বলে ভুল করেন, কিন্তু সুধীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক সচেতন প্রত্যাখ্যান— প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বহুভাষাবিদ্যার এক স্বশিক্ষিত পথ। ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষায় তাঁর বিশেষ দখল ছিল, এবং ফরাসি প্রতীকী কবি মালার্মের কাব্যাদর্শ তিনি অনুসরণ করেছিলেন—যা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। এই বহুভাষিকতা ও তত্ত্বাসক্তিই তাকে বাংলা কবিতায় এমন এক কণ্ঠ এনে দিয়েছিল, যা রবীন্দ্রনাথের সুরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বুদ্ধদেব বসু সুধীন প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “তাঁর মতো বিরাট প্রস্তুতি নিয়ে আর কেউ বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতে অগ্রসর হননি।”

কাব্যযাত্রা: তন্বী থেকে দশমী

১৯৩০ সালে ‘তন্বী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সুধীন্দ্রনাথের কাব্যযাত্রা শুরু হয়, যখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর। ‘তন্বী’ সম্পর্কে সমালোচকরা বলেছেন, এটি মূলত প্রেমের কবিতা—তবে সেই প্রেম কোনো কোমল রোমান্টিকতা নয়, বরং ইন্দ্রীয়-ভারাতুর প্রেম চেতনা। ‘তন্বী’র প্রেমিকার প্রতি আকর্ষণ, বেদনাবিদ্ধ স্মৃতিচারণ এবং রহস্যময়ী নারীর প্রতি টান—এসবই প্রথম যৌবনের আবেগপ্রবণতার প্রকাশ। কিন্তু এই কাব্যেই সুধীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ কণ্ঠস্বরের বীজ লুকিয়ে আছে: মৃত্যুর পর লীলা সঙ্গিনীর সঙ্গে চির মিলনের প্রত্যাশা—“তোমার প্রমোদ কুঞ্জে কি বৈতরণী তীরে, হে মোর ক্রন্দসী” —এই পঙক্তিতে যে ‘ক্রন্দসী’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছেন, সেটিই পরে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম হয়ে উঠেছে।

‘অর্কেস্ট্রা’ (১৯৩৫) থেকে সুধীন্দ্রনাথের স্বকীয়তার প্রকৃত প্রকাশ। এই কাব্যে মোট ২৫টি কবিতা, যার এগারোটি রচিত হয়েছিল তাঁর উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ ভ্রমণের সময়। ‘অর্কেস্ট্রা’ সম্পর্কে সমালোচকরা বলেছেন, এটি “আমাদের ভাষায় এক অনন্য বই” —এটি প্রেমের কবিতার বই, কিন্তু বৈষ্ণবদের আধ্যাত্মিক প্রেম নয়; এটি “একটি অন্ধ, হিংস্র এবং ভয়ংকর প্রেম”। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেমের ভেতরেই রয়েছে স্মৃতির যন্ত্রণা—যে যন্ত্রণা কবি সহ্য করতে পারেন না, আবার সময় সেই যন্ত্রণাকে মেরে ফেলবে এই ভাবনাও সহ্য করতে পারেন না।

অমিয় দেবের লেখা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের জীবনীগ্রন্থের প্রচ্ছদ‘ক্রন্দসী’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থটি ‘অর্কেস্ট্রা’-র প্রায় সমকালে রচিত হলেও দুটি কাব্য প্রায় বিপরীত মেরুর। ‘অর্কেস্ট্রা’-য় আছে ক্ষণস্থায়ী প্রেমের চিরস্থায়ী আর্তি, আর ‘ক্রন্দসী’-তে আছে রূঢ়, নিষ্ঠুর, হিংস্র-উন্মত্ত জগতের প্রতি কবির দৃষ্টিপাত—কখনো অসহিষ্ণু প্রতিবাদ, কখনো মর্মান্তিক হতাশা, কখনো বা নিঃফল স্বপ্ন। এই কাব্যের সবচেয়ে আলোচিত কবিতা ‘উটপাখি’—যার সম্পূর্ণ পাঠ নিচে দেওয়া হলো:

উটপাখি
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি?
কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে?

কোথায় লুকোবে?
ধু-ধু করে মরুভূমি; ক্ষ’য়ে-ক্ষ’য়ে ছায়া ম’রে গেছে পদতলে।
আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই;
নির্বাক, নীল, নির্মম মহাকাশ।
নিষাদের মন মায়ামৃগে ম’জে নেই;
তুমি বিনা তার সমুহ সর্বনাশ।
কোথায় পালাবে? ছুটবে বা আর কত?
উদাসীন বালি ঢাকবে না পদরেখা।

প্রাকপুরাণিক বাল্যবন্ধু যত বিগত সবাই,
তুমি অসহায় একা।।

ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে?
মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া।
অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?
কেবল শূণ্যে চলবে না আগাগোড়া।

তার চেয়ে আজ আমার যুক্তি মানো,
সিক্তাসাগরে সাধের তরণী হও;
মরুদ্বীপের খবর তুমিই জানো,
তুমি তো কখনো বিপদপ্রাজ্ঞ নও।

নব সংসার পাতি গে আবার, চলো
যে-কোনো নিভৃত কণ্টকাবৃত বনে।
মিলবে সেখানে অনন্ত নোনা জলও,
খসবে খেজুর মাটির আকর্শনে।।

কল্পলতার বেড়ার আড়ালে সেথা
গ’ড়ে তুলবো না লোহার চিড়িয়াখানা;
ডেকে আনবো না হাজার হাজার ক্রেতা
ছাঁটতে তোমার অনাবশ্যক ডানা।

ভূমিতে ছড়ালে অকারি পালকগুলি
শ্রমণশোভন বীজন বানাবো তাতে;
উধাও তাহার উড্ডীন পদধূলি
পুঙ্খে পুঙ্খে খুঁজবো না অমারাতে।

তোমার নিবিদে বাজাবো না ঝুমঝুমি,
নির্বোধ লোভে যাবে না ভাবনা মিশে;
সে-পাড়াজুড়ানো বুলবুলি নও তুমি
বর্গীর ধান খায় সে উনতিরিশে।।

আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দুজনে সমান অংশিদার
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,
আমাদের ‘পরে দেনা শোধবার ভার।
তাই অসহ্য লাগে ও-আত্মরতি।

অন্ধ হ’লে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
আমাকে এড়িয়ে বাড়াও নিজেরই ক্ষতি।
ভ্রান্তিবিলাস সাজেনা দুর্বিপাকে।
অতএব এসো আমরা সন্ধি ক’রে
প্রত্যুপকারে বিরোধী স্বার্থ সাধি :
তুমি নিয়ে চল আমাকে লোকোত্তরে,
তোমাকে বন্ধু আমি লোকায়তে বাঁধি।।

এই কবিতায় তিনি আত্মপ্রতারণার প্রতি এমন এক ধ্বংসাত্মক বিদ্রূপ হেনেছেন যা বাংলা কবিতায় বিরল। উটপাখি বালিতে মাথা গুঁজে ভাবে বিপদ নেই, কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ জানেন—“ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে? / মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া। / অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?”। এই ‘নিজেকে খাওয়া’র চিত্রকল্পটি এক অসাধারণ দ্বান্দ্বিকতা তৈরি করে—আত্মপ্রতারণা কেবল বাহ্যিক বিপদ থেকে রক্ষা করে না, এটি আত্মাকেই গ্রাস করে ফেলে। ‘ক্রন্দসী’-র আরেকটি কবিতা ‘মৃত্যু’তে তিনি লেখেন: “কাল রাতে এ-সংকীর্ণ সংসারের নির্বোধ সংঘাতে চীর্ণ, দীর্ণ হৃদয় আমার” —এখানে ‘সংকীর্ণ’, ‘নির্বোধ’, ‘চীর্ণ’, ‘দীর্ণ’—এই চারটি বিশেষণ একসঙ্গে বসিয়ে তিনি সংসারের সমস্ত অর্থহীনতা ও হৃদয়ের সমস্ত ক্ষতকে এক নিঃশ্বাসে ধরে ফেলেন যেনো।

‘দুঃসময়’ কবিতাটি ‘ক্রন্দসী’ কাব্যেরই অন্তর্গত, এবং এখানে জ্যোতিষশাস্ত্রের ‘অশ্লেষা’ নক্ষত্রকে ‘রাক্ষসী’ বলে অভিহিত করে তিনি ভাগ্যের নির্মমতাকে এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক রূপকল্পে বেঁধে ফেলেন:

দুঃসময়
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

মোদের সাক্ষাৎ হল অশ্লেষার রাক্ষসী বেলায়
সমুদ্যত দৈবদুর্বিপাকে।
আধো-জাগা অগ্নিগিরি আমাদের উদ্ধত হেলায়
সান্দ্রস্বরে কী অনিষ্ট হাঁকে;
বিচ্ছেদের খর খড়্গ কোথা যেন শাণায় অসুরে,
তারই প্রতিবিম্ব হেরি মুহুর্মুহু আকাশ মুকুরে,
বজ্রধ্বজ প্রভঞ্জন রথ রাখি অলক্ষ্যে, অদূরে
ফুৎকারিছে দিদ্বিজয়ী শাঁখে;
আসে নাই সন্ধিলগ্ন, তমা তবু কবরী এলায়
বৈধব্যের অকাল বিপাকে।।

জানো না কি, নিঃশঙ্কিনী, যদিও বা সত্য হয়
আজ আমাদের অবোধ স্বপন,
যদিও মার্জনা করে ঈর্ষ্যাপর ক্লীবের সমাজ
যুগলের অমর্ত্য মিলন,
তথাপি নিষ্ফল সবই; — আমাদেরই দুর্মর অতীত
অতর্কিত ভূকম্পনে বিনাশিবে বিশ্বাসের ভিত;
প্রেতাকুল ব্যবধানে সঞ্জীবনী বাহুর নিবীত ছিন্ন,
ভিন্ন হবে অনুক্ষণ;
অহৈতুক অপব্যয়, অনুচিত অর্চনার লাজ
আস্ফালিবে স্তব্ধ দুঃস্বপন।।

তবুও ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে একেবারে,
কায় মনে তোমারেই চাই;
জানি স্বর্গ মিথ্যা কথা, তথাপি অলীক বিধাতারে
রাত্রি-দিন মিনতি জানাই;
উন্মথি হৃদয়সিন্ধু সৃজনের প্রথম প্রভাতে
অভুঞ্জিত সুধাভাণ্ড অর্পিলাম মোহিনীর হাতে;
মৃত্যুর মাধুরী কিন্তু বাকি আছে, এসো আজ তাতে
আমাদের আমরা সাজাই;
অসাধ্য সিদ্ধির যুগ ফিরিবে না, জানি, এ সংসারে;
তবু রুদ্র ভবিষ্যতে চাই।।

আঁধার ঘনায় চোখে, তুমি ছাড়া কেউ নেই পাশে,
অন্তরীক্ষে জমে বিভীষিকা;
লুব্ধ ভবিতব্যতারে রুদ্ধ করো দৃপ্ত পরিহাসে,
হাতে হাত রাখো সাহসিকা;
তোমার মাভৈ শুনে হয়তো বা লজ্জিত নিয়তি ফিরাবে অভ্যাস ভুলে,
ঐকান্তিক সময়ের গতি,
মৃত্যুর বিক্ষিপ্ত জাল দিবে বুঝি মোরে অব্যাহতি,
শাপমুক্ত হবে অহমিকা;
নবজাত ভগবান বিরচিবে কৃতজ্ঞ উল্লাসে
আমাদের নব নীহারিকা।।

‘জাতিস্মর’ কবিতাটি ‘ক্রন্দসী’ কাব্যগ্রন্থেরই অন্তর্গত, এবং এখানে ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা ও ক্ষণস্থায়িত্বের বোধ এত তীব্র যে তা প্রায় শিল্পের এক নিরাসক্ত সৌন্দর্যে পৌঁছে যায়:

জাতিস্মর
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

নাথু সংকটে হাঁকে তিব্বতী হাওয়া।
প্রাকৃত তিমিরে মগ্ন চুমলহরি।
ছঙ্গু-সায়রে কার বহিত্র যাওয়া
অপর্ণ বনে দিয়েছে রহস ভরি।।
সুহৃদ আগুন নিবে গেছে গৃহকোণে ;
শ্রান্তসাথীরা স্বপনে আপনহারা ;
আমি শুধু বসে তুষারিত বাতায়নে
প্রহরে প্রহরে গুণি খসে কত তারা।।

অঙ্গ তুহিন, তপ্ত আমার মাথা,
ক্লান্ত, তথাপি নিদ্রা আসে না ডাকে ;
বাণীহীন কোন্ অনাদি বিষাদগাথা
গুঞ্জরে বিস্মরণের ফাঁকে ফাঁকে।।
হিমানীবিজন এই দুর্গম দেশে,
মনে হয় যেন, কে আমার অনুগামী ;
হয়তো বা আমি ভুলে গেছি আজ কে সে,
কিন্তু ভোলেনি তারে অন্তর্যামী।।

বিগত জনমে, এই পর্বতশিরে,
এমনই নীরব প্রাগিতিহাসিক রাতে
শিকার সমাপি এসেছিনু ঘরে ফিরে
মৃগের বদলে তাহারে কি ল’য়ে সাথে ?
মিনতি আমার প্রথমে ধরেনি কানে ;
কূটিল ভ্রুকুটি মোছেনি ললাটে ত্বরা ;
তার পরে কেন – তা কেবল সেই জানে-
অযাচিতে হল সহসা স্বয়ংবরা ।।

চ্যুত বল্কলে নিবে গেল দীপখানি ;
বাহিরের হিম মুকুরিল দ্রব চোখে ;
হঠাৎ তাহার লঘু ভাস্বর পাণি
খুঁজিল আমারে প্রাক্তন নিরালোকে ।।

আবার কি তার আদিম নিমন্ত্রণী
আহ্বানে মরে অমৃতের অভিসারে ?
কাঁদে সেদিনের প্রণব প্রতিধ্বনি
প্রতন গিরির গহ্বরকারাগারে ?

পুরাণপুরুষ ছাড়া পাবে নিমেষে
কি ? মাটির মানুষ মিলিবে মাটির সনে ?
বিদগ্ধ প্রাণী, এ কি মরীচিকা দেখি ?
ফিরিব প্রভাতে পরিচিত পরিজনে ।।
মৌল আকূতি মরমেই যাবে ম’রে।
জনশুন্যতা সদা মোরে ঘিরে রবে।
সামান্যাদের সোহাগ খরিদ ক’রে
চিরন্তনীর অভাব মিটাতে হবে ।।

বর্বর বায়ু চিরায়ু অচলচূড়ে
মুছে দিবে মোর অশুচি পায়ের রেখা ।
মার্জিতরুচি জনপদে ,বহু দূরে,
ভিড়ে মিশে আমি ভেসে যাব একা একা ।।

‘প্রতীক্ষা’ কবিতাটি ‘দশমী’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা, এবং এখানে কবি জীবনের উপাত্ত্যপর্বে পৌঁছে এক চূড়ান্ত উপলব্ধিতে পৌঁছান:

প্রতীক্ষা
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

পাতী অরণ্যে কার পদপাত শুনি
জানি কোনও দিন ফিরবে না ফাল্গুনী;
তবে অঞ্জলি উদ্যত কেন পলাশে?

বনের বাহিরে ক্ষওয়া মাটি ধূ ধূ করে;
নেই ফসলের দুরাশাও অম্বরে;
যা ছিল বলার, কবে হয়ে গেছে বলা সে।।

মহাশূন্যের মৌনে পরিস্ফীত,
বিবিক্তি আজ বেষ্টনীবিরহিত;
অধুনায় নিশ্চিহ্ন অতীত, আগামী;

নাস্তিতে নেতি স্বতঃসিদ্ধ প্রমা,
সোহংবাদীর আর্তি আত্মোপমা,
অগতির গতি মনোরথ বৃথা লাগামই।।

আরও এক বার, হাজার বছর আগে,
বিপ্রলব্ধ আস্থা অন্তরাগে
খুঁজে পেয়েছিল উজ্জীবনের প্রেরণা;
এবং আবার সহস্র বৎসর
পূবে আসে বটে, তবু মন্বন্তর
মানবেতিহাসে সর্বনাশেরই দেশনা।।

অন্তত এতে সন্দেহ নেই আর
অলাতচক্রে ঘুরে ঘুরে, সংসার
অনাদি অমাকে আনে আমাদের গোচরে;
পুঞ্জ পুঞ্জ ব্যক্তির বুদ্ধুদ,
সময়ের স্রোতে অচির, অরুন্তুদ,
মমতার জোট পাকায় এ-চরে, ও-চরে।।
অভাব হয়তো স্বভাবেরই অগ্রজ :
নিরবধি তাই প্রভাসে ফুরায় ব্রজ–
প্রতিজ্ঞা রাখে মরণ ত্রাতার বদলে;
বিশৃঙ্খলার পরাকাষ্ঠায় স্থাণু,
পৃথিবী অনাথ; যথেচ্ছ পরমাণু;
প্রগতিক শুধু কালভৈরব সদলে।।
অতএব কারও পথ চেয়ে লাভ নেই :
অমোঘ নিধন শ্রেয় তো স্বধর্মেই;
বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী।
অনুমানে শুরু, সমাধা অনুশ্চয়ে,
জীবন পীড়িত প্রত্যয়ে প্রত্যয়ে :
তথাচ পাব না আমি আপনার দেখা কি?

এই কবিতার শেষ পঙক্তিতেই সুধীন্দ্রনাথের সমস্ত দর্শনের সারকথা যেন সংহত: “বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী।” এই একাকিত্বের স্বীকৃতিতেও তিনি থামেন না; ‘উপস্থাপনা’ কবিতায় তিনি নিজেকে চিহ্নিত করেন “আমি ক্ষণবাদী” বলে—অর্থাৎ, তিনি সেই মানুষ যিনি বিশ্বাস করেন এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ ও সংসার ক্ষণস্থায়ী, এবং তাই কোনো চিরস্থায়ী সান্ত্বনাও নেই।

সুধীন দত্তের লেখা অর্কেস্ট্রার বিজ্ঞাপন‘সংবর্ত’ (১৯৫০) কাব্যগ্রন্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে তিনি মানবজাতির আর্তনাদ দেখে ঈশ্বরের নিরবতা নিয়ে যে প্রশ্ন তোলেন—“অদৃশ্য অম্বরে তবুও অদৃশ্য তুমি?” —সেই প্রশ্নটি কেবল অভিযোগ নয়, এটি যেনও এক নৈতিক দাবি। ‘সংবর্ত’ সম্পর্কে কবি নিজেই বলেছেন: “অথচ উক্ত যুদ্ধ যে ব্যাপক মাৎস্য নায়ের অবশ্যম্ভাবী পরিণাম, তার সঙ্গে পরবর্তী কবিতা সমূহের সম্পর্কে অকাট্য।”

এই কাব্যের ‘যযাতি’ কবিতায় তিনি নিজের অবস্থান চিহ্নিত করেন: “আমি বিংশ শতাব্দীর / সমানবয়সী; মজ্জমান বঙ্গোপসাগরে, বীর / নই, তবু জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্লবে বিপ্লবে / বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে, মনুষ্যধর্মের স্তবে / নিরুত্তর, অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী, প্রগতিতে / যত না পশ্চাৎপদ, ততোধিক বিমুখ অতীতে।” এই পঙক্তিতে সুধীন্দ্রনাথ নিজেকে চিহ্নিত করেছেন এক ‘অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী’ মানুষ হিসেবে, যিনি প্রগতির প্রতি সমান অবিশ্বাসী—এবং এই দ্বিমুখী অবিশ্বাসই তাঁর কাব্যের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্ক

সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল এক জটিল দ্বান্দ্বিকতার সম্পর্ক—স্নেহ, শ্রদ্ধা, এবং সৃষ্টিশীল দূরত্বের মিশ্রণ। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ সুধীন্দ্রনাথকে জাপান ও আমেরিকা সফরে সঙ্গে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ ভিয়েনা ও বার্লিনে তাঁর চেনা ডাক্তারদের কাছে চিঠি লিখে দিয়েছিলেন, এবং বার্ট্রান্ড রাসেল, রম্যাঁ রল্যাঁ, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মতো ব্যক্তিদের কাছে সুপারিশপত্রও দিয়েছিলেন, যাতে তরুণ সুধীন্দ্রনাথ বিদেশে কোনো অসুবিধায় না পড়েন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সুধীন্দ্রনাথের প্রতিভার প্রশংসা করলেও মনে করতেন, এই তরুণ কবি তাঁর সাহিত্যকর্মকে সবসময়ই নানাজাতের ‘থিয়োরি দ্বারা পীড়ন’ করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন: “বিবিধ কঠিন তত্ত্ব দিয়ে ‘সাহিত্যের অঙ্গটাকে আচ্ছন্ন না করে তার সহজ দেহকে’ যদি তিনি ‘সহজ সজীবতার লাবণ্যে যদি প্রকাশ’ করতে পারেন, তাহলেই তাঁর লেখাগুলো রসিক সমাজের উপাদেয় ভোজের আয়োজনে লাগবে।”

সুধীন দত্তের লেখা ক্রন্দসীর বিজ্ঞাপনআবার অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: “সুধীন্দ্র নানা বিষয়েই পড়াশুনো করেছেন কিন্তু কোনো বিশেষ বিষয়ে তার মন জমাট বেঁধে যায়নি। জ্ঞানের ও ভাবের রাজ্যে তিনি যাযাবর।” কিন্তু একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন: “ওর সঙ্গে আমার তহবিলের তুলনা হয় না কিন্তু একটা জায়গায় মেলে সে ওর পথ-চলতি মন নিয়ে।” অন্যদিকে সুধীন্দ্রনাথও রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেছিলেন, এবং নিজের অবস্থান সম্পর্কে বলেছিলেন: “সূর্য, উদয়াস্ত নির্বিকার: আমি অন্ধকারে বদ্ধমূল, আলোর দিকে উঠছি; সদগতির আগেই হয়তো তমসায় আবার তলাব।”

‘পরিচয়’: আধুনিকতার এক সম্মিলিত মঞ্চ

১৯৩১ সালে সুধীন্দ্রনাথ ‘পরিচয়’ পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন এবং টানা বারো বছর এই পত্রিকার সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ‘পরিচয়’ ছিল এলিয়টের ‘ক্রাইটেরিয়ন’-এর আদলে তৈরি একটি পত্রিকা, যা বাংলা সাহিত্যে মননশীলতার এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে।

দে'জ প্রকাশিত সুধীন্দ্রনাথ দত্তের শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রচ্ছদএই পত্রিকার মাধ্যমেই তিনি ত্রিশের দশকের আধুনিকতাবাদী কবিদের—জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী—একত্রে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র কাব্য-আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন। ‘পরিচয়’ কেবল একটি পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল সেই প্ল্যাটফর্ম যেখানে রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতা নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল। এই পত্রিকার মাধ্যমেই সুধীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতায় ‘ক্লাসিক্যাল’ ধারণার প্রবর্তন করেন, এবং ইংরেজি ‘ক্লাসিক্যাল’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘ধ্রুপদি’ শব্দটির উদ্ভাবন করেন—যা আজ বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার অবিচ্ছেদ্য পরিভাষা।

‘দুর্বোধ্যতা’র অভিযোগ

সুধীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সবচেয়ে পুরোনো এবং বহুশ্রুত অভিযোগ—তাঁর কবিতা ‘দুর্বোধ্য’। বুদ্ধদেব বসু এই অভিযোগের জবাবে লিখেছিলেন: “সুধীন্দ্রনাথের কবিতা দুর্বোধ্য নয়, দুরূহ; এবং সেই দুরূহতা অতিক্রম করা অল্পমাত্র আয়াসসাপেক্ষ।”

তাঁর মতে, সুধীন্দ্রনাথ অনেক নতুন শব্দ, বা বাংলায় অচলিত সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করেছেন—এটিই একমাত্র বিঘ্ন; অভিধানের সাহায্য নিলে সেই বিঘ্ন অতিক্রম করা যায়, এবং তারপর পাঠক আবিষ্কার করেন যে সেই অজানা শব্দগুলোর প্রয়োগ “একেবারে নির্ভুল ও যথাযথ হয়েছে, পরিবর্তে অন্য কোনো শব্দ সেখানে ভাবাই যায় না।”

‘অন্বিষ্ট’, ‘অভিধা’, ‘ঐতিহ্য’, ‘প্রমা’, ‘প্রতিভাস’, ‘অবৈকল্য’ প্রভৃতি শব্দ—যা আজকের পাঠক হয়তো যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেন—প্রথম ব্যবহার হয় সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় ও প্রবন্ধে; এমনকি ‘ক্লাসিক্যাল’ অর্থে ‘ধ্রুপদি’ শব্দটিও তাঁরই উদ্ভাবন। এই শব্দ-সমবায়ের সাহায্যে তিনি একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করেই জটিল ও তাত্ত্বিক বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে পেরেছেন, এবং তাঁর কবিতাকে দিয়েছেন এমন এক শ্রবণসুভগ সংগতি ও গাম্ভীর্য যা বাংলা ভাষায় অপূর্ব।

বুদ্ধদেব বসু আরও বলেছিলেন, “সুধীন্দ্রনাথ মর্মে-মর্মে রোমান্টিক কবি, এবং একজন শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক” —এবং তাঁর যুক্তি ছিল দুইটি: প্রথমত, সুধীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতায় আবেগের তীব্রতা, বাসনা ও বেদনার অলজ্জিত ও ব্যক্তিগত চিৎকার; দ্বিতীয়ত, ভগবানের অভাবে তাঁর যন্ত্রণাবোধ—যা একটি খাঁটি রোমাণ্টিক লক্ষণ। এই বিতর্কের মীমাংসা আজও হয়নি, এবং সম্ভবত হওয়ার দরকারও নেই—কারণ সুধীন্দ্রনাথের কণ্ঠ এমন এক সন্ধিক্ষণের কণ্ঠ, যেখানে ধ্রুপদি শৃঙ্খলা ও রোমান্টিক আকুলতা পরস্পরবিরোধী হয়েও একসঙ্গে বাস করে।

প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও অধ্যাপক: গদ্যের আরেক মুখ

সুধীন্দ্রনাথের প্রতিভা কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘স্বগত’ (১৯৩৮) এবং ‘কুলায় ও কালপুরুষ’ (১৯৫৭) বাংলা গদ্যের আধুনিক রূপের প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘স্বগত’-র প্রবন্ধগুলো মূলত ‘পরিচয়’-এর জন্যে লেখা, অর্থাৎ তাদের রচনাকাল মোটামুটি ত্রিশের দশক, যখন তিনি সবচেয়ে সৃষ্টিশীল। প্রথম সংস্করণে প্রবন্ধসংখ্যা ছিল ১+১৯, বিষয় বাংলা ও পাশ্চাত্য সাহিত্য। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৫৭–১৯৫৯) এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের গল্পসংগ্রহের প্রথম প্রচ্ছদতাঁর ইংরেজি লেখালেখিও উল্লেখযোগ্য—‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট টোয়াইলাইট’ এবং ‘দি আনকালেক্টেড ইংলিশ রাইটিংস’ তাঁর গদ্যের আরেক মুখকে চেনায়। ১৯৪২–১৯৪৫ সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি এ.আর.পি.-তে (Air Raid Precaution) যোগদান করেছিলেন, এবং ১৯৪৫ সালে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গদ্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, “His balanced periodic sentences resonate with the authoritativeness of a Dr. Johnson... the ideational ballast is exquisitely leavened by an effervescent wit” —অর্থাৎ, 'তাঁর সুবিন্যস্ত দীর্ঘ বাক্যগুলো ড. জনসনের মতো প্রামাণিকতায় অনুরণিত, আর তার ভাবনার ভারসাম্য অত্যন্ত সুস্বাদুভাবে হালকা করা হয়েছে এক উচ্ছল রসবোধে'।

ব্যক্তিগত জীবন: এক নির্জনতার ট্র্যাজেডি

কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটির জীবনে ছিল এক গভীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। ১৯২৪ সালে ছবি বসুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়, কিন্তু এক বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদ ঘটে—যদিও আইনি বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি। এরপর ১৯৪৩ সালের ২৯ মে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী বসুর সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয়বার বিবাহ হয়। এই দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে তাঁর বন্ধুরা বিমুখ ছিলেন—অনেকে চেষ্টা করেছিলেন ছবি দত্তের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর, কিন্তু লাভ হয়নি। সত্যেন্দ্রনাথ বসু—যাঁকে ‘অর্কেষ্ট্রা’ উৎসর্গ করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ—যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন পুরোপুরি। এই ব্যক্তিগত অস্থিরতা তাঁর কবিতার সেই ‘একাকী’ চেতনাকে আরও গভীর করে। ১৯৬০ সালের ২৫ জুন, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনীকাররা বলেন, সুধীন্দ্রনাথ শেষজীবনে ক্রমশ আরও নির্জন হয়ে পড়েছিলেন—যেন তাঁর নিজের কবিতার সেই ‘একাকী’ চরিত্রটিই তাঁর ভাগ্যে সত্য হয়ে উঠেছিল।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধসংগ্রহের প্রচ্ছদসুধীন্দ্রনাথের প্রভাব বাংলা কবিতায় গভীর, কিন্তু সেই প্রভাব সহজে স্বীকৃত হয়নি। কারণ তাঁর কবিতা সহজে পড়া যায় না। তার শব্দভাণ্ডার দুর্ভেদ্য, তার বাক্যগঠন জটিল, তার ইঙ্গিত বহুস্তরবিশিষ্ট। কিন্তু যাঁরা সেই জটিলতার ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন, তাঁরা খুঁজে পান এমন এক কণ্ঠ, যিনি বাংলা কবিতায় প্রথমবারের মতো ঈশ্বর, প্রেম, মৃত্যু ও ইতিহাসকে কোনো আবেগের আচ্ছাদন ছাড়াই, নিছক বুদ্ধির নিরাসক্ত আলোয় দেখতে চেয়েছেন। তাঁর প্রভাব পরবর্তী বাংলা কবিতায় সুস্পষ্ট—শঙ্খ ঘোষ থেকে জয় গোস্বামী পর্যন্ত বহু কবি তাঁর শব্দভাণ্ডার ও চিন্তনপদ্ধতির ঋণ স্বীকার করেছেন।

সুধীন দত্তের পাণ্ডুলিপির একটি পাতারবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতায় ‘নানাগুণসমন্বিত পুরুষ’ হিসেবে সুধীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারিত হয়, এবং ত্রিশের দশকের যে পাঁচজন কবি রবীন্দ্র-প্রভাব কাটিয়ে আধুনিকতার সূচনা ঘটান, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সেই বিরল প্রতিভা, যিনি দেখিয়েছেন যে সংশয়ও এক ধরনের বিশ্বাস হতে পারে—এবং সেই সংশয়ের ভেতর দিয়েই জন্ম নিতে পারে এক গভীর, ধ্রুপদি সৌন্দর্য। তাঁর ‘উটপাখি’ আজও আমাদের বলে: “অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?” — এবং সেই প্রশ্নের উত্তর আজও দেওয়া হয়নি, কারণ দেওয়ার মতো কোনো উত্তর মানুষের কাছে নেই। তাঁর কবিতা আজও পাঠককে শেখায় যে প্রশ্ন করা, সন্দেহ করা, এবং কোনো সহজ উত্তর না মেনে নেওয়া—এটাই বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত সাহস।

তথ্যসূত্র

১. “সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও আধুনিক বাংলা কবিতা।” বঙ্গভারতী, ৮ মার্চ ২০১১, https://bangabharati.wordpress.com/2011/03/08/সুধীন্দ্রনাথ-দত্ত-ও-আধুন/।
২. “সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।” উইকিপিডিয়া (বাংলা), https://bn.m.wikipedia.org/wiki/সুধীন্দ্রনাথ_দত্ত।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তশিমুল সালাহ্উদ্দিনসুধীন দত্ত
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    ফ্লাইটে উঠেই লিটন ফেসবুকে দেখতে পান তার মেয়ে মারা গেছে

    ফ্লাইটে উঠেই লিটন ফেসবুকে দেখতে পান তার মেয়ে মারা গেছে

    এনসিপিতে যোগ দিলেন শিবিরের ৮০ নেতাকর্মী

    এনসিপিতে যোগ দিলেন শিবিরের ৮০ নেতাকর্মী

    পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লা খুঁজতে বিশেষ কমিটি!

    পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লা খুঁজতে বিশেষ কমিটি!

    খুলনা রেঞ্জে শুদ্ধি অভিযান, একযোগে পুলিশের ২৮ সদস্য প্রত্যাহার

    খুলনা রেঞ্জে শুদ্ধি অভিযান, একযোগে পুলিশের ২৮ সদস্য প্রত্যাহার

    বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সার্বিয়ার নির্বাচন

    বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সার্বিয়ার নির্বাচন

    পিটাছড়ায় বন ও প্রাণের উৎসব

    পিটাছড়ায় বন ও প্রাণের উৎসব

    প্রিয় ৫ বই

    প্রিয় ৫ বই

    তুরাগ তীরে মিলেছে নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেল, তাহসিফের কিনা চলছে যাচাই

    তুরাগ তীরে মিলেছে নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেল, তাহসিফের কিনা চলছে যাচাই

    আড়াই মাস পর ফিরছে সৌদিতে নিহত ৫ শ্রমিকের মরদেহ, অপেক্ষায় স্বজনেরা

    আড়াই মাস পর ফিরছে সৌদিতে নিহত ৫ শ্রমিকের মরদেহ, অপেক্ষায় স্বজনেরা

    নাঈমের দ্রুততম ‘ফিফটি’

    নাঈমের দ্রুততম ‘ফিফটি’

    মার্কিন চুক্তিতে শুধু দেশ নয়, বিক্রি করা হচ্ছে সার্বভৌমত্বও

    মার্কিন চুক্তিতে শুধু দেশ নয়, বিক্রি করা হচ্ছে সার্বভৌমত্বও

    ‘ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিলাম, কিন্তু ঘরে ফিরলাম লজ্জা নিয়ে’

    ‘ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিলাম, কিন্তু ঘরে ফিরলাম লজ্জা নিয়ে’

    ‘রান ফর ডেমোক্রেসি’ স্লোগানে জাবিপ্রবিতে ছাত্রদলের ৫ কিলোমিটার ম্যারাথন

    ‘রান ফর ডেমোক্রেসি’ স্লোগানে জাবিপ্রবিতে ছাত্রদলের ৫ কিলোমিটার ম্যারাথন

    বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকচিত্র কোর্সের ১২তম ব্যাচের উদ্বোধন

    বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকচিত্র কোর্সের ১২তম ব্যাচের উদ্বোধন

    দীপের দেওয়া তথ্যে নানা ‘অসংগতি’

    দীপের দেওয়া তথ্যে নানা ‘অসংগতি’