স্মরণে ইতালো কালভিনো
সাহিত্য ‘যা ঘটতে পারত’ তার অসীম তালিকা

ইতালো কালভিনো (জন্ম: ১৫ অক্টোবর, ১৯২৩ — মৃত্যু: ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫)
বিশ্বসাহিত্যে ইতালো কালভিনো কেন আলাদা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দিতে চাইলে বলতে হবে— তিনি একই সঙ্গে রূপকথার গল্পকথক, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকার, দার্শনিক, রাজনৈতিক সাক্ষী, আবার ভাষাখেলোয়াড়। পৃথিবীর সাহিত্যে অনেক লেখক আছেন, যারা হয় বাস্তবতার আয়নায় সমাজ দেখান, নয়তো কল্পনার ডানায় উড়ে যান। কালভিনো দুটোই করেছেন, কিন্তু কখনো একটিকে অন্যটির শত্রু হতে দেননি। তার লেখায় ইতালির যুদ্ধোত্তর ধুলো-কাদা-রাজনীতি ঢুকে পড়ে, আবার সেই লেখার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় কামানের গোলায় দুই টুকরা হয়ে যাওয়া ভিসকাউন্ট, গাছ থেকে না-নামা ব্যারন, অস্তিত্বহীন নাইট। তিনি বিজ্ঞানকে গল্পের ভাষা দিয়েছেন— মহাবিশ্বের জন্ম, বিবর্তন, সময়, শূন্যতা, কোয়ান্টামের অনিশ্চয়তা তার ‘কসমিকমিক্স’-এ রূপকথার মতো সহজ হয়ে যায়। আবার ইতালির গ্রামে-গঞ্জে-উপভাষায় ছড়িয়ে থাকা ২০০টি লোককথা তিনি ‘ইতালিয়ান ফোকটেলস’-এ এমনভাবে সাজান যে মনে হয় গ্রিম ভাইদের পাশে ইতালিরও একটি জাতীয় রূপকথার সংকলন দাঁড়িয়ে গেল।
তিনি শুধু গল্প বলেননি, গল্প কীভাবে জন্মায়, পাঠক কীভাবে গল্পের অংশ হয়ে যায়— সেটিও দেখিয়েছেন। ‘ইফ অন আ উইন্টার’স নাইট আ ট্রাভেলার’-এ তিনি পাঠককেই উপন্যাসের চরিত্র করে তোলেন; ‘ইনভিজিবল সিটিজ’-এ শহরকে বাস্তব ভূগোলের বদলে মন, স্মৃতি, চাওয়া আর ভাষার মানচিত্র বানিয়ে ফেলেন।
ওলিপো গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগ তাকে শিখিয়েছিল সীমাবদ্ধতা থেকে সৃষ্টির খেলা; তাই তার লেখায় নিয়ম, বিন্যাস, ট্যারোট কার্ড, সংখ্যা, সম্ভাবনার জাল— সবই সাহিত্যের উপাদান। কিন্তু এই নিরীক্ষাপ্রবণতা কখনো শীতল হয় না; তার ভাষা হালকা, স্বচ্ছ, কখনো ঠাট্টার মতো, কখনো স্বপ্নের মতো। কালভিনো রাজনীতি ছেড়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক চেতনা ছাড়েননি; তিনি কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়েছেন, কিন্তু ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা আর মানুষের সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রাখেন। এই কারণেই তাকে একই সঙ্গে আধুনিকতা-উত্তর আধুনিকতা, নিওরিয়ালিজম-ফেবুলিজম, বিজ্ঞান-কল্পনা, স্থানীয়-বৈশ্বিক— সব সীমানার ভেতরে ও বাইরে দাঁড় করানো যায়।
কেউ যদি বলেন— এমন এক লেখক আছেন, যিনি একই সঙ্গে রূপকথা লিখেছেন, মহাবিশ্বের জন্ম নিয়ে গল্প লিখেছেন, অদৃশ্য শহরের মানচিত্র এঁকেছেন, আবার পাঠককে টেনে তুলেছেন উপন্যাসের ভেতরে— তিনি ইতালো কালভিনো
বোর্হেসের অধিবিদ্যা, কাফকার অস্তিত্ববাদ, মার্কেসের জাদুবাস্তবতা— সবই আছে, তবু কালভিনো আলাদা, কারণ তিনি কেবল বাস্তবের প্রতিলিপি তোলেন না, বাস্তবের অসীম সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। তার সাহিত্য তাই পাঠকের কাছে একই সঙ্গে বুদ্ধির খেলা, নৈতিক প্রশ্ন আর আনন্দের উৎস। এই কারণেই বিশ্বসাহিত্যে ইতালো কালভিনো একা, এবং ঠিক সেই কারণেই তিনি এত জনপ্রিয়, এত অনূদিত, এত পঠিত।
কেউ যদি বলেন— এমন এক লেখক আছেন, যিনি একই সঙ্গে রূপকথা লিখেছেন, মহাবিশ্বের জন্ম নিয়ে গল্প লিখেছেন, অদৃশ্য শহরের মানচিত্র এঁকেছেন, আবার পাঠককে টেনে তুলেছেন উপন্যাসের ভেতরে— তিনি ইতালো কালভিনো। ইতালিয়ান সাহিত্যের এই জাদুকর ১৯২৩ সালের ১৫ অক্টোবর কিউবার হাভানার উপশহর সান্তিয়াগো দে লাস ভেগাসে জন্ম নেন, মারা যান ১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ইতালির সিয়েনায়। কিন্তু মৃত্যু তার লেখা থামাতে পারেনি; বরং তার লেখা আজও নতুন পাঠকের ঘরে ঢুকে বলে— চলো, আরেকবার গল্পের সম্ভাবনা আবিষ্কার করি।
তার নামের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক টানাপড়েন। মা জুলিয়ানা মামেলি ছেলের নাম রেখেছিলেন ‘ইতালো’, যাতে বিদেশের মাটিতে জন্মেও ছেলের মনে ইতালির শিকড় জাগ্রত থাকে। কিন্তু কালভিনো নিজেই পরে বলেছেন, নামটি তার কাছে শোনাত ‘আক্রমণাত্মকভাবে জাতীয়তাবাদী’। এই ছোট্ট ঘটনাটিই তার সারাজীবনের পরিচয়— তিনি সবসময় কোনো না কোনো পরিচয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে সেই পরিচয়কে প্রশ্ন করতে শিখেছেন।
তার বাবা মারিও ছিলেন কৃষিবিজ্ঞানী ও উদ্ভিদবিদ, মা জুলিয়ানা ছিলেন উদ্ভিদবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বাড়ির পরিবেশ ছিল বিজ্ঞান, মুক্তচিন্তা আর রাজনৈতিক প্রতিরোধে ভরা। না ক্যাথলিক ধর্ম, না গোঁড়া জাতীয়তাবাদ— বরং ফ্রিমেসনরি, প্রজাতন্ত্রবাদ, অ্যানার্কিজম আর মার্কসবাদের টানাপড়েনে বড় হতে থাকে ছোট্ট ইতালো। বাড়িতে সাহিত্যের চেয়ে বিজ্ঞান বেশি সমাদৃত ছিল, তাই কালভিনো নিজেকে বলতেন পরিবারের ‘কালো ভেড়া’।
১৯২৫ সালে পরিবার ইতালিতে ফিরে সানরেমোতে থিতু হয়। সেখানেই ভিলা মেরিডিয়ানা— একটি পরীক্ষামূলক ফুল চাষকেন্দ্র, যেটি একই সঙ্গে ছিল তাদের বাড়ি। বাবার বাগানে আভোকাডো, গ্রেপফ্রুটের মতো তখনকার বিদেশি ফল চাষ হত; আর সেই বাগান-জঙ্গল-পাহাড়ের ছায়া কালভিনোর প্রথম গল্পগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে। ভাই ফ্লোরিয়ানোর সঙ্গে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাছের ডালে বসে দুঃসাহসিক গল্প পড়তেন— এই ছবিটিই পরে ‘দ্য ব্যারন ইন দ্য ট্রিস’-এর বীজ হয়ে যায়।
ছোটবেলায় ধর্ম নিয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এক অদ্ভুত শূন্যতায়। বাবা-মা ছেলেদের কোনো ধর্মীয় শিক্ষা দেননি। স্কুলে তিনি ধর্ম ক্লাস থেকে অব্যাহতি পেতেন, আর বন্ধুরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করত। পরে তিনি বলেছিলেন, এই অভিজ্ঞতাই তাকে ‘অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল’ করে তুলেছে— কারণ তিনি নিজেই জানতেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস না মানলে কেমন লাগে।
তার প্রথম স্মৃতিগুলোর একটি আরও গাঢ়: এক মার্কসবাদী অধ্যাপক মুসোলিনির ব্ল্যাকশার্টদের মারধরে রক্তাক্ত মুখে ডিনারে এসে সাহায্য চাইছেন। এই ছবি তার মন থেকে কখনো মোছেনি। মা তাকে বালিলা মোসকেটিয়েরিতে ঢোকা থেকে দেরি করান, কিন্তু পরে আভানগার্দিস্তিতে থাকতে হয়; ১৯৪০ সালে ফরাসি রিভিয়েরা আক্রমণে অংশ নিতে তিনি বাধ্য হন। এর মধ্যেই টুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃষিবিদ্যা পড়তে শুরু করেন— বাবার পথ অনুসরণ করে। কিন্তু ক্লাসে বসে থাকলেও তার মন পড়ে থাকত ভিত্তোরিনি, মোন্তালে, পাভেসে, এমনকি প্লাংক, হাইজেনবার্গ, আইনস্টাইনের ওপর।
তার আসল লক্ষ্য ছিল নাট্যকার হওয়া; ইউজেনিও স্কালফারির সঙ্গে চিঠিতে ভরে থাকত ইতালিয়ান ও বিদেশি নাটকের উল্লেখ, ভবিষ্যতের নাট্য প্রকল্পের চরিত্র আর কাহিনি। স্কালফারির সঙ্গেই একই ডেস্কে বসে তিনি রাজনৈতিক চেতনা পান; দুজনে মিলে মুভিমেন্তো উনিভের্সিতারিও লিবেরালে নামের বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন গড়েন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালভিনোর জীবন দুভাগ করে দেয়। ১৯৪৩ সালে তিনি ফ্লোরেন্সে যান, সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকার করেন এবং নাৎসি-ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে গোপন জীবন বেছে নেন। ১৯৪৪ সালের বসন্তে মা তাকে ‘প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার ও পারিবারিক গুণ’-এর নামে প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহ দেন। তিনি গারিবালদি ব্রিগেডে যোগ দেন, ছদ্মনাম নেন ‘সান্তিয়াগো’, আর বিশ মাস ধরে মেরিটাইম আল্পসে লড়াই করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়ায় নাৎসিরা তার বাবা-মাকে দীর্ঘদিন ভিলা মেরিডিয়ানায় জিম্মি রাখে। মা এসএস ও ফ্যাসিস্ট মিলিশিয়ার সামনে নির্ভীক থাকেন— কালভিনো পরে লিখেছেন, ‘মায়েরা যে ঐতিহাসিক ঘটনায় অংশ নেয়, তা প্রকৃতির ঘটনার মতো মহত্ত্ব ও অপরাজেয়তা অর্জন করে।’
শুরুতে তিনি ছিলেন নিওরিয়ালিস্ট— যুদ্ধ, প্রতিরোধ, শ্রমিক, গরিব মানুষের জীবন। কিন্তু খুব দ্রুত তিনি বাস্তবের সরল প্রতিলিপি ছেড়ে রূপকথা, কল্পবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস আর গাণিতিক খেলার দিকে হাঁটতে শুরু করেন
যুদ্ধোত্তর ইতালিতে ফিরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি ঝুঁকে পড়েন। টুরিনে এলিও ভিত্তোরিনির সাহায্যে সাহিত্যের জগতে ঢোকেন, জুলিও এনাউদির প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে জোসেফ কনরাডের ওপর থিসিস করেন এবং প্রথম উপন্যাস ‘দ্য পাথ টু দ্য নেস্ট অফ স্পাইডার্স’ প্রকাশ করে প্রেমিও রিচ্চিওনে জেতেন। পাভেসে তরুণ কালভিনোকে প্রশংসা করে বলেন, তিনি ‘কলমের কাঠবিড়াল’, গাছের ডালে উঠে পার্টিজান জীবনকে বনের রূপকথার মতো দেখেন। ১৯৪৮ সালে নাতালিয়া গিনজবুর্গের সঙ্গে স্ত্রেসায় গিয়ে তিনি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সাক্ষাৎকার নেন— শৈশবের সাহিত্যিক নায়কের সঙ্গে মুখোমুখি। ১৯৫১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে সাংবাদিক হিসেবে গিয়ে তিনি খবর পান, ২৫ অক্টোবর বাবা মারা গেছেন। এই ভ্রমণের লেখাগুলো ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় এবং সাংবাদিকতার জন্য সাঁ-ভাঁসাঁ পুরস্কার পায়।
১৯৫০-এর দশকেই কালভিনোর রূপান্তর শুরু। তিনি লিখলেন ‘আওয়ার অ্যানসেস্টরস’ ত্রয়ী— দ্য ক্লোভেন ভিসকাউন্ট, দ্য ব্যারন ইন দ্য ট্রিস, দ্য নন-এক্সিস্টেন্ট নাইট। দ্য ক্লোভেন ভিসকাউন্ট তিনি লিখেছিলেন মাত্র ৩০ দিনে, ১৯৫১ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। কামানের গোলায় দুই টুকরা হয়ে যাওয়া এক সপ্তদশ শতকের ভিসকাউন্টের শরীরে তিনি এঁকে দিলেন স্নায়ু যুদ্ধের বিভাজন আর নিজের রাজনৈতিক সংশয়। এরপর এলো ‘ইতালিয়ান ফোকটেলস’, যেখানে তিনি ইতালির নানা উপভাষা থেকে ২০০টি রূপকথা অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন— প্রশ্ন ছিল, ‘গ্রিম ভাইদের ইতালিয়ান সমতুল্য কি আছে?’ ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে ইতালিয়ান অভিনেত্রী এলসা দে জর্জির সঙ্গে তার প্রেম চলে; ২০০৪ সালে কোরিয়ের দেলা সেরায় সেই প্রেমপত্র প্রকাশিত হলে বিতর্ক ওঠে। কিন্তু রাজনীতির আকাশে মেঘ জমছিল। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরি আক্রমণ এবং স্টালিনের অপরাধ প্রকাশের পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইতালিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দেন। ল’উনিতায় প্রকাশিত পদত্যাগপত্রে তিনি হাঙ্গেরির বিদ্রোহ দমনের নিন্দা করেন এবং বিশ্ব কমিউনিজমের ‘গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার’ ওপর আস্থা রাখেন। এরপর তিনি আর কোনো রাজনৈতিক দলে সক্রিয় হননি।
১৯৫৯-৬০ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে আমেরিকায় ছয় মাস থাকেন— চার মাস নিউ ইয়র্কে। এই ‘নতুন বিশ্ব’ তাকে মুগ্ধ করে; তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সবসময় নিজেকে নিউ ইয়র্কার মনে করেছি। আমার শহর নিউ ইয়র্ক।’ ১৯৬৪ সালে হাভানায় এস্থার জুডিথ সিঙ্গার ‘চিচিতা’কে বিয়ে করেন; সেখানে চে গুয়েভারার সঙ্গে পরিচয় হয়। ১৯৬৭ সালে ভিত্তোরিনির মৃত্যু তাকে গভীরভাবে আহত করে; তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আর তরুণ নই।’ এরপর পরিবার নিয়ে প্যারিসে চলে যান। ১৯৬৮ সালে রেমোঁ কুয়েনোর আমন্ত্রণে উলিপো গোষ্ঠীতে যোগ দেন; রোলাঁ বার্ত ও জর্জ পেরেকের সংস্পর্শে তার পরীক্ষামূলক সাহিত্য আরও গভীর হয়। সেই বছরই ‘টাইম অ্যান্ড দ্য হান্টার’-এর জন্য ভিয়ারেজ্জিও পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন— কারণ তার কাছে এটি ছিল ‘অর্থশূন্য প্রতিষ্ঠানের দেওয়া পুরস্কার’। তবে ১৯৭০-এ আস্তি পুরস্কার এবং ১৯৭২-এ ফেলত্রিনেল্লি পুরস্কার গ্রহণ করেন।
১৯৭০-এর দশকে লেখেন ‘ইনভিজিবল সিটিজ’ এবং ‘ইফ অন আ উইন্টার’স নাইট আ ট্রাভেলার’— যা আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের দুই অনিবার্য বই। ইনভিজিবল সিটিজে মার্কো পোলো ও কুবলাই খাঁর কথোপকথনে শহরের অদৃশ্য মানচিত্র আঁকেন; সেখানে লেখা আছে, ‘রূপের তালিকা অসীম। যতক্ষণ প্রতিটি আকার তার শহর খুঁজে না পায়, নতুন শহর জন্মাতে থাকবে।’
১৯৭৫ সালে আমেরিকান একাডেমির অনারারি সদস্য হন; ১৯৭৬-এ অস্ট্রিয়ান স্টেট প্রাইজ ফর ইউরোপিয়ান লিটারেচার পান। ১৯৭৮ সালে ৯২ বছর বয়সে মা মারা গেলে সানরেমোর ভিলা মেরিডিয়ানা বিক্রি করে দেন। ১৯৮১ সালে ফরাসি লেজিয়ঁ দ’অনার পান এবং ৩৮তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সভাপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৮২ সালে ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ডে জীবনভর অবদানের স্বীকৃতি পান। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘মিস্টার পালোমার’। ১৯৮৫ সালের গ্রীষ্মে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়ার জন্য ছয়টি বক্তৃতা লিখছিলেন— সাহিত্যের হালকাভাব, দ্রুততা, নির্ভুলতা, দৃশ্যমানতা, বহুত্ব নিয়ে। ৬ সেপ্টেম্বর রোক্কামারে ভিলায় স্ট্রোক করেন; সিয়েনার হাসপাতালে ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে সেরেব্রাল হেমোরেজে মৃত্যু হয়। তার নোটগুলো পরে ‘সিক্স মেমোস ফর দ্য নেক্সট মিলেনিয়াম’ নামে প্রকাশিত হয়।
কালভিনোর সাহিত্য এক শব্দে ধরা যায় না। শুরুতে তিনি ছিলেন নিওরিয়ালিস্ট— যুদ্ধ, প্রতিরোধ, শ্রমিক, গরিব মানুষের জীবন। কিন্তু খুব দ্রুত তিনি বাস্তবের সরল প্রতিলিপি ছেড়ে রূপকথা, কল্পবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস আর গাণিতিক খেলার দিকে হাঁটতে শুরু করেন। ওলিপো ধরনের পরীক্ষামূলক লেখক হিসেবে তিনি সীমাবদ্ধতা থেকে সৃষ্টি, নিয়মের ভেতরে খেলা, সম্ভাবনার জাল বুনেছেন। তার ভাষা হালকা, পরিষ্কার, কখনো ঠাট্টার মতো, কখনো স্বপ্নের মতো। তিনি বিশ্বাস করতেন— সাহিত্য কেবল যা ঘটেছে তা নয়; সাহিত্যে যা ঘটতে পারত তার অসীম তালিকা।
তার অবদান কেবল নিজের লেখায় সীমাবদ্ধ নয়। এনাউদিতে সম্পাদক হিসেবে তিনি মারিও রিগোনি স্তের্ন, জিয়ান্নি চেলাতি, আন্দ্রেয়া দে কার্লো, দানিয়েলে দেল জুডিচে, লেওনার্দো শাশিয়ার মতো লেখকদের প্রকাশে সাহায্য করেন। তিনি ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে অনূদিত সমকালীন ইতালিয়ান লেখক। মৃত্যুর পর তার নামে বুধগ্রহের একটি ক্রেটার, একটি অ্যাস্টেরয়েড, মস্কোর একটি ইতালিয়ান স্কুল এবং ‘ইতালো কালভিনো প্রাইজ’ তৈরি হয়েছে।
ফিনিশ সুরকার কাই নিয়েমিনেন ২০০১ সালে মিস্টার পালোমার-এর গল্প অবলম্বনে ফ্লুট কনসার্টো লেখেন। ড্যামিয়ান পেতিগ্রুর ‘লো স্পেক্কিও দি কালভিনো’ (২০১২) নামের ডকুফিকশনে নেরি মারকোরে কালভিনোর চরিত্রে অভিনয় করেন।
যদি কালভিনো পড়তে শুরু করেন, ‘দ্য পাথ টু দ্য নেস্ট অফ স্পাইডার্স’ দিয়ে শুরু করা যায়— যুদ্ধ ও প্রতিরোধের নিওরিয়ালিস্ট কালভিনো। এরপর ‘দ্য ক্লোভেন ভিসকাউন্ট’, ‘দ্য ব্যারন ইন দ্য ট্রিস’, ‘দ্য নন-এক্সিস্টেন্ট নাইট’— তিনটি রূপকথার মতো উপন্যাস, যেখানে স্বাধীনতা, পরিচয় আর শূন্যতার দর্শন।
‘কসমিকমিক্স’ ও ‘টাইম অ্যান্ড দ্য হান্টার’-এ বিজ্ঞানকে গল্পের ভাষায় বলা হয়েছে। ‘দ্য ক্যাসল অফ ক্রসড ডেস্টিনিস’-এ ট্যারোট কার্ডের বিন্যাসে ভাগ্যের গল্প। ‘ইনভিজিবল সিটিজ’-এ শহরের অদৃশ্য মানচিত্র, ‘ইফ অন আ উইন্টার’স নাইট আ ট্রাভেলার’-এ উপন্যাস পড়তে বসা পাঠকের নিজের গল্প। ‘মিস্টার পালোমার’-এ একা দাঁড়িয়ে বিশ্বকে দেখার চেষ্টা, ‘ডিফিকাল্ট লাভস’-এ প্রেম ও দৈনন্দিন জীবনের অসাধারণতা, ‘আন্ডার দ্য জাগুয়ার সান’-এ ইন্দ্রিয়ের গল্প, ‘নাম্বারস ইন দ্য ডার্ক’-এ ছোটগল্পের ভেতরে রাজনীতি ও কল্পনা। ‘সিক্স মেমোস ফর দ্য নেক্সট মিলেনিয়াম’-এ সাহিত্যের পাঁচটি মূল্য নিয়ে মরণোত্তর বক্তৃতা, ‘হোয়াই রিড দ্য ক্লাসিকস?’-এ ক্লাসিক পড়ার পক্ষে যুক্তি, ‘দ্য রোড টু সান জিওভানি’ ও ‘হার্মিট ইন প্যারিস’-এ আত্মজীবনীমূলক লেখা— যেখানে ব্যক্তিগত ইতালো ধরা পড়ে।
কালভিনোকে পড়া মানে একই সঙ্গে রূপকথা পড়া, দর্শন পড়া, বিজ্ঞান পড়া, শহর পড়া, আর নিজের মন পড়া। তিনি পাঠককে বলেন—গল্প শেষ হয়ে গেলেও সম্ভাবনা শেষ হয় না; বই বন্ধ করলেও শহরগুলো জেগে থাকে। তার ‘ইনভিজিবল সিটিজ’-এ লেখা আছে: ‘রূপের তালিকা অসীম।’
কালভিনোর সাহিত্যও ঠিক তেমন— প্রতিটি পাঠে নতুন শহর, নতুন পাঠক, নতুন সম্ভাবনা। তাই যে কেউ একবার তার লেখায় ঢুকলে আর বেরোতে চাইবে না; সে শুধু ভাববে— আরেকটি শহর, আরেকটি গল্প, আরেকটি অদৃশ্য দরজা খুলি।






