মুর্তজা বশীরের সাক্ষাৎকার
ঢাকার কোনো রাস্তা ভাষা শহীদদের নামে নেই

শিল্পী মুর্তজা বশীরের সঙ্গে কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন। ছবি: নওশের রোমান
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পী মুর্তজা বশীর। শিল্পী তিনি সিনেমার, কবিতার, উপন্যাসের, গল্পের এবং চিত্রশিল্পের। এমনকি গবেষণাকর্মেও তার প্রতিভা অনন্য হয়ে আছে। প্রায় ছয় দশক ধরে বাংলাদেশের শিল্পজগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন নতুনত্বে আর মৌলিকতায়। চিত্রকলা বিষয়ে পাঠদান করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। একসময় শিল্পনির্দেশনা দিয়েছেন উর্দু ও বাংলা চলচ্চিত্রে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘নদী ও নারী’-র চিত্রনাট্যকার মুর্তজা বশীর ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছোট ছেলে তিনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী রক্তাক্ত আবুল বরকতকে অন্যদের সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়েছিলেন বরেণ্য এই শিল্পী। ২০১৩ সালে শিল্পীর জন্মদিন সামনে রেখে পরপর দুটি সাক্ষাতে রঙ ও রেখায় চিরস্পন্দিত প্রবীণ এ শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হয় কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিনের। সেই আলাপটি আজ শিল্পীর জন্মদিন উপলক্ষে আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্য রাখা হলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, মাঝখানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আপনি।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, প্রায় মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরেছি। ডাক্তাররা বলেছেন খুব ক্রিটিকাল অবস্থায় ছিলাম। আমার ছেলের বউ রিজওয়ানাকে আমার বড় মেয়ে যুঁই ফোন করে বলল, আমার স্ত্রীকে যেন না বলে। দাফন কোথায় করবে, লাশ কোথায় নেবে ইত্যাদি, মানে সমস্ত প্ল্যান। কিন্তু আধঘণ্টা পর ডাক্তার এসে বলল, লাইফ সাপোর্ট লাগবে না, উনি আবার ইমপ্রুভ করছেন, এটা, (কাঁটা দেয়া হাতের লোমে হাত বুলাচ্ছেন মুর্তজা বশীর) আল্লাহর ইচ্ছা, এটা আল্লার ইচ্ছা। আমি নামাজ রোজা সেভাবে পালন করি না, ১৯৫৬ সালে ইতালিতে পড়তে যাবার আগে নিয়মিত পালন করতাম। তবে আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, আমি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। সুরা তওবার শেষ আয়াত, সেটা আমি বিশ্বাস করি এবং সবসময় পড়ি, সকাল সন্ধ্যায়: হাসবিয়াল্লা-হু, লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া আলাইহি তাওয়াক্বালতু ওয়া রাব্বুল আরশিল আজীম। এর মানে হলো, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে, স্যার, আল্লাহর ওপর নির্ভর করেই আপনি রিভাইভ করলেন!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, আমি রিভাইভ করলাম। এখনতো ইকোনোমিক অবস্থাও খুব খারাপ। সাড়ে সতেরো লাখ টাকা আমার ট্রিটমেন্টে গেছে। পরে আমি শুনলাম যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমার মেয়ে যুঁইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন। আমি একুশে পদক পেয়েছি, শিল্পকলা একাডেমির ১৯৭৫ সালে প্রবর্তিত কী যেন…
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সম্মাননা?
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, সে বছরে প্রবর্তিত একাডেমি পুরস্কার আমিই প্রথম পেয়েছি। আমি যদি তখন জানতাম তাহলে আমি এই টাকা রিফিউজ করতাম। যেখানে সতেরো লাখ টাকা আমার যা সঞ্চিত অর্থ ব্যয় হয়েছে, আমি যদি হাসপাতালে জানতাম তাহলে আমি বলতাম, তোমরা এই টাকাটা নিও না, ফেরত দিয়ে দিও। এই দেশের কাছে পাঁচ লাখ টাকা আমার মূল্য? বায়ান্নতে ভাষার জন্য লড়েছি, একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের কয়েক দিন পর ‘স্বাধীনতা’–এই চারটি অক্ষর নিয়ে শহীদ মিনার থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছি। এটা আমাকে অপমানিত করেছে প্রচণ্ডভাবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ইকোনোমিক অবস্থার কথা বললেন স্যার, চিকিৎসা হলো কীভাবে?
মুর্তজা বশীর: সেই সময় আমার বড় মেয়ের জামাই সুজাত দৌঁড়াদৌঁড়ি করে আমার কিছু ছবি বিক্রি করেছে। আমার ছোট মেয়ে যুথী সে কিছু টাকাপয়সা দিল। সে চট্টগ্রামে ঢাকা ব্যাংকে চাকরি করে। আমার ছেলে যামী দিল কিছু। এইভাবে আমার চিকিৎসা হলো। এ ছাড়া পিএইচপির সুফি মিজান সাহেব আমার ছোট মেয়ের স্বামী ব্যাংকার কায়েসের হাতে কিছু টাকা দেন। মিজান সাহেবকে আমি চট্টগ্রাম থেকে চিনি। তিনি আমাকে খুব ভালোবাসেন। ঢাকায় আমার বাসায় কখনো বড় বড় মাছ তরিতরকারি বা ফলমূল তিনি পাঠান। তো, এখন হলো কি আমার সঞ্চিত অর্থ সব শেষ। এখন আমাকে ছবি আঁকতে হবে। বড়ো ক্যানভাসে তেলরঙ দিয়ে আঁকা ডাক্তারের নিষেধ। এই যে বুকে পেসমেকার লাগানো, কিন্তু আমার হার্টের সমস্যা না, প্রবলেম লাঙ-এর । রাতে আমাকে বাইপাপ বলে একটি মেশিন বাঁধতে হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: (পাশে থাকা মেশিন দেখিয়ে।) স্যার, এই মেশিনটা?
মুর্তজা বশীর: না, এটা হলো নেবুলাইজার। আগে তিনবেলা নিতাম, এখন একবেলা। আমার লাংসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড জমে যায়, ফলে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্ট হয়। আগে আমার বড় মেয়ে রাত ১২টায় বেঁধে দিতো এবং সকাল ছটায় খুলে দিতো। এখন ডাক্তার ছয়ঘন্টার পরিবর্তে তিন ঘন্টা করে দিয়েছে। তাই রাত ১১ টা থেকে ২টা অবধি সেই মেশিনে শ্বাস নেই। আমার বড় মেয়ে আগে থাকতো বারিধারা ডিওএইচএস-এ; কিন্তু আমার স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য গত পাঁচবছর আমার কমপাউন্ডের অন্য ফ্লাটেই থাকে। যার ফলে কোন ভিড়-টিরে আমার যাওয়া বারণ। যেমন কোন এক্সিবিশনে যাওয়া, কেউ মারা গেলে যাওয়া, যেখানে প্রচুর লোক, সেসব জায়গায় যাওয়া নিষেধ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, আমি যে কথা বলছি, আমি যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করছি তা কি আপনাকে সমস্যা করছে?
মুর্তজা বশীর: না, তোমার সাথে তো কথা বলছি আমিই। যন্ত্রের সাহায্য নিয়ে নেবো একটু পর নিজেকে পরিস্কার করতে। বুঝতে পেরেছ? এইজন্য আমি কোথাও যেতে পারি না। জাতীয় প্রেস ক্লাব আমাকে ভাষা সৈনিক হিসেবে সম্বর্ধনা দিলো, আমি যেতে পারিনি। ওরা বাসায় এসে দিয়ে গেছে। আরেকটা সংগঠন 'ধরিত্রী বাংলাদেশ' শিল্পকলায় সম্মাননা দেবে, আনিসুজ্জামান প্রেসিডেন্ট, আমাকে বলেছে যেতে, তাও যেতে পারিনি। স্পিকার দিবে, ওটা আমার ছেলের বউ গিয়ে এনেছে। ডাক্তার বলছে, তারপিনের গন্ধটা আমাকে এখনো এফেক্ট করতে পারে, কিন্তু কাজ তো করতে হবে, নইলে তো, মরে তো যাবো। তো আমি এখন কিছু কাজ করছি, আমার কিছু ছোটখাটো ক্যানভাস ছিলো, সেই ক্যানভাসে কিছু কাজ করেছি। আর ফাঁকে ফাঁকে কিছু ড্রয়িং করছি। দুয়েকটা ড্রয়িং তোমাকে দেখাতে পারি, কিন্তু পেইন্টিং তোমাকে দেখাবো না। (মুর্তজা বশীর ড্রয়িং-এর খাতা বের করেন পাশের ড্রয়ার থেকে।)
এই যে দেখো, কিছু নারীমুখ, ফিগারের অবয়ব এসব করছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ফেসবুকে দেখেছিলাম আপনি রাজু ভাইয়ের (কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন) চেহারার একটা ড্রয়িং করে দিয়েছেন।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ করে দিয়েছি। একটা দেখে, অন্যটা না দেখে, যেভাবে আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে। ফেসবুকে কি বলেছে! খারাপ হয়েছে বলেছে কেউ?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না না, কেউ খারাপ বলে নাই, আপনার ড্রয়িং তো চেনা যায়।
মুর্তজা বশীর: (আরেকটা ড্রয়িং দেখিয়ে), রাজুর আমি এটাও করেছিলাম, কিন্তু দেইনি, আমার কাছে এটা ভালো লাগেনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্! এটাও তো ভালো স্যার! আপনার শরীরের অবস্থা তো তাহলে স্যার ভালো এখন! কাজ করতে পারছেন?
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, কাজ করছি। খুব বড় ক্যানভাস করতে পারছি না। এবং অয়েল পেইন্টিংও করতে পারছি না, যেহেতু তার্প এবং অন্য ক্যামিকেল আমাকে এফেক্ট করবে, তবে অন্য মিডিয়ামে কিছু কাজ করছি। আর বেশিক্ষণ কাজ করতে পারি না, তাতে বুকে চাপ লাগে। যেমন আজকে হঠাৎ এই ঘন্টাখানিক আগে শরীরটা খুব খারাপ লাগছিলা, কেমন অস্থিরতা। আমার ঐ মনিটর আছে (এক হাতে অন্য হাতের আঙুল টিপে ধরে) দেখা যায় যে হার্টবিট ও এর স্যাচুরেশন কত! তো মিটারে ঐটা দেখলাম ১০৫ মতো হয়ে গেছে, তো এইটা ঠিক না। আমাকে তো নব্বই এইরকম থাকতে হবে। কেন জানি খুব অস্থির লাগছিলো, তো আমি শুয়ে ছিলাম। আর এইদিকে তুমি আসবে। খুব অস্থির লাগছে। এদিকে হয়েছে কি, আমার স্ত্রীর শরীরটা খুব খারাপ। এটা আমাকে মানসিকভাবে খুব ডিস্টার্ব করছে, কারণ সে হাঁটতে পারে না, তাকে দেখে আমার খুব কষ্ট লাগে। মনে হয় তার এই অসুস্থতার জন্য দায়ী আমি, কারণ, স্বচ্ছলতা আমার ছিলো না। নিজে সেল্ফসেন্টার্ড ছিলাম। ফলে তাকে লুক আফটার করতে পারিনি। প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক ছিলাম। এই সংসার সে টেনেছে, ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছে, ছেলেমেয়েদের দ্বিতীয় পরীক্ষা বাড়িতেই হতো, ছেলেমেয়েরা যখন ক্লাস এইট নাইনে পড়ে কি আরো বড়ো ক্লাসে পড়ে, হয়তো স্কুল কলেজের পরীক্ষা দিয়ে এলো, ওদের মা আবার ঐ কোশ্চেন দিয়ে পরীক্ষা নিতো, বাড়িতেই। রান্নাবান্না, সে না হয় এখন করতে পারছে না যেহেতু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, কিন্তু দীর্ঘকাল তো করেছে, এই যে সে অসুস্থ, এজন্য আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। এবং আমি একটা জিনিস তোমাকে বলি, এখানে একটা বই আছে দেখো—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার মানে তো স্যার আপনাকেও প্রতিপালন করেছেন।
মুর্তজা বশীর: তা তো বটেই। এখানে একটা বই আছে দেখো। এই বইটা আমার সত্তর বছরের সময় বেরিয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে, মুর্তজা বশীর:মূর্ত ও বিমূর্ত। আমার কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিকথা ও 'নদী ও নারী'র চিত্রনাট্য এবং প্রাচীন মুদ্রার ওপর প্রবন্ধসমূহ এই গ্রন্থে সংকলিত করেছিলাম। শত ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও ভূমিকা লিখেছিলেন আনিসুজ্জামান, যিনি আমার একজন বন্ধুর চেয়েও বেশি, সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষী। এটার ডেডিকেশনটা আমার স্ত্রীর নামে। (উৎসর্গ পাতা বের করে দেখালেন শিল্পী, ওখানে লেখা, 'তুলু, একজন আত্মসমাহিত ব্যক্তির স্ত্রী,দুঃখ যে নীরবে সহে'। উফফ (শিল্পীর দীর্ঘশ্বাস) নিজেকে নিয়েই তো ছিলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিজের শিল্পভূবন, নিজে!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ। সে তো সংসার সামলেছে, দুঃখ কষ্ট খালি সয়ে গেছে, তার আউটবার্স্টটা এখন। এবং আমি শুনলাম যেটা আমার মেয়ে বললো, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর, আমার স্ত্রী তখন বলতো সারাক্ষণ, তার তো অসুখ হওয়ার কথা না। কেন বললো জানো, আমার জীবনে কোন অসুখ হয়নি, জানো! আমার নাইন্টিন এইট্টিটু থেকে সার্ভিকাল স্পন্ডেলাইটিস হলো তখন আমি হসপিটালে ছিলাম থেরাপি নেওয়ার জন্য, ডাক্তার বলেছিল দরকার নাই, তবুও আমি ছিলাম। আর এই আমি, আমার স্ত্রীর টেনশন এখন, আমার যদি কিছু হয় তাহলে কে দেখবে। কারণ, সে আমাকে দেখেছে সারাজীবন। কারণ, তার ওষুধ, তার ডায়েবেটিসের ইনসুলিন, ফলে হলো কি, এই যে আমি ছবি আঁকছিলাম মে মাসের শেষের দিকে, পুরো জুলাই মাস আমি ছবি আঁকতে পারলাম না। আমার ছবি আঁকাটা দরকার, তা না হলে খাবো কী! সারভাইভালের প্রশ্ন। কিন্তু আমার স্ত্রীর অসুস্থতা আমাকে এফেক্ট করছে, আমি আঁকতে পারছি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবার যখন অসুস্থ হলেন স্যার, সতেরো লাখ টাকা গেলো! প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পুরোটা না দিলেও লাখ পাঁচেক টাকা পেয়েছেন!
মুর্তজা বশীর: খুবই এক্সপেনসিভ চিকিৎসা। এইযে তুমি যন্ত্রটা দেখছো অক্সিজেন নেবার– এর দাম সত্তর হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রী কি পারতন না, সম্মান করে আমার চিকিৎসার খরচটা বহন করতে! আমার জন্য বলছি না, যে কোন শিল্পী সাহিত্যিকেরই রাষ্ট্রের কাছ থেকে এটা প্রাপ্য বলে আমি মনে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, শিল্পচর্চায় ছয় দশক পার করে ফেললেন, আপনার তিরাশিতম জন্মদিন সামনে। নিজের জীবনের দিকে তাকালে কি মনে হয়?
মুর্তজা বশীর: আমি জয়নুল আবেদীনের ছাত্র, ডাইরেক্ট ছাত্র। এই যে জয়নুল আবেদীন মারা যাবার আগের ছবি। আমি প্রথম ডিভিশন পেয়েছিলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ, আপনার স্যার তো আপনারে নিলো না এইখানে চারুকলায়!
মুর্তজা বশীর: কথা সেইটা না, সে যা হোক, আসল কথা আমি কম্প্রোমাইজ করিনি, আমি কমার্শিয়াল কাজ করিনি। বুকজ্যাকেট করিনি, কারো পোর্ট্রেইট করিনি, ধরো আমার খ্যাতি আছে, অনেকে চায় তার পরিবারের কারো পোর্ট্রেইট করবে, আমি এসব করিনি। অর্থের বিনিময়ে আমি নিজের সত্তাকে বিক্রি করিনি। আমার মনে আছে, ৫৮ সালে আমি যখন ইটালি থেকে ফিরলাম তখন মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সের একজন ডাইরেক্টর ছিলেন আমার পরিচিত, তিনি আমাকে বললেন, তখন পাকিস্তানের যতগুলো অ্যাম্বাসি আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, প্রত্যেকটা অ্যাম্বাসির জন্য আমাকে আইয়ুব খানের পোর্ট্রেইট করে দিতে হবে, প্রতিটার জন্য পাঁচশো টাকা দিবে, একাত্তর সালের আগে ত একশো টাকায় লোকের সংসার চলতো, একটিন কেরাসিনের দাম ছয় টাকা, গরুর গোশ দেড়টাকা কেজি, এখন কত! তখন আমি কিন্তু করিনি। করিনি। কত শিল্পী আছে কম্পিউটার গ্রাফিক্স করছে, কোন কোম্পানি হয়তো টাকা দিচ্ছে, আমি বাণিজ্যের কাছে নিজের শিল্পসত্তা বিক্রি করে দিইনি। ফলে আমার তো কোন ইনকাম নাই। সুতরাং টোটাল নির্ভরশীল আমি আমার ছবির ওপর। এগুলো কিন্তু অর্ডারি ছবি না। আমার স্বাধীন চেতনা থেকে একেবারে আসা চিত্রকর্ম। তো ধরো এইটা, এখন তো আমার অস্তিত্বের লড়াই। এই যে সামনে আমার এক্সিবিশন, ঐটাতে যদি ছবি বিক্রি না হলে আমাকে আমার ঘরের জিনিসপত্র বেচতে হবে। চিকিৎসা, জীবনযাপনের খরচ এতো বেড়েছে, তাহলে চলবে কী করে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু স্যার, আপনার তো এমন হওয়ার কথা না। আমার জানামতে আপনার কিছু বাঁধা বায়ার আছেন। অনেকেই আপনার চিত্রকর্ম ভয়ঙ্কর পছন্দ করেন এবং প্রতিযোগিতা করে কেনেন। এমনকি আপনার কাজ নকল করেও, সিগনেচার নকল করেও বেচেছে অনেকে!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, এমন ঘটনা একটা হইছে, ওইটাতো থানা পুলিশও করলাম, কিন্তু কিছু তো হলো না। সিগনেচার নকল করে আমার ছবি বলে বিক্রি করা হয়েছে। তবে যারা আমার ছবি আমি ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে কিনেছে তারা যদি আমাকে দেখায়, ব্যাপার হলো কি, সিগনেচার নকল করা সোজা, কিন্তু ধরো আমার প্রত্যেকটা পেইন্টিং এ আমার একটা সিক্রেসি আছে, যদি আমাকে দেখায় তাহলে আমি বলে দিতে পারবো পেইন্টিংটা আমারই করা নাকি নকল। সে সিক্রেসিটা আমি ছাড়া কেউ জানে না। যেমন আমি এইট্টি এইটে লাহোরে একটা বিয়েনালে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে করাচীতে তখন ডিফেন্স সোসাইটি ওল্ড মাস্টার্সদের একটা 'কনটেম্পোরারি আর্ট অব পাকিস্তান'-এর প্রদর্শনী দেখতে আমাকে নিয়ে যান আর্দেশার কাওয়াসজী, পাকিস্তানের তিনি খুব নামকরা আর্ট কালেক্টর, শুধু শিল্পসংগ্রাহকই ছিলেন না, তার করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে দুটি জাহাজ চলাচল করতো। একটির নাম রুস্তম আরেকটির নাম হরমুজ। ৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা হরমুজ ডুবিয়ে দিয়েছিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নামটা কী বললেন স্যার?
মুর্তজা বশীর: আর্দেশার কাওয়াসজী (Ardeshir Cowasjee), পরবর্তীকালে সে জেলেও গেছিলো, ভুট্টোর সময়, তার কাছে রেমব্রান্টের কাজ ছিলো, তার কাছে পিকাসোর কাজ ছিলো– সে আমার কালেক্টর ছিল। করাচীতে সেই এক্সিবিশনে, ওখানে আমার দুটো 'ওয়াল' সিরিজের কাজ ঝুলানো দেখলাম, আমি একটার দিকে আঙুল তুলে বললাম এইটা আমার কাজ না। তখন সে গ্যালারির কিউরেটর, ভদ্রমহিলা মাঝারি বয়েস, তাকে ডাকলো, তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, কাজ কার! সে বললো, মুর্তজা বশীরের কাজ। মুর্তজা বশীর কোথায়? কাওয়াসজী প্রশ্ন করলেন। তো ভদ্রমহিলা বললেন, উনি তো ইস্ট পাকিস্তানে ছিলেন, এখন তো কোথায় জানি না, বোধহয় তিনি লন্ডনে থাকেন। তো হাত দিয়ে সামনে দাঁড়ানো আমাকে দেখিয়ে বললেন যে, উনাকে চেনেন? ভদ্রমহিলা বললো, না আমি উনাকে চিনি না। কাওয়াসজী বললেন, উনি মুর্তজা বশীর। ভদ্রমহিলা সালাম দিলেন। এবং কাওয়াসজী বললেন যে, মুর্তজা বশীর বলছেন ছবিটা উনার আঁকা না। ভদ্রমহিলা বললেন, হাউ কাম? আমি বললাম আমার একটা সিক্রেসি আছে। প্রত্যেকটা ছবির পেছনে একটা সিক্রেসি আছে। নামানো হলো, আমি দেখিয়ে দিলাম তাকে যে একটা জেনুইন আরেকটা জেনুইন না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিক্রেসি তো জানতে ইচ্ছে করতেছে স্যার!
মুর্তজা বশীর: না না আমি এটা প্রকাশ করবো না, তাইলে যারা এটা জেনে যাবে তারা হয়তো নকল ছবিতেও এটা দিয়ে দেবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না স্যার, বলতে হবে না, ঠিক আছে। নইলে দেখা যাবে আবারো নকল কাহিনী শুরু হয়ে যাবে।
মুর্তজা বশীর: আর আমার ছবিতেও কিছু ব্যাপার আছে, যেইটা আমি ছাড়া শুধুমাত্র আর দু'একজন হয়তো বুঝতে পারে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, আপনার ছবি যে নকল হলো, এটা স্যার কারা করেছে?
মুর্তজা বশীর: এইটা নিয়ে তো আমি থানা পুলিশও করলাম। তারপরে ওইটা বেশিদূর এগোল না। এবং আমি খুব অবাক হলাম, বহু আর্টিস্ট আমাকে ফোন করে এটা কম্প্রোমাইজ করতে বললো। বলে সে খুব গরীব মানুষ, তার বউয়ের দুধের বাচ্চা নিয়ে ছুটে আসে আমার কাছে, আপনি এটা উেইথড্র করে ফেলেন। আমি বুঝলাম না ঐখানে আর্টিস্টদের স্বার্থটা কী! আমি তো আরো ভালো কাজ করেছিলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ।
মুর্তজা বশীর: তো যারা আর্ট নকল করছে, এইটা তো কোলকাতায়ও হচ্ছে, জয়নুল আবেদীনের কাজ বেরুচ্ছে অনেকের ঘর থেকে, আমাদের দেশে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমরা স্যার এটা নিয়ে একটু কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম!
মুর্তজা বশীর: আমি বলি কার কার হচ্ছে। কিবরিয়ার কাজ হচ্ছে, সুলতানের কাজ হচ্ছে, কামরুল হাসান হচ্ছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নকল যে হচ্ছে এই বিষয়ে স্যার আপনার অভিজ্ঞতাটা কেমন! এটা কি দেখে মনে হয়েছে আপনার!
মুর্তজা বশীর: শোনো, পেইন্টিংতো হচ্ছে আমার সন্তানের মতো। প্রত্যেকটা পেইন্টিং আমার মুখস্ত, আমার মগজে ইমেজ হয়ে আছে। নকল কাজটা দেখেই প্রথমে আমার খটকা লাগলো এই ধরনের কাজ তো আমি করি না। তারপর ভাবলাম হয়তো করেছি, ভুলে গেছি, তারপর সিগনেচার দেখলাম, আমার সিক্রেট কোড দেখলাম, একেবারে নিশ্চিত হলাম যে এইটা আমার কাজ না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিগনেচার কি স্ক্যান করে নকল স্যার!
মুর্তজা বশীর: আহা, বুঝছো না কেন! একজন শিল্পশিক্ষার্থী কিন্তু নকল করতে পারে। সিগনেচার তো অহরহ করছি বিভিন্ন পেইন্টিং-এ। সেটা দেখে নকল করা তো খুব কঠিন না। আর ছবি বিভিন্ন জায়গায় ছাপা হচ্ছে, পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, ফলে যারা করেছে তারা সচেতনভাবেই করেছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু স্যার এভাবে তো আর্ট কালেক্টরের মতো শিল্পীও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, করণীয় কী!
মুর্তজা বশীর: করণীয় হলো, ব্যাপার হলো কী, এক নম্বর হলো, আগে তো কালেক্টর ছিলো না, এখন মোটামুটি কালেক্টর হয়েছেন অনেকে, কিন্তু তাদের চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশুনা তেমন নাই। পাকিস্তান আমলে ছবি কিনতেন কারা? বেশিরভাগ বিদেশী অ্যাম্বাসেডররা কিনে নিজের দেশে স্যুভেনির হিসেবে নিয়ে যেতেন। তারা বেশিরভাগ পছন্দ করতেন ইগজোটিক সামথিং, যেমন ধরো কলসী কাঁখে মেয়ে, পালতোলা নৌকা যাচ্ছে এমন ছবি। তারপরে এখানে যখন অর্থনৈতিক চাঙা হলো, পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়নি, তখন প্রথমে ব্যাংকগুলো ছবি কেনা শুরু করলো, এবং কিছু কিছু যারা বিত্তবান হলো তখন তারা কিছু কিছু ছবি কেনা শুরু করলো। বাংলাদেশে কিন্তু বাঙালি বায়ার ছিলো না। বাংলাদেশ হওয়ার পরও ছিলো না। বাংলাদেশে ছবি কিনতো প্রথমদিকে সরকারী সংস্থাগুলো। অমুক ব্যাংক, তমুক ব্যাংক, শিল্পঋণ সংস্থা, পল্লী উন্নয়ন সংস্থা এমন সব প্রতিষ্ঠান মানে যারা আমার ছবি কিনতো। কিন্তু গত দশ পনেরো বিশ বছরের মধ্যে কিছু গার্মেন্টস শিল্প এখানে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ফলে গার্মেন্টস মালিকরা, তারা ইয়াং, তারা বিদেশে পড়াশুনা করে এসেছেন, পড়াশুনা করতে গিয়ে অবসর সময়ে মিউজিয়াম গ্যালারি ঘুরেছে, ফলে তাদের একটা আর্টের প্রতি টান তৈরি হয়েছে। এবং তারা শিক্ষিত। ফলে হলো কী, এখন মূল বায়ার কিন্তু তারা; আইদার তাদের গার্মেন্টস আছে অথবা বায়িং হাউস আছে। সরকারী সংস্থা কিন্তু এখন খুব কম কিনছে। সরকারী সংস্থা কেনে, যখন যেই সরকার আসে, সেই সরকারের পছন্দমতো যারা শিল্পী…
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: লাইনঘাট যাদের ভালো!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, লাইনঘাট যাদের ভালো তাদের ছবি কিনে সরকার। কারণ যেহেতু এটা ব্যক্তিগত রুচি দিয়ে কেনা হয় না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে স্যার সারাজীবন কম্প্রোমাইজ করলেন না, এখন এই শেষবয়সে কি স্যার মনে হয় না, যদি একটু আধটু কম্প্রোমাইজ করতেন তবে এখন চিকিৎসার সময় টানাটানি পড়তো না!
মুর্তজা বশীর: শোনো শিমুল, তুমি কবিতা লেখো, তুমি বুঝবে। আমি কম্প্রোমাইজ করিনি। আমি আমার আর্টকে পণ্য হিসেবে নিইনি। নাইনটিন ফিফটি ফাইভে আমার বাবা, তিনি আমাকে তাঁর বইয়ের একটা প্রচ্ছদ করতে বলেছিলেন। বিদ্যাপতি শতক। আমাকে বলামাত্র প্রথমেই আমি তাঁকে বললাম, আপনি আমাকে কত পয়সা দেবেন! শুনে তিনি থতমত খেয়ে গেছেন। বললেন, আমি তোমার পিতা, আমি তোমাকে পড়ালাম, আর্ট পড়ালাম, তুমি পয়সা চাচ্ছ! আমি বললাম, দেখেন, এটা তো আপনার কর্তব্য, পিতা হিশেবে পুত্রের শিক্ষাদান। আপনি তো অন্য জায়গায় করালে পয়সা দিচ্ছেন। আপনি অন্য জায়গায় যা দেন তার অর্ধেক আমাকে দেন। ডু ইউ বিলিভ, উনি আমাকে অর্ধেক পয়সা দিলেন, সেই আমলে পঞ্চাশ টাকা দিলেন। এইযে এইখানে একটা চিঠি, (হাতে চট্টগ্রাম থেকে আসা 'সুপ্রভাত বাংলাদেশ' পত্রিকা খুলে), আমি যখন নিজের আর্টের জন্য লড়াই করছি, তখন আমার বাবা লিখছেন, আমি তখন লাহোরে, বিশে জুলাই ১৯৬০, আমার ডাকনাম বকুল, আমার বাবা লিখেছেন, 'তুমি কতদিন এইরূপ ভ্যাগাবন্ড অবস্থায় থাকিবে জানি না। শুনিলাম লাহোরে তোমার তিনশো টাকা বেতনে একটি চাকুরি হইয়াছিল। তাহা তুমি কেন স্বীকার করিলে না জানি না। আমি ও তোমার মা তোমার ভবিষ্যতের জন্য সতত চিন্তিত। যাহা হউক, তুমি এখন কি করিতেছ ও ভবিষ্যতে কি করিতে চাও তাহা জানাও। আমরা ভালো আছি। তুমি ভালো থেকো। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—' দেখো, আমার বাবা দেখো, আর্ট সম্পর্কে তার ইন্টারেস্ট ছিলো। এই যে লোকে বলে শহীদুল্লাহ সাহেবের আর্ট সম্পর্কে ধারণা ছিলো না, এইটা কিন্তু মিথ্যা কথা। এই যে পত্রিকায় লেখা হচ্ছে আমাকে আর্ট স্কুলে পড়াতে চাননি, এসব মিথ্যা কথা। আসলে উনি প্যারিসে ছিলেন। উনি যেটা বলেছিলেন আমাকে, "দেখো আমি প্যারিসে ছিলাম, তুমি আমার সন্তান, দুঃখ কষ্ট হবে এটা আমি চাই না। শিল্পীদের জীবন তো তাই। তুমি গ্রাজুয়েশন করো, কিন্তু আয়ের ব্যবস্থাও করো।" কিন্তু আমি তার কথা শুনিনি। তারপরে তিনি যেইটা করলেন, ১৯২৭ সালে প্যারিস থেকে যখন তিনি ফিরে আসেন, তখন ওখানকার ভারতীয় ছাত্রদের এসোসিয়েশন তাকে সম্বর্ধনা দেয়। সম্বর্ধনায় তাকে কিছু উপহার দেয়া হয়। তাকে তো চর্যাপদের ওপর বই দিতে পারতো, ভাষাতত্ত্বের ওপর বই দিতে পারতো, কিন্তু তারা তাঁকে দিলো দুই খণ্ড ল্যুভ মিউজিয়ামের আর্ট কালেকশনের ওপর গ্রন্থ। কেন? বিকজ হি ওয়াজ এ গ্রেট আর্ট লাভার। এইদুটি বই তিনি, আমি যখন ১৯৪৯ সালে আর্ট স্কুলে ভর্তি হলাম আমার হাতে দিলেন, বললেন এগুলো আজ থেকে তোমার। এবং আমার প্রদর্শনীর তিনি খবর রাখতেন। এই যে এখানে একটা চিঠিতে তিনি লিখছেন ৬১সালে, "ঢাকায় কিছুদিন পূর্বে ছবি প্রদর্শনী করিয়া আমিনুল ইসলাম পনেরো হাজার টাকা পাইয়াছে…"
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, পনেরোশো টাকা পাইয়াছে।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ পনেরোশো টাকা পাইয়াছে, "তুমিও এখানে আসিয়া প্রদর্শনী করো। সফির মুখে সংবাদ শুনিলাম (সফি মানে আমার বড় ভাই, গীতি আরা সাফিয়ার বাবা) লাহোরে যখন যত্র আয় তত্র ব্যায় তখন ঢাকায় আসাই উচিত। এইখানে স্কুল অব আর্টে হয়তো পদ পাইতেও পারো!" আমি চাকরী পাইনি যদিও প্রথম ডিভিশনে পাশ করেছিলাম। তখন পদ বিজ্ঞাপিত হতো না। জাস্ট চুজ্ অ্যান্ড পিক্। অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছাই সব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সো কনসার্ন্ড অ্যাবাউট ইউ?
মুর্তজা বশীর: হুমম খুব সজাগ ছিলেন।শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি আগেও আমাকে এটা বলেছিলেন বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করার সময়। বলেছিলেন, বাবার কাছ থেকেই সবচেয়ে বড় উপহার পেয়েছেন। এই উপহার কি গ্রন্থদুটি? ল্যুভ মিউজিয়ামের আর্ট কালেকশনের গ্রন্থগুলো?
মুর্তজা বশীর: নিঃসন্দেহে গ্রন্থদুটি বড় উপহার। কিন্তু ঐটার চেয়ে বড় উপহার হলো, যে নাইন্টিন সিক্সটি ওয়ানে বাংলা একাডেমীতে একটা প্রদর্শনী হয়েছিল, সেই উপলক্ষে ছোট্ট আলোচনাসভা— 'মডার্ন আর্ট এন্ড মডার্ন ম্যান'। এ.কে ব্রোহী পরে মন্ত্রীও হয়েছিলেন পাকিস্তানের, তিনি আমার বাবাকে বলেছিলেন, শহীদুল্লাহ সাহেব আপনার ছেলেতো মডার্ন আর্ট করে, তো আপনি বলেন। বাবা দাঁড়িয়ে বললেন, মডার্ন আর্টের মতো আমার ছেলে আমার কাছে দুর্বোধ্য। সেটা বলে তিনি বাসায় আসলেন। প্রদর্শনীতে আমার করা একটা কাজ ছিলো, ডেড লিজার্ড বলে। একটা মৃত টিকটিকি। এক্সিবিশন থেকে জুলফিকার আলি ভুট্টো, তখন ফরেন মিনিস্টার ছিলো, ছবিটা ছয়শো টাকা দিয়ে কিনে। চেক দিয়েছিল। আমার বাবা বললেন, দেখো আমি প্যারিসে ছিলাম, অনেক গ্যালারি ঘুরেছি, আর্ট তো সৌন্দর্য, সুন্দর, তো তোমার এসব আর্ট কিম্ভুতকিমাকার, এগুলোতে তো সুন্দর কিছু নেই। এইগুলো কী আঁকো! আমি বললাম দেখেন, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কে? উনি থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন মানে! আমি আবার বললাম, আপনি কে? উনি বললেন, আমি তোমার বাবা। আমি বললাম, আপনি আমার বাবা আমি আপনার ছেলে ঠিকই, কিন্তু আমরা সব মৃত, অশরীরী, উই আর ড্র্যাগিং আওয়ারসেল্ফ। উনি অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,তা হয়তো হবে, তবে, তুমি কি এঁকেছো আমি জানি না, তবে এই ছবিটা আমাকে খুব নাড়া দেয়। দিস ইজ দ্যা রিয়েল রিকগনিশন, একুশে পদক যখন আমি উনিশশো আশি সালে পেলাম, তখন আমি এত তৃপ্তি পাইনি কিন্তু আমার বাবার এই উপলব্ধি মনে হয়েছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তাই না?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দুর্দান্ত! স্যার আপনিতো অনেক কিছু করেছেন। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, আর্ট ডিরেকশন দিয়েছেন। উপন্যাস, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখেছেন। বলা যায় শিল্পের সব শাখায় অন্তত ঢুঁ মেরেছেন আপনি। মুদ্রা নিয়ে গবেষণা করেছেন। এর মধ্যে আপনি চিত্রকলা ছাড়া আলাদাভাবে এগিয়ে রাখেন কোন কাজগুলোকে? অনেক শখও তো স্যার আপনার!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ ছিলো আমার। প্রাচীন মুদ্রায় ইতিহাসকে খুঁজেছি। হারিয়ে যাওয়া বাংলার সুলতানি আমলের ইতিহাস। এই যে জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি যা কিছু করেছি, এখন একভাবে দেখলে সবকিছুকেই মনে হয় অর্থহীন এবং জঞ্জাল। ফলে নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়। আমি তো অনেককিছু করতে চেয়েছি। মৃত্যুকে অতিক্রম করে যেতে চেয়েছি। মৃত্যুকে অতিক্রম, সোজা কথা না। জীবিত অবস্থায় অনেকে খ্যাতিমান হয়, কিন্তু দেখা যায় মৃত্যুর পর বছরখানেক পর সবাই ভুলে যায়। এই যে আজকে, পত্রিকায়, টেলিভিশনে নানা চ্যানেল পত্রিকা আমার ইন্টারভিউ চায়, কেন চায়? তারা মনে করছে যে, আমি কিছু একটা! কিন্তু আমার মৃত্যুর পরে যদি চ্যানেলগুলি আমার ওপর অনুষ্ঠান করে তাহলে বুঝবো আমি কিছু ছিলাম। আমি ছিলাম, কিছু একটা ছিলাম, এইটার জন্য ঐরকমের সৃষ্টি করতে হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি তো সেরকম কাজ করেছেন স্যার!
মুর্তজা বশীর: বললাম তো শিমুল, আমি বোকা না। আমি জানি আমি কী করেছি। আমি নিজে যখন বিচার করি যে মৃত্যুকে অতিক্রম করার মতো যে সৃষ্টি, আমি যখন যে ছবি এঁকেছি সেই সময়টায় সেটা সমাদৃত হয়নি। আমার জীবিত অবস্থায় যেই সিরিজটা লোকে প্রশংসা করেছে সেটা হলো প্রজাপতির ডানার রঙ ও কাঁপন নিয়ে সিরিজটা, 'উইংস'– এ ছাড়া কোনটাই কিন্তু লোকে সেই সময় গ্রহণ করেনি। আমি জানি না, আমি সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলাম কি না!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: গবেষণা নিয়ে কী বলবেন স্যার?
মুর্তজা বশীর: দেখো, আমি ইতিহাসবিদ না। মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান এবং বাংলার তৎকালীন সমাজ– এইটা আমার একটা ইউনিক ইন্টারপ্রিটেশন বহনকারী গবেষণা। এবং এইটা এখন স্বীকৃত। আমার মৌলিক কিছু, ছয়টা লেখা বাকি। হসপিটালে যখন এবার আমি মারা যাওয়ার মতো, তখন আমার কান্না পাচ্ছিলো লেখাগুলোর জন্য। তো আমরা যখন বাংলাদেশের শিল্পকলার কথা বলি, শুধু বাংলাদেশ নয়, বেঙ্গল আর্টের কথা যখন বলি, তখন লামা তারানাথ তিব্বত থেকে সিক্সটিন সেঞ্চুরিতে এসে সে বেঙ্গল আর্ট সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন, পিতা পুত্র ধীমান ও বিটপালের কথা। কখন বলছেন, সিক্সটিন সেঞ্চুরিতে, পিরিয়ডটা হলো টেন টু ইলেভেন্থ সেঞ্চুরি। তখন কিন্তু পালরা আর নাই, কারণ পালদের পরে সেনরা আসলো, তারপর বখতিয়ার খিলজী ১২০৬তে। সমস্ত কিছু তছনছ হয়ে গেছে, শহর নগর বনায়ন হয়ে গেছে। এখন আবার মানুষ বেড়ে গেছে, বন কেটে শহর হচ্ছে, নগরায়ন হচ্ছে– তখন সবকিছু আবার বেরুচ্ছে। ধীমান বিটপাল বলে কিন্তু, আমি যে গবেষণা করেছি, লুডার লিস্ট বলে একটা লিস্ট আছে, মাটির নীচে যত কিছু পাওয়া গেছে, আমি সে লিস্ট চেক করেছি, আজ পর্যন্ত ধীমান বিটপালের নাম নাই। নামগুলি কোথায় আমরা সাধারণত পাই? রমেশ মজুমদার তাঁর বাংলাদেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ গ্রন্থে নাম উল্লেখ করেছেন আটজনের। তাম্রলিপি বা ভাস্কর্যে পাল ও সেন আমলের আরো তিনজন খুঁজে পেয়েছি। নামগুলি পাওয়া গেছে তাম্রলিপি, কপার প্লেট এমন সব এক্সকেভেশনের মধ্যে, বরেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায়। তো এইরকম, নাম পাওয়া যায় দশজনের। এই অনুসন্ধানী বিবরণগুলো আমি লিখতে চাই। যেমন ধরো একটা লোক ঢাকা শহরে এসে, ঢাকার ওপেন এয়ার স্কাল্পচারের ওপর একটা গবেষণা করবে, ওপেন এয়ার কী দেখলো? দেখলো শাপলা চত্ত্বর– কে করেছে? এ জেড পাশা। তারপর দোয়েল চত্ত্বর–কে করেছে? এ জেড পাশা। এখানে সার্ক ফোয়ারা– কে করেছে? নিতুন কুণ্ডু– এইরকম করে গাজীপুরে ওইটা কে করেছে– আব্দুর রাজ্জাক, টিএসসির সামনে এইটা কে করেছে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শ্যামল চৌধুরী।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, এখন এইখানে তুমি যদি এক হাজার আর্টিস্ট-এর লিস্ট করো দেখবে এ জেড পাশা নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ, অবশ্যই নাই।
মুর্তজা বশীর: হি ওয়াজ ভেরি ওয়েলনোন পপুলার আর্টিস্ট। এভারগ্রীন পাবলিসিটি বলে তার একটা প্রতিষ্ঠান ছিলো, বগুড়ার ছেলে, এবং আমি যখন বগুড়ায় করনেশন স্কুলে পড়ি তার আর্ট দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি, যে আমি কিভাবে এমন আর্ট করতে পারি! তো বাংলাদেশের আর্টে এ জেড পাশার যেমন কোন নাম গন্ধ নাই তেমনই…
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা স্যার, লামা তারানাথ!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ লামা তারানাথ যখন খুঁজছে তখন ধীমান বিটপাল ওয়াজ এ পপুলার ফেনোমেনা। যেমন আমার ছাত্র ফণীন্দ্রনাথ চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে ছিলো, তাকে সবাই চিনতো চট্টগ্রামে। কারণ সে এই পোর্ট্রেইট করছে, অন্যদের ব্যানার ফেস্টুন বানিয়ে দিচ্ছে, শ্মশানের শিবের মূর্তি করছে, হি ওয়াজ ভেরি ওয়েলনোন। তো ধীমান বিটপাল এমনি ছিলেন, জনপ্রিয় কিন্তু মেজর কোন আর্টিস্ট না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এইখানে স্যার আমার প্রশ্ন আছে আপনার কাছে, আপনার পেইন্টিং-এর যে ধরন, যেমন দেয়ালে উৎকীর্ণ সুরা নিয়ে, ইসলামের সাথে সম্পর্কিত অনেক মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন আপনি, আবার আপনার কাজে যৌনতা বা সেক্সুয়ালিটির প্রবল রিপ্রেজেন্টেশনও আছে। আপনি আপনার কাজে যৌনতার প্রভাবটাকে কিভাবে ব্যখ্যা করবেন? বা ইরোটিসিজমকে?
মুর্তজা বশীর: ঐভাবে ইরোটিসিজম তো খুব আসেনি। তবে ইন্দ্রিয়গত বলা চলে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেটাই যদি জানতে চাই স্যার!
মুর্তজা বশীর: ধরো আমি যখন ছবি এঁকেছি, বিশেষ করে, নারী বা ল্যান্ডস্কেপ বা ধরো বিমূর্ত, রঙ লাগাচ্ছি যখন, আমার মধ্যে কিন্তু একটা সেনসেশন কাজ করছে, একটা অতীব সুন্দরীর গায়ে হাত দিলে যেমন একটা সেনসেশন হয়, ঠিক ঐরকম আমার ঘটছে। কিংবা ধরো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ছে তখন যেমন একটা মন চনমন করে ওঠা– হয় না? সেরকম হয়েছে আমার। আমি এটাকে সেনসুয়ালিটি বলতে চাই। আর্টটাও তো, আর্টটা তো মূলত ইন্দ্রিয়ের ব্যাপার। তাই না?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তা ঠিক, যেটা বলছিলাম স্যার, ইরোটিসিজম না আসাটা আপনার শুদ্ধবাদিতা মনে হয় না? এটা কি আপনার শিল্পচেতনার সাথে যায়?
মুর্তজা বশীর: ইরোটিসিজম সম্পর্কে যেটা পণ্ডিতরা বলেছেন,প্রচুর স্কাল্পচার হয়েছে,
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কোনারক
মুর্তজা বশীর: খাজুরাহো তে হয়েছে, কারণটা হলো যেখানে তান্ত্রিকরা থাকতেন, তাদের খুব ঘনবসতি ছিলো, সেখানে এসব হয়েছে। তিনটা পয়েন্ট আছে। একটা হলো, তান্ত্রিক কাল্ট যেখানে সেখানে হয়েছে। দুই, এইসব দেখে তুমি নিজের চিত্তকে সংযত করে কতটা সংযম করে মন্দিরে আসতে পারো, থাকতে পারে তার জন্য হয়েছে, তৃতীয় হলো, ঝড়বৃষ্টি বর্ষা এসব অপশক্তি থেকে মন্দিরকে রক্ষা করার জন্য নাকি এসব করা হয়েছে। আমি এই তিনটা ভার্সনের কোনটাকেই বিশ্বাস করি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কেন স্যার?
মুর্তজা বশীর: আমি তো মন্দিরের ওপর প্রচুর কাজ করেছি পশ্চিমবঙ্গে। আমি প্রথমবার নাইন্টি সিক্সে আটটা ডিস্ট্রিক্টএর একশো পঁচিশটা গ্রামে কাজ করি, তবে ৯৩ তে প্রথম গেছিলাম ৮ টা জেলায় একশো পঞ্চাশটা গ্রামে। হাওড়া জেলার ঝিকিরা বলে একটা গ্রাম সেই গ্রামটার আয়তন হবে আমাদের চারুকলা অনুষদের মতো, চারটি পরিবার থাকে, তাদের চারটে মন্দির আছে। এই মন্দিরগুলোর দুটোর মধ্যে ইরোটিক পোড়ামাটির টালি আছে, দুটোর মধ্যে নাই, কারণটা কি! কারণটা হলো তখনকার সমাজব্যবস্থা, কুলীন প্রথার কারণে সমাজের ব্যভিচার বেড়ে যাচ্ছিল, শিল্পীরাও আশে পাশে যা দেখেছে তাই এঁকেছে, খুব চিন্তা করে আঁকেনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার এই যে, আপনার প্রদর্শনী করতে যাচ্ছেন, সেটা নিয়ে যদি বলেন! কিভাবে আঁকা হলো ছবিগুলো।
মুর্তজা বশীর: প্রথম হলো যে, ক্যানভাস করার পর অনেকসময় কিছু ক্যানভাস বেঁচে যায় দুপাশ থেকে, চিলতের মতোন, ধরো তিন বাই তিন ক্যানভাস করলাম তো ক্যানভাসের একটা ছোট্ট স্ট্রিপ বেরিয়ে গেল। আমি ওই স্ট্রিপটা ফেলতামনা, ঐটা দিয়ে আবার ছোট একটা ফ্রেম করে ফেলতাম। গত পনেরোবিশ বছর ধরে এইগুলি আমার কাছে ছিল। তখন ভাবলাম যে এইগুলি করি। এগুলি হয়তো শস্তা দামে বিক্রি করা যাবে। একটা ড্রয়িং আমার যেমন ষাট সত্তর হাজার টাকায় পাওয়া যায়, এগুলো না হয় একটু বড় সাইজে এক লাখ এক লাখ বিশ করে দেয়া যাবে। এই চিন্তা করে আমি শুরু করেছিলাম কাজগুলো। এখন আমার মূল পরিকল্পনা, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে আমি যেটা করতে চাই সেটা হলো, আমরা কিন্তু প্রকৃতিতে বলো, যেকোন জিনিসে বলো পুরোটা কিন্তু আগে দেখি না, কিছু একটা প্রথমে আমাকে স্ট্রাইক করে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কালার! সেন্স!
মুর্তজা বশীর: হোয়াটএভার, কালার হতে পারে, তার অবয়ব হতে পারে, একটা গাছের ওপর আলো পড়লে হয়তো একটা পাতা, হলুদ পাতা, আমরা যখন দেখি প্রথম একটা কিছু দিয়ে আকৃষ্ট হই। গ্লিম্পস! শাড়ির আঁচল। তো সেই ফার্স্ট গ্লিম্পসটা আমি আঁকার চেষ্টা করছি। এবং করবো। এই ধারণাটা নিয়ে কিছু কাজ করেছি, আরো কাজ করতে হবে কিছু।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার প্রদর্শনীতে আপনার কতগুলো কাজ স্থান পেতে যাচ্ছে?
মুর্তজা বশীর: হা হা হা, গোপন কথা জেনে ফেলতে চাও! আমি আবার নিউমারোলজিতে বিশ্বাস করি,আমার প্রথম হলো যে আঠাশ মানে দুই আর আট দশ, এক আর শূন্য এক। অথবা সাইঁত্রিশ, অথবা ছেচল্লিশ। এটাই ভেবেছিলাম যে আঠাশটি কাজ করতে পারবো। কিন্তু শারীরিক অসুবিধা, স্ত্রীর শরীর খারাপ, তো এখন আমি কী করেছি যে কিছু কোলাজ আমি করেছিলাম ৯০ ও ৯১ সনের দিকে। সেই কোলাজগুলোকে আমি এক্সিবিট করবো। যেমন ধরো, ইরাক যুদ্ধের সময় যখন বোম্বিংটা হচ্ছে, তখন আমি কোলাজ করেছিলাম নো মোর ওয়ার, বা লিবার্টি নাউ, স্ট্যাচু অব লিবার্টি লজ্জ্বায় হাঁটু গেঁড়ে বসে গেছে। এই ধরনের আমি কিছু কোলাজ করছি। এইগুলো আর আর আমার কিছু সাম্প্রতিক ড্রয়িং দিয়ে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার প্রদর্শনী টা তো কায়াতে হচ্ছে। এত গ্যালারী থাকতে কায়া কেন বেছে নিলেন, উত্তরা তো আপনার বাসা থেকে অনেক দূরে।
মুর্তজা বশীর: কায়াতে করার কারণ হলো, দেবদাস চক্রবর্তী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমার ভাইয়ের মতো। তার ছেলে গৌতম। সে আমার ছেলের মতো। আমি তাকে আমার পুত্রর মতোই দেখি। ফলে ওর প্রতি আমার একটা অবলিগেশন আছে। পিতার যেমন ছেলের প্রতি থাকে তেমন। যেমন ধরো এই যে আমি অসুস্থ হলাম, গৌতম তখন কাম্বোডিয়াতে ছিলো, সে ইমিডিয়েটলি তার গ্যালারির ছেলে জামিল তাকে দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। যা দিয়ে আমাকে আইসিইউ তে নিয়ে আসলো। তারপরে গৌতম ঐখানে কাজ প্রায় শেষ না করেই ফিরে আসলো, ছবি বিক্রি করলো, কয়েকটা ছবি বিক্রি করে, উইং ছবি বিক্রি করে আমার মেয়েকে টাকা দিলো, বললো যে আমি গ্যালারির থারটি পার্সেন্ট কমিশন কেটে এই যে এই টাকাটা দিচ্ছি। তার পর সে একলাখ টাকা বের করলো, বললো চাচার চিকিৎসার জন্য ভাতিজা দিলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা অবশ্যই ছেলের কাজ।
মুর্তজা বশীর: আরেকটা লোকের ব্যবহারে আমি অভিভূত হইছি, সাজু আর্ট গ্যালারির সাজু এই রমিজ সাহেব। তার কাছে আমার তিনটা ড্রয়িং ছিলো, আমার শরীরটা যখন খারাপ, হাসপাতালে যাওয়ার চার পাঁচদিন আগে আমি উনাকে ফোন করলাম, বললাম, রমিজ সাহেব আমার ড্রয়িং কি বিক্রি হয়েছে, বলে না স্যার অমুক একজন তো চয়েস করছিলো, এখনো টাকা পয়সা তো দেয় নাই। পঞ্চাশ হাজার টাকা করে দাম। তো, আমি বললাম আমার শরীরটা ভালো না, টাকা পয়সা দরকার ছিলো, সে কি করছে জানো, হসপিটালের আই সি ইউতে সে টাকা নিয়ে এসে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলো, বলে স্যার, আমি কিন্তু কমিশন কাটি নাই। এইটা একটা বিরাট ব্যাপার, সে তো ব্যাবসায়ী লোক, তার তো থার্টি পারসেন্ট কমিশন কেটে নেবার কথা। সে কমিশন কাটেনি, আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার আপনার নতুন কাজ দেখতে দেবেন না।
মুর্তজা বশীর: না না এইটা সারপ্রাইজ থাকুক। আগে আগে হলে অনেকে আবার দেখা যাবে নকল করে ফেলবে, প্রযুক্তির কারণে ছেলেমেয়েরা এখন সহজে কপি করতে পারে। প্রদর্শনীতেই দেখুক সকলে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে আপনারও স্যার নিজের কাজ অন্য কেউ মেরে দেবে এমন ভয় আছে?
মুর্তজা বশীর: ভয় না, তবে এমন তো হয়েছে আমাদের এখানে। আমার জীবনেও এমন তীক্ত অভিজ্ঞতা হলো আমি নাইন্টিন ফিফটি ফোরে পাশ করার পর স্টেটসম্যান পত্রিকায় সানডেতে একটা আর্ট ম্যাগাজিন বেরুতো। ওখানে প্যারিস-প্রত্যাগত বিখ্যাত শিল্পীদের কাজ ছাপা হতো। ওখানে পরিতোষ সেনের একটা কাজ দেখে আমি খুব অভিভূত হই। আমি যখন ১৯৫৪ সালে কোলকাতায় আশুতোষ মিউজিয়ামে আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশনের ওপর পড়তে গেলাম, তখন পরিতোষ সেনের সঙ্গে দেখা করি। পশ্চিমবঙ্গে টিচার্স ট্রেনিং কোর্স পাশ করতে হতো, ওটা না পাশ করলে কেউ চাকরী করতে পারতো না। সেইসময় পরিতোষ সেন আমাকে দেখালেন কিছু টেকনিক। উনি দেখালেন, কাজ কিভাবে করতে হয়। প্যালেট নাইফে কাজ করতেন, লাইনগুলো আমি দিতাম প্যালেট নাইফের মাথা দিয়ে, ফলে লাইনগুলো ভাঙা ভাঙা হতো, স্ট্রেইট হতো না, উনি আমাকে দেখালেন, প্যালেট নাইফ কিভাবে নিলে পড়ে লাইনগুলো ভাঙা হয় না, স্ট্রেইট হয়। পরে বাংলাদেশে ফিরে এই কৌশলটা আমি আমার বন্ধু কিবরিয়ার সাথে শেয়ার করি। তার আগেই এই টেকনিকে আমি এক ধরনের স্বাতন্ত্র নিয়ে, নিজের অর্জিত কিছু স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কাজ করেছিলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে আপনি একধরণের করণকৌশল ডেভেলপ করলেন প্যালেট নাইফের!
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ সেটা বলতে পারো। তো আমার বন্ধু কিবরিয়াকেও আমি দেখালাম এইভাবে করতে হয়। তারপর তো সিক্সটি সিক্সে পিতার অর্থায়নে আমি ইটালীর ফ্লোরেন্সে চলে গেলাম। আমি ইটালীতে গিয়ে ঐভাবে কাজ করছি। আমি যখন করাচীতে ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে সেকেন্ড ন্যাশনাল আর্ট এক্সিবিশন হচ্ছে সেই প্রদর্শনীতে একজন আমার কাজ দেখে বললো, তুমি তো কিবরিয়ার মতো কাজ করো! আমি তো থতমত খেয়ে গেলাম। আমি প্রশ্ন করলাম, মানে! আমি কিবরিয়ার মতো কাজ করি মানে! সে বললো, এই যে প্যালেট নাইফের এমন ব্যবহার! আমি এত কষ্ট পেলাম, এত খারাপ লাগলো আমার, ধরো কেউ যদি বলে তুমি অমুকের মতো কাজ করো,
শিমুল সালাহউদ্দিন: স্বাভাবিক স্যার…
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, ধরো কেউ যদি বলে যে, ব্যাপার হলো যে কেউ যদি পিকাসোর মতো কাজ করে তবে তাতে কোন বাহাদুরী নাই।
শিমুল সালাহউদ্দিন: অন্যের মতো লিখতে পারাও কোন বাহাদুরী না। একজনকে তার নিজের মতো আঁকতে হবে, লিখতে হবে, গাইতে হবে। নিজস্বতা থাকতে হবে!
মুর্তজা বশীর: তার তার মতো কাজ করতে হবে। বুঝছো, এই ঘটনা আমাকে এত শক করলো আমার দীর্ঘদিনের যে করণকৌশল আমার অভ্যস্ততা প্যালেট নাইফের আমি বিসর্জন দিয়ে দিলাম। এখন হলো কি আমাদের এখানে শিল্পীরা অয়েল প্যাস্টেল এই মিডিয়ামে তেমনভাবে কাজ করেন না। আমি নাইন্টিন ফিফটি ফোরে করেছিলাম কোলকাতায়, আমার দুইটা সেল্ফ পোট্রেইট করেছিলাম। খুব মেজর না, এমন তিনচারটা কাজ করেছিলাম। এখন যেহেতু আমার লাঙ-এর সমস্যা, অয়েলে কাজ করা যাবে না। চেইন স্মোকার ছিলাম একটা সময়ে। আমাকে অনেকেই না করতো। যে স্মোকিং এত করা ভালো না। কিন্তু আমি শুনিনি, বলেছি দুর চার্চিল তো সারাক্ষণ চুরুট মুখে, স্টালিনও কনস্টেন্ট পাইপ মুখে। আর আমি বলি যে আমি কখনো তো ইনহেল করতাম না। পাফ করতাম। আমার একটা নার্ভাসনেস ছিলো। ধরো, তিনচার ঘন্টা কাজ করছি না, তখন খুব ইচ্ছে করলো। কয়েকটা সিগারেট একসাথে পাফ করলাম। এমন।
শিমুল সালাহউদ্দিন: কাজ করার সময়ও স্যার? মানে একটানা যখন কাজ করেন তখনও?
মুর্তজা বশীর: না, আমার জীবনে কাজ করার সময় আমি কখনো নেশা করিনি, মানে ড্রিংকও করি না। আমি অনেক শিল্পীদের দেখেছি আমাদের দেশে, বিদেশে কাজের সময় একটা ঘোরে থাকতে পছন্দ করেন। এই একটু খাচ্ছেন কাজ করছেন। এমন। আমি একটা কখনো করিনি কারণ আর্টটা হলো, আর্টটা হলো আমার কাছে একটা প্রার্থণার মতো। কিছু নেশা, সেটা গাঁজা হোক, মদ হোক, হাশিশ হোক, ইউ আর আন্ডার দ্যা ইনফ্লুয়েন্স অব সামথিং, নরমাল না কিন্তু!
শিমুল সালাহউদ্দিন: এন্ড নট অন ইয়োরসেল্ফ। কিন্তু আপনি কিভাবে কাজ করেন?
মুর্তজা বশীর: আমি যেটা করি, আমি রাতে কখনো ছবি আঁকি না, খুব কমই রঙ চাপাই। অনেকসময় ধরো এক্সিবিশন সামনে তখন হয়তো রাতে করি, খুব চাপ থাকলে। নরমাল সময়ে আমি, সাধারণত আমি ঘুম থেকে উঠে মুখটুখ ধুয়ে শেভ করে, আফটারশেভ লোশন লাগিয়ে একটু অডিকোলন এসব লাগিয়ে নাস্তা খাওয়ার আগে আমি ছবি আঁকি, একটানা কাজ করি, লিখি বা যাই করি। ভোরের আলোটা নির্মল আর তখনতো তোমার সারাশরীরে ক্লান্তি নাই, রাত্রে ঘুমানোর পরে সাউন্ড স্লিপের পরে তারপর গোসল করে আফটার শেভ মাখার পরে আফটার শেভের গন্ধ, অডিকোলনের গন্ধ, পুরো একটা এটমোসফিয়ার আমি তৈরি করি।
শিমুল সালাহউদ্দিন: একটা আমেজ তৈরি করেন কাজ করার!
মুর্তজা বশীর: এভাবে কাজ করতে করতে হয়তো নয়টা বাজে, আমি নাস্তা করি, নাস্তা করার পর আবার একেবারে বারোটা পর্যন্ত একটানা কাজ করি। এসময় ফোনটোন ধরি না। খুব দরকার না হলে পরিবারের কেউও আমাকে বিরক্ত করে না।
শিমুল সালাহউদ্দিন: এখনো এভাবে কাজ করেন স্যার!
মুর্তজা বশীর: এখন এভাবে পারছি না। অসুস্থ হওয়ার পরে দেখা গেল যে আমার লাঙ প্রপারলি কাজ করছে না। তার ফলে আমার হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে যায়। আমার খুব কাশি বেড়ে গেল, সেসময়ই আমাকে হসপিটালে নিয়ে গেল। তখন, আমাকে চেকাপটেকাপ করে ডাক্তার বললো পেসমেকার লাগাতে হবে। বাই দ্যাট টাইম আমাকে নিউমোনিয়া অ্যাটাক করে দিলো। ডাক্তাররা বললো নিউমোনিয়াটার জন্যে আমি একেবারে জীবন মরণের বর্ডার লাইনে ছিলাম। তবে একটা জিনিস কি আমি যখন স্কিপ করে যাচ্ছি, আমার খুব মনে হচ্ছিল আমি বাঁচবো না। হয়েছে কি জানো, এটা শুনে তোমার খুব অবাক লাগবে, আমার স্ত্রী আমার পুত্র আমার পুত্রের ছেলে, আমার মেয়ে বা তাদের সন্তানেরা আমার কারো কথা কিন্তু মনে হয় নাই। পৃথিবীটা সুন্দর, মায়া, মায়াময়। কেউ কিন্তু মরতে চায় না। ক্যান্সার হলেও কেউ মরতে চায় না। তো এই আত্মীয়স্বজন কারো কথা মনে করে না, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আমার কান্না পাচ্ছে যে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কার কথা ভেবে কান্না পাচ্ছে স্যার?
মুর্তজা বশীর: আমার হু হু কান্না পাচ্ছিল এই কথা ভেবে যে আমি যা আঁকতে চেয়েছিলাম যা লিখতে চেয়েছিলাম তা করতে পারিনি।। আমি আল্লাহর কাছে বলছি, আমি প্র্যাকটিস না করলেও ধর্মে বিশ্বাস করি, বলছি যে, আল্লাহ আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি এইরকম আঁকবো, সময়কে উত্তরণ করে আমি যাবো, এখন কি করি সেটা বড় কথা নয়, মৃত্যুর পরে আমি বেঁচে থাকবো কি না সেটা আমার জানা হলো না। জীবিত অবস্থায় অনেকেই খ্যাতি পায় কিন্তু মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকাটা হলো আসল কথা। আমি বলছিলাম, হে আল্লাহ এই যে কত কত ছবি আঁকা, মৌলিক কিছু গবেষণা, বাকি থাকা লেখাগুলো এগুলো কি তুমি চাও না! আমার বড় মেয়ে জুঁই সে তো সারাক্ষণ হসপিটালে ছিলো, তাকে বললো ডাক্তাররা যে আমি বর্ডারলাইনে। লাইফসাপোর্ট দেয়ার পরিকল্পনা চলছে। এদিকে দেশে তখন অবরোধ। তো আমার মেয়ে ওর খালাতো ভাই ওরা গাড়ির মধ্যে লাল কাপড় বেঁধে আসলো। যাহোক এরপর তো পরদিন মেঘ কেটে গেলো। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করলেন। আরেকবার কাজ করার সুযোগটা পেলাম আমি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার ধরেন আপনি যদি সুযোগটা না পেতেন! ইতোমধ্যেই যেটুকু বিখ্যাত আপনি তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট না! যথেষ্ট খ্যাতি কি আপনি পান নাই?
মুর্তজা বশীর: আমি লাহোরে ফয়েজ ভাইকে (উর্দু ভাষার বিখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ) জিজ্ঞেস করেছিলাম, ফয়েজ ভাই আমার খ্যাতি হয় না কেন! তিনি বলেছিলনে, বশীর হোয়াই ইউ আর আফটার ফেইম, ফেইম উইল বি আফটার ইউ। ডন্ট রান আফটার ফেইম। ফেইমের পিছনে তুমি ঘুরো না, ফেইম তোমার পিছনে ঘুরবে। আরেকবার আমি যখন প্যারিসে, লিবারেশন ওয়ারের সময় যখন হাউস টু হাউস তল্লাশী চলছে, তখন সপরিবারে পালিয়ে গেলাম। মোপারনাস এলাকায় দুপুরবেলায় খেতে গেছি, আমার বয়স তখন চল্লিশ, যে এলাকায় আমার ক্লাস ছিলো সেখানে দুটো রেস্টুরেন্ট ছিলো একটার নাম ডুমো, আরেকটার নাম ছিল সিলেক্ট। সেখানে ফরাসী প্রায় সব আর্টিস্টরাই রাইটাররা খেতে আসতেন। সেদিন আমার সাথে যে সহপাঠী আর্টিস্ট ছিলেন তার বয়স সাতাশ আটাশ। আমার তখন চল্লিশ বললাম তোমাকে আগেই। তো সেই আর্টিস্ট জানতো আমি জাঁ পল সার্ত্রের খুব ভক্ত। খেতে বসছি, ও বললো 'বশীর ওই যে জাঁ পল সার্ত্রে। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, হোয়ার? কোথায়? ওর মধ্যে কোন রি একশন নাই। আমাকে কি বললো জানো, হোয়াই ইউ আর সো এক্সাইটেড! সার্ত্র হয়েছে তো কি হয়েছে, ও কি করেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয় গুরুত্বপূর্ণ এখন সে কি করছে সেটাই বড় কথা। কেননা দর্শন অনেক এগিয়ে গেছে, ফ্যুকোর দর্শন তখন তরুণ তরুণীদের আকর্ষণ করছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খ্যাতি মানে হলো পিচ্ছিল রাস্তায় হাঁটা এমন একটা কথা বলেন স্যার আপনি!
মুর্তজা বশীর: সেটা হলো উনিশশো পঞ্চান্ন সালে। চুয়ান্নোর শেষাশেষি আধুনিক রীতিতে ছবি আঁকছি তাড়াতাড়ি, আমার তখন খুব অহঙ্কার। ফজলে লোহানী আমার বন্ধু। তো ফজলে লোহানী বললো আমাকে যে, বশীর, যশ আর খ্যাতি হলো একটা শ্যাঁওলাধরা পিচ্ছিল রাস্তায়, তখন বাটা একটা জুতা বের করছিলো, 'ক্রেপসোল' জুতোর তলাটা রাবারের, যদি তারাতারি হাঁটো তোমার পা পিছলে যাবে, পা টিপি টিপে হাঁটতে হবে। জয়নুল আবেদিন ফিফটি ফাইভের ডিসেম্বরে আমার ছবি দেখতে আসলেন, বেগমবাজারে থাকি তখন, ফেরার সময় জেলখানার সামনে তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, বশীর তুমি শুধু মনে করো তুমি ছবি আঁকতে পারো! আমি পারি না! আমিও পারি। কিন্তু পারি না কেন জানো? তখন তিনি আজিমপুর কলোনিতে থাকতেন। রেশনের জন্য লাইন দিতে হচ্ছে। কলেজ করার জন্য ডিপিআই অফিসে তদ্বির করতে হচ্ছে। ফলে তিনি আর সুযোগই পাচ্ছেন না ছবি আঁকার। মানুষকে কলেজ করার জন্য ছবি ঘুষ দিতে হচ্ছে। সেদিন তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব মূল্যবান একটা কথা বলেছিলেন। নিজেকে তুমি এমনভাবে তৈরি করো, যখন লোকে তোমাকে কিছু বলবে তুমি হাসবে, যখন লোকে তোমার প্রশংসা করবে তুমি হাসবে, যখন লোকে তোমার সমালোচনা করবে তখনও তুমি হাসবে। কারণ তুমি জানো তুমি কি! খুব কঠিন কিন্তু! মানুষ সমালোচনা করলে কষ্ট লাগে, প্রশংসা করলে ভাল লাগে, জয়নুল আবেদিন বললেন পারবে, তুমি পারবে। আমি বললাম স্যার আমি তো মানুষ! দেবতা না। আমার দশ বছর লেগেছিল এটা আয়ত্ব করতে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একদম ঠিক আছে স্যার জয়নুল আবেদিনের কথা। কিন্তু আপনার শিক্ষক কিন্তু জাঁ পল সার্ত্রের মতোই শেষদিকে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছিলেন। আপনার এখনকার মতো সক্রিয় ছিলেন না। ক্যান্সারটাও বেশ ভুগিয়েছে অবশ্য।
মুর্তজা বশীর: একটা ব্যাপার হলো, দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার প্রচণ্ড প্রশংসার পর জয়নুল আবেদিনের খ্যাতি এত তুঙ্গে যে তাঁর মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি এসে গেছিলো। আর দুই নাম্বার ব্যাপারটা হলো একটা ই্নস্টিটিউট করতে গিয়ে যে শ্রম উনার দিতে হয়েছে, দেনদরবার করতে হয়েছে তাতে পরে তিনি আসলে একটু দূরেই সরে গেছেন বা করতে পারেননি নিজের কাজটা।এসবের কারণেই ছবি আঁকারই সময় পেলেন না। তাছাড়া চারুকলা কলেজ হয়ে যাওয়ার পর লোকে এমনভাবে প্রশংসা করা শুরু করলো সে তো হিউম্যান বিইং তো, তার তো তৃপ্তি এসে গেলো। সাটিসফেকশন এসে গেলে আর হয় না। কবি জসীমউদ্দীনের মধ্যেও একই ব্যাপার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জসীমউদ্দীনের কী ব্যাপার স্যার? রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে এসে অজ পাড়াগাঁয়ের এক মুসলমান যুবক সোজন বাদিয়ার ঘাট আর নকশী কাঁথার মাঠের মতো কাব্য নিয়ে আসলেন। কিন্তু এই দুইএর পর এই মানের আর কিছু হলো না!
মুর্তজা বশীর: একদম ঠিক ধরেছো। সেল্ফ সাটিসফেকশন এসে গেলে আর হবে না। যতক্ষণ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ না হচ্ছে ততক্ষণ সৃষ্টি হয় না। সেটা কবিতা বলো, সাহিত্য বলো, চিত্রকলা বলো, সবজায়গায় একই ধরনের। তোমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে হবে। রক্তক্ষরণ না হলে তোমার হবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এখন কি স্যার আপনি আপনার নিজের জীবনে এই যে খ্যাতি বলেন বা তৃপ্তি বলেন এগুলো দূরে সরিয়ে রাখেন সবসময়?
মুর্তজা বশীর: অবশ্যই দূরে সরিয়ে রাখি। শোনো, আমার কম যশ কেন! আমি চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম তিরিশ বছর, দীর্ঘসময়, আমি কোন জায়গায় গিয়ে প্রধান অতিথি বা উদ্বোধক হইনি। খালি একটা ছাত্রের একটা প্রদর্শনী উদ্বোধন করেছিলাম, সেটা কেন? কারণ সে খুব খারাপ আঁকে। ওকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য। এবং তাকে উদ্বুদ্ধ বা উদ্দীপ্ত করার জন্য। এগুলো আমি পরিহার করেছি। কারণ তোমার মধ্যে তৃপ্তি এসে গেলে তোমার ভেতরের বুভুক্ষ শিল্পীমন মরে যাবে। আর আর একটা কথা হলো কি জানো, পিকাসো বলেছেন, হোয়াট ইউ আর থিংকিং দ্যাট ইজ নট ইমপরটেন্ট, হোয়াট ইউ আর ডুয়িং দ্যাট ইজ ইমপরটেন্ট। আমি আমার 'এপিটাফ' চিত্রমালায় পাথরের নুড়িগুলো এঁকেছিলাম বিষন্নতা ও শুভ্রতার প্রতীকরূপে সাদা পটভূমিতে। কিন্তু পরে আমার মনে হলো দেখি তো এগুলো কালো পটভূমিতে কেমন হয়? আমার আকাঙ্ক্ষা বলে এই চিত্রগুলো আঁকলাম। সাতটা না আটটা যখন আঁকলাম তখন আমি সন্তুষ্ট হলাম না। তো কল্পনায় যেমন দেখেছিলাম ভিজ্যুয়ালি সেরকম আসলো না।
শিমুল সালাহউদ্দিন: বাংলাদেশের চিত্রকলা নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? তরুণরা কেমন করছে?
মুর্তজা বশীর: আমি খুবই আশাবাদী। তরুণরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী। তাদের পড়াশোনা ও ইন্টারনেটের কল্যাণে পৃথিবীর নানাদেশের শিল্পকর্ম দেখার সুযোগও বেশি।
শিমুল সালাহউদ্দিন: কিন্তু স্যার আপনি তো মার্কসিস্ট। আপনার পেছনেই লেনিনের আবক্ষ মূর্তি, আপনি সেটা বিশ্বাস করেন এবং আস্থাও আছে বললেন, আবার আপনি আপনার পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত ধর্মবিশ্বাসের কথাও বললেন, আমাদের সুরা তওবার অংশ শোনালেন!
মুর্তজা বশীর: তো তুমি ঐ কন্ট্রাডিকশনের কথা বলছো তো! শোনো এইটা আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাস করেছে। ধর্ম কিন্তু সৃষ্টি হয়েছিল মানুষের কল্যানের জন্যই। পরে এটা ব্যবহার করা হয়েছে শোষণের জন্য, হয়েছে স্বার্থসিদ্ধির কাজে। ইসলাম ধর্মও তাই। তখন তো জাহেলিয়াতের যুগ, পশুদের মতো অজাচারে ভরা চারপাশ, স্ত্রী পুত্র কন্যা কোন বাছবিচার নেই, ধর্ম সবসময় মধ্যযুগে বলো বা পৃথিবীর মানুষের সভ্যতার শুরুতেই বলো এর উৎপত্তি হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। আর্টিস্ট বা মার্ক্সিস্ট হলেই ধর্মে বিশ্বাস করতে হবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ হলো মার্কসের একটা কথা সবসময় বলা হয়, ধর্ম হলো আফিমের মতো। আমাকে তুমি দেখাও, মার্কস তো কবরস্থ হয়েছিলেন। লন্ডনের হাইগেটে তার সমাধি। শুধু তাই না, যখন ক্যাপিটাল লিখছেন তখন তার সন্তানরা মারা যাচ্ছে, তাদের তিনি কবরস্থ করছেন। এবং নিজে মারা যাওয়ার পর কবরস্থ হয়েছেন। তাঁর যে সহচর ও বন্ধু এঙ্গেলস তাকে তো নিশ্চয়ই বলে যেতো আমাকে কবর দিও না। সেটা কিন্তু তিনি করেননি।কিন্তু এঙ্গেলস এর কোন কবর নেই। এঙ্গেলস বলেছিলো আমি মরে গেলে আমাকে দাহ করে সেই ডাস্ট সমুদ্রে ভাসিয়ে দিও। আমি যখন নিরানব্বই সালে আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার পথে লণ্ডনে ছিলাম আমার একটা শখ ছিলো বিখ্যাত লোকরা কোন বাসায় ছিলেন কোথায় তাঁদের কবর সেগুলোর ছবি তোলা। লেনিন ওখানে ছিলো, মার্কস ওখানে ছিলো আমি এঙ্গেলস এর কোন সমাধি পাইনি। ফান্ডামেন্টালিজম সম্পর্কে আমার বক্তব্যই হলো নাস্তিক যেমন ফান্ডামেন্টালিস্ট আস্তিকও তেমনি মৌলবাদী। যে কোন বিষয়ে ঘোরতর বিশ্বাসীই ফান্ডামেন্টালিজম।
শিমুল সালাহউদ্দিন: হ্যা স্যার, আমি আপনাকে মার্কসবাদের কথা বললাম এইজন্যে যে, ধর্ম বিষয়ে না আপনার যেই কাজ সেখানে মার্কসবাদের কী প্রভাব আছে!
মুর্তজা বশীর: শোনো মার্কসবাদ আমাকে যেটা দিয়েছে তাহলো সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা। মার্কসবাদের মূল কথাটা হলো মানবিকতা ও শোষণমুক্ত সমাজের কথা। একটা মানবিক শোষণমুক্ত ও একটা মূল্যবোধসমৃদ্ধ শ্রেণীবৈষম্যহীন সমাজ হবে, এটাই হলো মার্কসবাদ। আমি নিজেকে ক্লেইম করি যে আমি একজন সোস্যালি কনসাস পেইন্টার। আমি যখনি যা এঁকেছি একটি রাজনৈতিক সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এঁকেছি। ছবি আঁকার জন্য ছবি আমি আঁকিনি, অর্থের জন্যও না।
শিমুল সালাহউদ্দিন: আপনার কাজের মধ্যে কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আপনার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙি?
মুর্তজা বশীর: আমি নাইন্টি এইটে উইং আঁকলাম, পেপার খুলে দেখা যায় ধর্ষণ, হত্যা, ফেন্সিডিল, তখন ইয়াবা আসেনি, মানুষ ক্রমেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। একজন শিল্পী কেবল না, মানুষ হিশেবে আমি চেয়েছি একটা সুন্দর জীবনের কথা বলতে। আমি তখন প্রজাপতি থেকে পাখাটা নিলাম, তার যে ডানার কাঁপন, তার যে রঙের বৈচিত্র্যময় দ্যুতি, মানুষের মধ্যে একটা আনন্দের শিহরণ, এইটা আমি রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমি ওয়াল আঁকলাম কখন, যখন আইয়ুব খানের মার্শাল ল, এবং আর্থসামাজিক কারণে স্বামী স্ত্রীকে বোঝে না, পুত্র কন্যা পিতাকে বোঝে না, কোথায় যেনো একটা অদৃশ্য দেয়াল, সেই সময় আমি এই দেয়াল আঁকলাম।
শিমুল সালাহউদ্দিন: এপিটাফ আঁকলেন কখন?
মুর্তজা বশীর: জীবনকে ভালোবাসি বলে একাত্তরের শেষের দিকে দেশ ছেড়ে পালালাম। ফরাসী টেলিভিশনে যখন দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতাম তখন নিজেকে অপরাধী মনে হতো। তখন ভাবলাম এইসব নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধা যারা কোন ছাত্র সংগঠনের বা রাজনৈতিক দলের সদস্য নয় এদের উদ্দেশ্যে আমি কি করবো! আই মাস্ট ডু সামথিং। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোন যোদ্ধা মারা যেত, তখন তার মাথার সামনে একটা পাথর রাখা হতো। যখন পাথর টা ওখানে রাখা হতো তখন আর সেটা পাথর না, সেটা একটা প্রতীক, তখন এটা উন্মুক্ত আত্মার প্রতীক, ওপেন সৌল। তখন আমি করলাম কি? বরফ থেকে পরে কর্দমাক্ত না হওয়ার জন্য ফ্রান্সে বাড়ির উঠোনে ছোট ছোট পাথরের নুড়ি বিছানো হতো আমি সেইসব নুড়ি একজন রেনেসাঁর শিল্পীদের দৃষ্টি ও ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকর মানসিকতা নিয়ে আঁকলাম। এই যে বাস্তবতার ভেতর দিয়ে অ্যাবস্ট্রাক রূপ তাকে বললাম অ্যাবস্ট্রাক রিয়েলিজম। আমার কালেকশনে আছে সেই নুড়িগুলো। তবে যা কিছু আমি করেছি শুধু দুটো জিনিস আমি কল্পনার আশ্রয় নিছি একটা হলো 'কান্তোস', গোধুলীর আকাশে যে রঙের খেলাটা, এখানে কিন্তু সমাজের চিন্তা আমি করিনি, আর আমি কলেমা তৈয়েবা যেটা আমি করেছি সেটা হলো পুরো কালার গ্রামারের ওপর, এইটা কিন্তু ক্যালিগ্রাফি না, আমি ক্যালিগ্রাফিকে পেইন্টিং এ রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছি। এখন আমি ফেসবুকে দেখি পাকিস্তানের একজন শিল্পী আরিফ খান সে খুব ক্রিয়েটিভ ক্যালিগ্রাফি করছে, অপূর্ব! এগুলো ক্যালিগ্রাফি নয়, অ্যানাদার ফর্ম অব আর্ট।
শিমুল সালাহউদ্দিন: জ্বী স্যার, আলাদা বৈশিষ্ট্য হলে তো আলাদা আর্ট হিসেবেই গন্য করতে হবে।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, অ্যানাদার ফর্ম অব আর্ট
শিমুল সালাহউদ্দিন: তো স্যার, আপনি মনে করেন আমাদের এখানে যে ইসলামী মুভমেন্টগুলি আছে, বা প্রতিক্রিয়াশীলতা আছে, এমনকি আর্টে ও, আমাদের দেশে, সেগুলি কি স্যার আপনার কাজে আরো ইন্সপায়ারড হয় নাই?
মুর্তজা বশীর: তোমাকে আমি একটা কথা বলি, আমি যখন ৮০ সালে প্রথম আঁকলাম আমাদের তাবিজ, জায়নামাজ, মানুষের বাড়িতে দরোজার ওপর ঝুলানো কলেমা ও কোরানের সুরাগুলি ভিত্তি করে, তখন খুব সমালোচনা হলো। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বলা হলো জিয়াউর রহমান মুর্তজা বশীরকে দিয়ে ইসলামী ছবি আঁকাচ্ছে। তখন আমি উপাচার্য আবুল ফজল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম স্যার, আমাকে তো সবাই কনডেমড করছে, বলছে মার্ক্সিস্ট এখন মৌলবাদী হয়ে যাচ্ছে, আমাকে আপনি একটা জিনিস বলেন, জন্মের পর আমার যখন জ্ঞান হলো আমি দেখেছি যে আমার মা পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়ে, বাবা নমাজ পড়ে, ভাইরা নমাজ পড়ে, ভাবীরা নমাজ পড়ে, ঘরে আল্লাহ মোহাম্মদ, সুরা ফাতেহা আছে। আছে বাইরেও, বেবি টেক্সিতে যাই দেখি লেখা আছে কালেমা বা দোয়া ইউনুস। এইসবের ভেতরেই তো আমি বড় হয়েছি। এসব যদি আমার কাজে আসে তবে সেটা তো ভেতর থেকেই আসা। এগুলোতো আমাদের জীবন যাপনের সাথে মিশে গেছে। এইটা যদি আমার কাজের মধ্যে আসে তাহলে আমি মৌলবাদী হলাম কি করে! তাহলে দ্যা ভিঞ্চি ফান্ডামেন্টালিস্ট, রাফায়েল ফান্ডামেন্টালিস্ট, মাইকেল এঞ্জেলো ফান্ডামেন্টালিস্ট।
শিমুল সালাহউদ্দিন: রাইট!
মুর্তজা বশীর: এবং প্রতিবেশী দেশে অবন ঠাকুর, নন্দলাল এরাও মৌলবাদী। কারণ এঁরা তাঁদের ধর্মের প্রচুর অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করেছে। পৌরাণিক উপাদান নিয়ে এঁরা এঁকেছেন।
শিমুল সালাহউদ্দিন: এখানে একটা কথা আছে স্যার! বাংলাদেশে আমি যদি টিকি, দাঁড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াই তাহলে সেটা ফ্যাশান আর টুপি পড়লেই মৌলবাদ!
মুর্তজা বশীর: আমি বললাম যে তাহলে, আমাকে মৌলবাদী বললে অবন ঠাকুর, নন্দলাল– এদের কনডেম করা হোক। তারা তো পৌরাণিক শিব দুর্গা ধর্মের বিভিন্ন আচার নিয়ে কাজ করেছেন। আমি এটা আগেও ইন্টারভিউতে বলেছি, বিদেশে দাঁড়ি রাখলে সে ইন্টেলেকচুয়াল, কিন্তু বাংলাদেশে দাঁড়ি রাখলে তুমি মৌলবাদী, মোল্লা।
শিমুল সালাহউদ্দিন: শিল্পীদের কি স্যার তাহলে এইসব রিজিডিটি থেকে বাইরে থাকতে হবে!
মুর্তজা বশীর: আমার বেশ মনে আছে, ২০০৪ সালে আমার বই বেরিয়েছে। 'মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ' । বইমেলায় আমি প্রকাশক অ্যাডর্নের স্টলে গেছি এমন সময় মেলায় আমার সাথে বন্ধু হুমায়ুন আজাদের দেখা। উনি আমাকে বেশ ঠাট্টার ছলে বললেন, আরে বশীর সাহেব আপনার মাথায় টুপি কোথায়? আমি তো থতমত খেয়ে গেলাম! বললাম, টুপি কেন? বললো, আজকাল কি সব করছেন আরবী অক্ষরটক্ষর দিয়ে! আমি বললাম, আচ্ছা! হ্যাঁ। আজাদ আপনার আমি একটা পোট্রেইট করেছিলাম, ওইটা কি করেছেন! ফেলে দিয়েছেন? এবার আজাদের থতমত হওয়ার পালা! বলে না, ওটা আমি আমার একটা বইয়ের পেছনে ছেপেছি। আমি বললাম, ওইটা ফেলে দেন, আমি যেহেতু মৌলবাদী, ওটা ফেলে দেন।আমার কথা শুনে সে হা হা হা করে হাসলো। দাঁড়ি রাখলেই আপনি মৌলবাদী হয়ে যাবেন এই সংকীর্ণতা থেকে বেরুতে হবে। আজকাল তো জামায়াতে ইসলামী, ছাত্র শিবিররা কেউ দাঁড়ি রাখে না। ক্লিনশেভ। আমি চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে দেখেছি। জিন্স পড়ে, শার্ট প্যান্টে ইন করে পড়ে। স্মার্ট রীতিমতো।
শিমুল সালাহউদ্দিন: এখন স্যার তাহলে এই জাতির করনীয় কি? এখানে তো আমরা মোটেও পরমতসহিষ্ণু না!
মুর্তজা বশীর: শোন এই জাতির দেশপ্রেমের অভাব। দেশপ্রেম যদি থাকতো, তাহলে আমার দেশ আজকে এইরকম হতো না। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রবলেম হলো আমাদের দেশপ্রেম নেই। আমাদের প্রথম হলো অহম, আমি, আত্নীয়স্বজন। সত্যিকারে দেশপ্রেমিক একজন থাকলেও দেশটা দাঁড়িয়ে যেত। এই দেশের মানুষ কিন্তু অত্যন্ত সাহসী। খরা, ঘূর্ণিঝড়, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাসের মুখোমুখি হয়েও, ভেসে গিয়েও মাথা তুলে দাঁড়ায় বারবার। এই দেশের মানুষ অদ্ভুত মানুষ, মর্ণিং শোজ দ্যা ডেজ এইখানে খাটে না। তুমি দেখবে সকাল বেলা দশটার সময় অসম্ভব সুন্দর ঝকঝকে আকাশ, রোদ, সন্ধ্যায় কালবোশেখী ঝড় হয়ে গেল। মানুষ এইসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মানুষ তাই কখন যে আন্দোলনে নেমে পড়বে তা কেউ বলতে পারে না। এই যে একুশে ফেব্রুয়ারি, সেদিন কিন্তু আমিও ছিলাম। সকালবেলাই সেদিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ডিসিশন নিয়েছে যে ওয়ানফরটিফোর ভাঙা হবে না, কিন্তু নদীর গতিপথ যেমন তুমি বলতে পারো না, নদী নিজের পথ বেছে নেয়, তেমনি ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে মানুষ ভাষার জন্য রুখে দাঁড়ালো। এই যে মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের বঙ্গবন্ধু অ্যারেস্ট হয়ে গেলেন, নেতারা সব পালালেন ভারতে, যুদ্ধ কী থেমে গিয়েছিলো! এই দেশের মানুষই তো লড়েছে। নেতারা নাই অথচ এখানকার মানুষ মরণাপন্ন ভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধটা করেছে। তাই এইদেশের মানুষ কখন যে কি করবে এটা বলা যায় না। খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। এই যে এরশাদের পতন হলো, কেউ কল্পনা করেছিল! একদিনে হাজার হাজার জনসাধারণ রাস্তায় নেমে গেল!
শিমুল সালাহউদ্দিন: তো স্যার, এই দেশের মানুষ সম্ভাবনাময়?
মুর্তজা বশীর: অবশ্যই খুব সম্ভাবনাময় এবং অত্যন্ত সাহসী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমাদের চিত্রকলার সম্ভাবনা কেমন স্যার?
মুর্তজা বশীর: আমাদের চিত্রকলার মান প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং এর আগে যাদের সাথে একীভূত ছিলাম, পাকিস্তান তাদের থেকে অনেক উঁচুমানের। এটা হলো আমার মূল্যায়ন। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময় ছাত্রদের বলতাম, আমাদের যারা পূর্বসূরী ছিলো, তাঁদের ছবি তোমাদের দেখতে হবে। এঁদের ছবি দেখো, কিভাবে তারা রঙ প্রয়োগ করেছে, কিভাবে তারা আলোছায়ার খেলা খেলেছে দেখো, অনুপ্রাণিত হও, অনুকরণ করো না। আমি যেটা দেখছি অনেকেই অনুকরণ করে ফেলছে, এটা ভালো না। একটা স্বকিয়তা তৈরি করতে হবে। আজকাল ইন্টারনেটের যুগ, এখান থেকে কিছু ওখান থেকে কিছু যার ফলে নিজস্ব ল্যাঙ্গুয়েজ দাঁড়াচ্ছে না কারো। যেমন সাহিত্যে আমরা বলি বুদ্ধদেবের ভাষা কি মানিকের ভাষা, রবীন্দ্রনাথের ভাষা, শরৎবাবুর ভাষা, তেমনি নিজস্ব সিগনেচার তৈরি করতে হবে। এই এখন দেখো, আমাদের অনেক শিল্পীরই সিগনেচার যদি মুছে ফেলা হয়, তবে বলা মুশকিল হবে এটা কার ছবি!
শিমুল সালাহউদ্দিন: একজন বাঙালি হিসেবে কি স্যার আপনি গর্বিত? আপনি তো বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন, ব্রিটিশ পিরিয়ড, পাকিস্তান পিরিয়ড আর বাংলাদেশেও দেখছেন! একজন বাঙালি হিসেবে, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র হিসেবে আপনি কি গর্বিত?
মুর্তজা বশীর: পিতার পুত্র হিসেবে কৈশোরে গর্বিত ছিলাম। কিন্তু যৌবনে যখন দেখলাম তাঁর ছায়ায় আমি ঢেকে যাচ্ছি তখন এ.কে.এম বশীরুল্লাহ্ থেকে মুর্তজা বশীরে রূপান্তরিত হলাম। তবে এখন গর্বে আমার বুক উঁচু হয়ে যায় যখন দেখি তিনি নিষ্ঠাবান মুসলমান হয়েও মনে প্রাণে বাঙালি। কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত না। কারণ বাঙালি বলতে যা বোঝায় সে নাই তো! মাঝে মাঝে আমার খুব কষ্ট লাগে, আশ্চর্য লাগে যে এইদেশে আমার জন্ম হলো কেন! যেখানে মনুষ্যত্ববোধ নাই, যেখানে স্বার্থপর, যে সম্ভাবনা নিয়া একটা মুক্তিযুদ্ধ আমরা করেছিলাম সেটা আমরা ধরে রাখতে পারি নাই।
শিমুল সালাহউদ্দিন: ভালোমন্দ মানুষ তো স্যার সবদেশেই আছে!
মুর্তজা বশীর: তা আছে, তবে বেশিরভাগ দেশগুলোর মানুষের দেশপ্রেম আছে। আমাদের যে দেশপ্রেম আছে এইটাই আমরা প্রমাণ করতে পারিনি। ভারতের দেখো একটা জিনিস, ওদের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে কিন্তু ওরা প্রথমেই বলে আমি ভারতীয়, মাদ্রাজীকে জিজ্ঞেস করো বলবে আমি ভারতীয়, গুজরাটিকে জিজ্ঞেস করো সে ও বলবে। আর আমাদের দেশে তুমি রাস্তায় পাঁচজনকে জিজ্ঞেস করো, একজন বলবে আমি নোয়াখাইল্যা, একজন বলবে আমি বরিশাইল্যা, আমি কুমিল্লা। বাংলাদেশ আমার দেশ এইটা আমাদের মাথায় ঠিক কাজ করে না। এইখানেই তো প্রবলেম। আমি নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালি হলেও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশী। ভারতে কিন্তু বলছে আই অ্যাম ইনডিয়ান। আমেরিকায় ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী বসতি নিলেও তারা কিন্তু আমেরিকান।
শিমুল সালাহউদ্দিন: স্যার ইন্ডিয়ার বয়স আর বাংলাদেশের বয়স তো সমান না! মানে স্যার ইন্ডিয়ান জাতীয়তাবাদ যেই সময়ে বিকশিত হইলো আমাদের জাতীয়তাবাদের বয়স তো তত বেশি না। আর আমাদের জাতীয়তাবাদী প্রপাগাণ্ডাও তো অত স্ট্রং না।
মুর্তজা বশীর: একটা কথা তোমাকে বলি, ভারতবর্ষ সব ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির দেশ। এই ভারতবর্ষকে প্রথম ইউনাইটেড করলো ইম্পেরিয়াল গুপ্তরা। কিন্তু গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর আবার আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র মাথা তুলে দাঁড়াল। তারপর ইংরেজরা পুরো ভারতকে একীভূত করে ফেললো। কিন্তু ৪৭সালে ব্রিটিশরা এসে দেশটা ভাগ করে ফেললো। তবে আমার যেটা মনে হয় ভারতের হওয়া উচিত ছিলো ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া। আমেরিকার মতো। তাহলে কিন্তু এখনকার মতো অবস্থা হতো না। এবং আমার মনে হয় বাংলাদেশও, এই যে কতগুলি ডিভিশন, নর্থ বেঙ্গলের লোকেরা দেখবে, ওরা তো খুব নেগলেক্টেড ছিলো রাস্তা ঘাট ইত্যাদি, চিটাগাং আবার একটু উন্নত, তো এইটা তোমার যদি ফেডারেল গর্ভমেন্ট হয়, আমার যেটা মনে হয়, এখানেও স্বাধীন আলাদা বিভাগ হলে ভালো হবে। লোকাল গর্ভমেন্ট শক্তিশালী না হলে আমাদের সেন্ট্রাল শক্তিশালী হবে না। বাংলাদেশ হওয়া উচিত এমন, সেখানে সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট আয় লোকাল প্রশাসন ব্যবহার করবে আর টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট সেন্ট্রালকে দিবে। এই যে চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে আমি চাকরী করলাম, সেখানে কিন্তু চিটাগাঙের বাইরের লোকের চাকরির সুবিধা কম, আবার সিলেটে আমি একটা অবাক জিনিস দেখলাম, সেখানে লোকাল লোকজন চাকরী করে না। তারা সব লন্ডনী মনে করে নিজেদের। আমি ছিয়ানব্বই সালে সিলেট বাংলাদেশ ব্যাংকে ম্যুরাল করেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকে দেখা যাচ্ছে মেজরিটি বাইরের লোক। সিলেটী প্রায় নাই কেউই। শহরে একটা মুচি জুতা পালিশ করছে, সেও স্বপ্ন দেখছে কাউকে বিয়ে করে লন্ডন যাবে! তবে একটা কথা তোমাকে বলি, যারা ওখানে, লন্ডনে গেছে, সংসার করেছে, তারা তো ওখানে সন্তান জন্ম দিচ্ছে, সন্তানরা কিন্তু আর সিলেটী না, ওরা ব্রিটিশ। ফলে রেমিটেন্স আসা কিন্তু খুব দ্রুতই বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের অর্থমন্ত্রীকে এইটা ভাবতে হবে। ওখানে বহু বাঙালি নিগ্রো বিয়ে করছে, কারন শী থিংকস হারসেল্ফ অ্যাজ এন ই্য়োরোপিয়ান। কিন্তু এখানে একটা বাঙালি মেয়ে কোনভাবেই একটা নিগ্রোকে বিয়ে করবে না।
শিমুল সালাহউদ্দিন: জাতীয়তাবাদের তাহলে কোন দরকার কি নাই স্যার?
মুর্তজা বশীর: খুবই দরকার আছে। তাকে লালন করা দরকার বেশি। দেশপ্রেম জাগ্রত না করলে দেশ এগুবে না, অন্যায় অনাচার হতেই থাকবে। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধ বলার পক্ষে না, মুক্তিযুদ্ধ আগামীতে হবে। তখন শ্রেণী বৈষম্য থাকবে না,থাকবে অর্থনৈতিক মুক্তি ও মূল্যবোধ আবার প্রতিষ্ঠিত হবে যখন। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ এ চারটি মূলনীতি সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ ছিলো পাকিস্তানী উপনিবেশের বিরুদ্ধে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। আমি হয়তো দেখে যেতে নাও পারি, তবে আগামীতে মুক্তিযুদ্ধ এদেশের মানুষ, স্বাধীনচেতা মানুষ করবে এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। বাঙালির জাতি হিসেবে ইউনাইটেড হতেই হবে।
শিমুল সালাহউদ্দিন: কিন্তু স্যার জাতীয়তাবাদী প্রাক্টিস এর একটা বড় অনুষঙ্গ পহেলা বৈশাখ। আপনি তো মনে করেন পহেলা বৈশাখে পান্তাখাওয়া ব্যান্ড করে দেয়া উচিত!
মুর্তজা বশীর: সেটা অন্য পার্সপেক্টিভ থেকে। দেখো, জীবনে যারা ফাস্টফুডে অভ্যস্ত, বাংলিশে কথা বলে যারা, তারা পহেলা বৈশাখে সানকীতে পান্তা খাচ্ছে, এটা কিন্তু গরীবদের প্রতি উপহাস করা, তুমি একদিনের শখে খাচ্ছো আর সে জীবনভর খাচ্ছে। এটাকে ব্যান্ড করে দেয়া উচিত আমার মনে হয়, একেবারে ব্যান্ড করে দেয়া উচিত।
শিমুল সালাহউদ্দিন: আপনি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের পরের বছর মার্চে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ঐতিহাসিক সংকলন 'একুশে ফেব্রুয়ারী' তে আপনার আঁকা ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম ছবি 'রক্তাক্ত ২১শে' ছাপা হয়। তারপর থেকে আপনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন, লিখেছেন। ভাষা সৈনিক মুর্তজা বশীরকে নিয়ে আপনার মতামত কেমন?
মুর্তজা বশীর: একটি জাতির ভাষার ওপর আক্রমণ মানেই হলো জাতিসত্তার ওপর আঘাত এবং অস্তিত্বকে বিলীন করে দেওয়ার প্রয়াস। পাকিস্তান হওয়ার আগ থেকেই এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে যখন ষড়যন্ত্র শুরু হয় তখনই পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকায় ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে যখন ঘোষণা করেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এর প্রতিবাদ করেন এবং ক্রমেই এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। যার পরিণাম হলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। আমি কোনো আদর্শ থেকে এ আন্দোলনে যোগ দিইনি। এ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পেছনে একটি কারণ হলো ভাষা আন্দোলন আমাদের অস্তিত্বের লড়াই ছিল। কেননা একটি দেশের সংস্কৃতি সেই জাতির অস্তিত্বের বাহন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ট্যালিনের মৃত্যু দিবস পালন করে যখন আমি আমার পৈতৃক নিবাসে ফিরছিলাম, তখন বেশকিছু ছাত্র আমাকে 'কমিউনিস্ট' বলে ধাওয়া করে। নাজিমুদ্দিন রোডে তখন একটা রেললাইন ছিল। তখন একটি মালবাহী রেলগাড়ি যাচ্ছিল। ফলে আমি চানখাঁরপুল দিয়ে যেতে পারছিলাম না। রেলক্রসিংয়ের ওপর তখন ঘুমটি দেওয়া আছে। আমাকে চার-পাঁচজন ছাত্র ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের নিচে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি কোনোভাবে নিজেকে ঠেকিয়ে রেখে রেললাইন থেকে যক্ষ্মা হাসপাতালের দিকে নেমে এলাম। এদিকে ওপর থেকে আমাকে লক্ষ্য করে পাথরের নুড়ি মারা হচ্ছে। আর 'কমিউনিস্ট' বলে চিৎকার করে গালাগালি করছে। তখন স্থানীয় কিছু লোক দৌড়ে আসে। তারা আমাকে ঘিরে একটি প্রাচীর তৈরি করে পাল্টা জবাবে বলে, 'কমিউনিস্ট হয়েছে তো তোদের কী?' কমিউনিস্টদের সম্পর্কে ধারণা ছিল, তারা পাকিস্তানের জন্ম চায়নি। কেননা, কমিউনিস্টরা মনে করত এই নতুন রাষ্ট্রের বিভাজন লাখো মানুষের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে পারবে না এবং এই স্বাধীনতা মিথ্যা। বর্তমান অবস্থায় একুশের চেতনা প্রায় নাই। আমি আমার একটা কাজ, 'জননী বাংলাদেশ' করেছিলাম, দুই হাতের অঞ্জলিতে ফুল নিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিহ্বল চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে 'শহীদ মিনার' পাখির ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। মিনারের পেছনে যে গোল রক্তাক্ত সূর্য_ সে একা_ সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। সূর্যের বুকে উৎকীর্ণ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র অক্ষরগুলো খসে পড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমি বলতে চেয়েছিলাম, আজকে একুশের চেতনা নেই। শহীদ মিনারের সামনের রাস্তাটার নাম হওয়া উচিত ছিল অমর একুশে সরনী। ঢাকা শহরে একটা রাস্তাও ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হওয়া চারজনের নামে নেই। এখনও শহীদ মিনারটা কী, কী তার বিবরণ–সেখানে এ নিয়ে কোনো সাইনবোর্ড নেই।
শিমুল সালাহউদ্দিন: আপনার অষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে স্যার। আমরা উঠি স্যার। আপনাকে জন্মদিনের অফুরান আগাম শুভেচ্ছা স্যার।
মুর্তজা বশীর: ধন্যবাদ তোমাকে। ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা বলে।




















